ভাইপোর পা থেঁতলে দিয়ে শাস্তি! ময়দানে ফুটবলের ঝাঁঝ ‘স্যার’ দুখীরামকে ভুলেছে বাঙালি

Indian Football : দুখীরাম মজুমদার একদিন জানতে পারেন, তাঁর ভাইপো ছোনে মজুমদার নাকি ইংরেজদের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে পা বাঁচিয়ে খেলেছেন পায়ে জুতো ছিল না বলে।

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
ভাইপোর পা থেঁতলে দিয়ে শাস্তি! ময়দানে ফুটবলের ঝাঁঝ ‘স্যার’ দুখীরামকে ভুলেছে বাঙালি

“কী মধু আছে ওই তোমার নামেতে বাবা ফুটবল?”

হ্যাঁ মধুই বটে! ময়দানের টান যে কী অমোঘ টান তা বাঙালি জাতিকে নতুন করে বলে দিতে হয় না। মোহনবাগান থেকে ইস্টবেঙ্গল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদ, লিভারপুল, বাঙালির উত্তেজনার রেশ মেলে প্রতিটি জায়গায়। এটাই পরিচয় বঙ্গের সন্তানদের। এক কালে ময়দানের বাতাসের গন্ধেই বাঙালির প্রাণ জুড়াতো।

বাঙালির কাছে ফুটবল মানে শুধু খেলা নয়। এ এক আবেগ, এক উন্মাদনা। তাই ডার্বি ম্যাচগুলোর সময় ব্যস্ত তিলোত্তমার চেহারাটাই যেন বদলে যায়। কর্মব্যস্ত নগর জীবন ভিড় করে পাড়ার ক্লাবে, টিভির সামনে। তারপর একসঙ্গে চিৎকার ‘গোওললল’। প্রিয় দলের ডার্বি জয় যেমন কয়েকদিন পাড়ার চায়ের দোকানে বুক ফুলিয়ে আড্ডা দেবার রসদ তেমনই পছন্দের দল হেরে গেলে মুখ দেখানো মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ফুটবল ঘিরে এহেন আবেগ, উন্মাদনা এই বঙ্গভূমি ছাড়া আর কোথায় পাওয়া যাবে!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাপের আবেগ বর্তায় ছেলের উপরে! ফুটবল আসলে যুদ্ধের পরম্পরা?

World Cup Football 2022: জয়ী দলের সমর্থকেরা ততক্ষণে পরাজিতের আপাত-দুর্ভেদ্য রক্ষণে ঢুকে পড়ে মহাকাব্যের এগারোজন নায়ককে কাঁধে তুলে নেয়। এই মহান কৃতিত্ব অনেক ঘাম, অশ্রু, রক্তপাতের সাক্ষী।

বাঙালির ফুটবল উন্মাদনার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর সূচনা হয়েছিল ১৩৬ বছর আগে। পরাধীন ভারতে। শুরুটা করেছিলেন নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী নামের এক বাঙালি ছাত্র, ১৮৭৮ সালে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এসেছেন একাধিক শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। তাঁদেরই মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্যার দুখীরাম মজুমদার। বাংলার ময়দানের প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনিই। নিজেকে তো বটেই, সারাজীবন মন প্রাণ ঢেলে গড়েপিটে তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন তাবড় তাবড় খেলোয়াড়দের। বড় ফুটবলার না হয়েও যে বড় কোচ হওয়া যায়, সেকথাই প্রমাণ করেছিলেন দুখীরাম। নিজের গোলের সংখ্যা বেশি বাড়াননি ঠিকই তবে গোল দেওয়ার মতো অসংখ্য পা তৈরি করেছেন তিনি।

