গ্লেনারিজ: যে চুম্বক লাখো মানুষকে ফিরিয়ে আনে দার্জিলিংয়ে

গ্লেনারিস বেকারি, ক্যাফে এবং কেক শপ সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা অবধি খোলা থাকে। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই রেস্তোরাঁটিতে রয়েছে ফ্রি ইন্টারনেটের সুবিধাও।

Arunima Mukherjee
৪ মিনিট
গ্লেনারিজ: যে চুম্বক লাখো মানুষকে ফিরিয়ে আনে দার্জিলিংয়ে

পাহাড় ঘেরা দার্জিলিং শহরের কোলে অবস্থিত সেকালের-একালের গ্লেনারিস। এই গ্লেনারিসের জনপ্রিয়তা এতখানি যে, সদ্য দার্জিলিং থেকে ঘুরে আসা লোকটির সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোফাইলে সবুজ কিংবা নীলচে পাহাড়ের ছবি থাকুক বা নাইই থাকুক– আলো-জ্বলজ্বলে ‘হোপ’ লেখা রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি একখানা অবশ্যই থাকবে। বলতে গেলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্লেনারিসই যেন দার্জিলিং-এর পরিচয় বাহক হয়ে উঠছে।

কুয়াশামাখা দার্জিলিং ম্যাল থেকে গুটি গুটি পায়ে নেহরু রোডে পৌঁছলেই চোখে পড়বে আলোকোজ্জ্বল গ্লেনারিস। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁর রূপ যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায়। তাই সকাল এবং সন্ধ্যার গ্লেনারিসের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। গ্লেনারিসের অদ্ভুত মায়া যেমন সদলবলে দার্জিলিং-এ ঘুরতে যাওয়া উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের মন জয় করবে, তেমনভাবেই আবার সান্ধ্যকালীন আসরে গানে গানে মন ভরবে দলছুট পাখিদেরও। তাই সেই ১৯৩৫ সাল থেকে গ্লেনারিস একইভাবে, অবিচ্ছিন্ন গতিতে দার্জিলিং-এ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। বর্তমানের দার্জিলিং শহরে রোজ গজিয়ে ওঠা হাজারও নতুন রেস্তোরাঁর ভিড়ে গ্লেনারিস কিন্তু আজও দার্জিলিংগামী প্রতিটা পর্যটকেরই অন্যতম ডেস্টিনেশন। প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি পুরনো এই রেস্তোরাঁর পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক ইতিহাস। দেখে নেওয়া যাক, কেন কেবল গ্লেনারিসের জন্যও একবার ছুটে চলে যাওয়া যায় দার্জিলিং-এ।

অতীত গ্লেনারিস

আজকের গ্লেনারিসের সঙ্গে কিন্তু তাঁর প্রথম অবস্থার আকাশপাতাল তফাৎ রয়েছে। একথা কমবেশি প্রায় সকলেরই বোধহয় জানা যে, গ্লেনারিস যেমন তার কেকের জন্য বিখ্যাত, ঠিক একইভাবে বিখ্যাত ব্রিটিশ ব্রেকফাস্টের জন্য। মনে করা হয়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতে ইংরেজদের প্রাতরাশের চাহিদা মেটানোর উদ্দেশেই এককালে তৈরি হয়েছিল এই রেস্তোরাঁটি। গ্লেনারিসের সূচনা হয় একজন ইতালিয়ান ব্যক্তির হাত ধরে, তখন রেস্তোরাঁটির নাম ছিল ‘ভাদো’ এবং পরবর্তী সময়ে আবার ভাদোর পরিবর্তে আসে ‘প্লিভা’ নামটি। ভারতের স্বাধীনতার পর এই রেস্তোরাঁটি পাটনার এক পরিবার কিনে নেয় এবং ১৯৫৯ সালে টি এডওয়ার্ড নামের এক ব্যক্তি, যিনি কর্মসূত্রে ১৯৪৫ সাল থেকে দার্জিলিংয়েই ছিলেন, তাঁকে ম্যানেজার হিসাবে নিয়োগ করা হয় এই গ্লেনারিসে। এইখানেই যে অতীত গ্লেনারিসের হস্তান্তরের ইতি ঘটেছিল তা কিন্তু নয়, অবশেষে এই টি এডওয়ার্ড-এর পরিবার কিনে নেয় রেস্তোরাঁটি।