ফুটবলের ময়দানে বড় মাপের কোচ ছিলেন দুখীরাম। তাঁর কোচিংয়ে ভারতীয় ফুটবলে জায়গা পাকা করেছে অসংখ্য মণিমুক্তো – ইস্টবেঙ্গলের সূর্য চক্রবর্তী, মোহনবাগানের করুণা ভট্টাচার্য ছাড়াও সামাদ, বলাই চট্টোপাধ্যায়, কার্তিক বসু, রিচে মিত্তিরের মতো অসংখ্য ফুটবলার। কমল ভট্টাচার্যের ক্রিকেটার হওয়ার পিছনেও ওঁর বিরাট অবদান। এই কারণেই পেয়েছিলেন ‘স্যার’ উপাধি। ওঁর নামে এরিয়ান ক্লাবে কোচিং সেন্টারও রয়েছে– ‘স্যার দুখীরাম কোচিং সেন্টার’। দুখীরাম নিজেও এরিয়ান ক্লাব প্রতিষ্ঠাতাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে একদিন ফুটবলই ছিল ভারতীয়দের অন্যতম হাতিয়ার। ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বদলা নেওয়ার এর থেকে সহজ উপায় সেকালে আর ছিল না। ময়দানে ইংরেজদের পায়ে লাথি মারার শাস্তি স্বরূপ জেল খাটতে হতো না বাঙালিদের। তাই বুট পায়ে ময়দানে ইংরেজদেরকে ছেড়ে কথা বলার কোনও প্রশ্নই ছিল না, খালি পায়ে হলেও জোর কদমে লেগে থাকাটাই ছিল দস্তুর। দুখীরামও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফুটবলে নায়কের জেল্লা বেশিদিন থাকে না

World Cup 2026: ফুটবলের অর্গ্যাজম হলো গোল। অর্গ্যাজমের মতোই, প্রতি ম্যাচে গোল দেখতে পাওয়াটাও আজকালকার ফুটবলে দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

এহেন দুখীরাম মজুমদার একদিন জানতে পারেন, তাঁর ভাইপো ছোনে মজুমদার নাকি ইংরেজদের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে পা বাঁচিয়ে খেলেছেন পায়ে জুতো ছিল না বলে। ব্যাস! ভাইপোকে শাস্তি দিতে স্কিপিংয়ের দড়ি দিয়ে পোস্টের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধলেন। ছোনে মজুমদার তো কিছুই বুঝতে পারছেন না। বোঝার কথাও না। ঘটল সম্পূর্ণ পৃথক একটি ঘটনা। স্যার দুখীরাম ধুতি গুটিয়ে পায়ে স্পাইক বুট পরলেন, আর তারপর যেভাবে বাঁশি বাজিয়ে খেলা শুরু হয়, সেই ভাবে বাঁশি বাজিয়ে স্পাইক বুট দিয়ে ভাইপোর পায়ে টানা লাথাতে থাকলেন। টানা ৪৫ মিনিট লাথি মেরে হাফ টাইমের বাঁশি বাজালেন। এখানেই শেষ নয়, কড়া হুমকি দিলেন "ভবিষ্যতে পা বাঁচিয়ে খেললে ফুল টাইম লাথি খেতে হবে" ছোনেকে।

আরও শোনা যায়, ছোনে মজুমদার অসাধারণ ফুটবলার ছিলেন। কিন্তু এক পায়ের। বাঁ পা-টা ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু কাকা দুখীরাম মজুমদারের এ মোটেও পছন্দ ছিল না। তাই ইট মেরে ভাইপোর বাঁ-পায়ে গুরুতর আঘাত করেছিলেন। তারপর টানতে টানতে ভাইপোকে মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন ফুটবল খেলতে। এইভাবে ভাইপোর সচল বাঁ-পা কে অচল করে দিয়ে, অচল ডান পা কে সচল করে তুলেছিলেন দুখীরাম।

পরবর্তীকালে উত্তরসূরি হিসাবে ‘স্যার দুখীরাম কোচিং সেন্টার’-এর দেখভাল করতেন ছোনে মজুমদারই। প্যান্ট, শার্টের সঙ্গে কাঁধে শাল রাখতেন তিনি। একসময় এই সেন্টার ছিল বাংলার ফুটবলের ভিত তৈরির আস্তানা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে সেই ঐতিহ্য। আগের মতো রমরমা নেই স্যার দুখীরাম কোচিং সেন্টারের। কিন্তু সেই কোচিং সেন্টারের নেপথ্যে রয়ে গেছে অসংখ্য গল্পগাথা।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাঙালি এখন দেশিয় ফুটবলের মায়া কাটিয়ে বিদেশি ফুটবলের উত্তেজনায় সামিল হয়। তাতে অবশ্য দোষের কিছুই নেই। খেলার আবেগটুকু টিকে থাকলেও তো কম কিছু নয়! তবে বছর শুরুর ডার্বি ম্যাচের উত্তেজনার মতো যদি বাংলার ফুটবলের ইতিহাস নিয়ে বাঙালির খানিক উৎসাহ থাকে, তবে হয়তো কালের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া দুখীরাম মজুমদারদের নাম আবারও চর্চায় ফিরে আসতে পারবে!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।