এরপর থেকেই গ্লেনারিসের ভোল পাল্টে যেতে থাকে। রেস্তোরাঁর নতুন মালিক পরিবারের লোকরা গোটা রেস্তোরাঁটিকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং এই রেনোভেশনের ফলস্বরূপ আজকের গ্লেনারিস, গ্লেনারিস হিসেবে নতুন রূপ পায়। অতীত কাল থেকে চলে আসা একটি রেস্তোরাঁকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো এবং বিশেষ করে তার নাম বদলে দেওয়া– এই সমগ্র বিষয়টা কিন্তু একেবারেই সোজা ছিল না, কিন্তু ওই যে কথায় আছে না, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়, ঠিক সেইভাবেই এডওয়ার্ড পরিবারের সদস্যরা ঠিক করেন, নাম বা রূপ বদলালেও রেস্তোরাঁটির সবকিছু থাকবে ঠিক আগের মতোই। এরপর থেকে আজ অবধি গ্লেনারিসকে কখনও ফিরে তাকাতে হয়নি। আপনারা হয়তো জানলে অবাক হবেন, পরিবারের কাছে এখনও প্রথম দিনের বিক্রির তালিকাটি রাখা আছে এবং সেই তালিকা অনুযায়ী প্রথমদিনেই নতুন রূপে অবস্থান করা গ্লেনারিসে বিক্রিবাটা হয়েছিল ৩৯৬ টাকার।

নতুন ছবি তোলার ঠিকানা এই বারান্দা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র তিনদিনেই দার্জিলিং জমজমাট! চেনা জায়গায় অচেনা সফরের স্বাদ পেতে ঘুরে আসুন

মাত্র তিনদিনে চেনা দার্জিলিংকে নতুন করে চিনুন

আজকের গ্লেনারিস

সাদা ধবধবে দোতলা রেস্তোরাঁটি বর্তমানে তিনটি ভাগে বিভক্ত। গ্লেনারিসের বেকারি বিভাগটি নীচতলায় অবস্থিত, গ্লেনারির ক্ল্যাসিক রেস্তোরাঁটি রয়েছে উপরের তলায় এবং বেসমেন্টে রয়েছে একটি আধুনিক পাব বা ট্যাভার্ন, যাকে আবার ‘বাজ’ বলা হয়ে থাকে। বেকারি, রেস্তোরাঁ এবং পাব-সমন্বিত এই তিনটি ইউনিট- একত্রে The Glenary’s Bakery and Café নামে পরিচিত।

গ্লেনারিস বেকারি

এক বিরাট আকারের কাঠের ফ্রেমযুক্ত কাচের দরজার ওপারেই অবস্থান করছে বিখ্যাত বেকারি বিভাগ। এই বিভাগে আওনি কেক ছাড়াও নানা রকমের বেকড আইটেম পাওয়া যাবে। আপনি চাইলে বাঁদিকে রাখা সারি সারি সোফায় বসে যেমন সেই রকমারি আইটেমগুলি উপভোগ করতে পারেন, তেমনই আবার চাইলে আত্মীয়-পরিজনদের জন্য প্যাকেট করে নিয়েও আসতে পারবেন। অতীতকাল থেকেই এই রেস্তোরাঁ বিখ্যাত সকালের জলখাবারের জন্য। রৌদ্রোজ্জ্বল তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সকালের খাবার আস্বাদনের উদ্দেশ‍্যেই একটি ব্যালকনিরও ব্যবস্থা রয়েছে এই রেস্তোরাঁয়। সকালের খাবার হিসেবে আপনি পেয়ে যাবেন রোল, পিৎজা, বার্গার, পাই, কেক, পেস্ট্রি- এছাড়াও সঙ্গে থাকতেই পারে দার্জিলিং-এর স্বাদে, গন্ধে জগৎবিখ্যাত চা কিংবা কফি অথবা হট চকোলেট। এই ক্যাফেতে রয়েছে পুরনো দিনের লাল রঙের একটি টেলিফোন বুথ। এই টেলিফোন বুথ যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে জানান দেয় গ্লেনারিসের বয়স।

গ্লেনারিজের বারান্দা

রেস্তোরাঁ

ওপরতলায় অবস্থিত রেস্তোরাঁটি একটি মাল্টি-কুইজিন রেস্তোরাঁ। এখানে যেমন আপনি তন্দুর-জাতীয় ভারতীয় খাবার যেমন পাবেন, তেমনই পাবেন নানারকম সসে ঠাসা চাইনিজ খাবার, ঠিক তেমনভাবেই স্টেক, সিজলার-সহ নানাবিধ কন্টিনেন্টাল খাবারের লোভও আপনি সামলাতে পারবেন না। রেস্তোরাঁর টেবিলে পাতা লিনেন কাপড়ের টেবিল ক্লথ যেমন ভারতীয় সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে, ঠিক সেইভাবেই রেস্তোরাঁর আসবাবপত্রগুলিতে ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট। এককথায়, গ্লেনারিস অনবদ্য।

পাহাড়ে সন্ধে নামে খুব তাড়াতড়ি আর রাত্রি আসে তার চেয়েও দ্রুত পায়ে। সেই কারণেই গ্লেনারিস বেকারি, ক্যাফে এবং কেক শপ সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা অবধি খোলা থাকে। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই রেস্তোরাঁটিতে রয়েছে ফ্রি ইন্টারনেটের সুবিধাও। রেস্তোরাঁয় আগত পর্যটকদের যেন ইন্টারনেট পরিষেবা পেতে কোনওরকম অসুবিধে না হয়, সেই কথা মাথায় রেখেই ক্যাফের ডানদিকে ৬টি পিসিও-র বন্দোবস্ত রয়েছে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।