তালিবান শাসনে কেমন আছে আফগানিস্তানের মেয়েরা? জানলে শিউরে উঠতে হবে

২০২১-এর ১২ আগস্ট আফগানিস্তানের ইতিহাসের কালো দিন। সেই দিনই আফগানিস্তানের সরকারের পতন ঘটিয়ে কাবুলের দখল দিয়েছিল তালিবান। প্রায় এক বছর হতে চলল কাবুল শাসন করছে তালিবান।কিন্তু যে প্রশ্ন বারবার বিশ্ববাসীকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তালিবান শাসনে কেমন আছে সেখানকার মেয়েরা?

 

বিভিন্ন সমীক্ষার রিপোর্টে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে স্টেট ইউনিভার্সিটির মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট বলছে, তালিবান কাবুল দখলের পর থেকেই আফগানিস্তানের নারী-স্বাধীনতা সূর্যাস্তের পথে। কিন্তু আফগানিস্তান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরই আন্তর্জাতিক মহলে তালিবানের প্রতিনিধিরা তাঁদের অসংজ্ঞায়িত ইসলামিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কাজ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে সম্মান করা হবে। কিন্তু শেষ কয়েক মাসে তালিবানের কার্যকলাপ বলছে, আফগানিস্তানের তালিবান শাসনে নারীদের অবস্থা এতটুকুও বদলায়নি। অতীতে ঠিক যেভাবে নারীদেরকে সামাজিক নিপীড়ণের শিকার হতে হতো, এখনও অবস্থাটা ঠিক একই আছে।

 

দু'-একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে বিষয়টা। কাবুলের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেওয়ার পর থেকেই তালিবান কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তানে মেয়েদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি তথ্য বলছে, নারীদেরকে জানানো হয়েছে, তারা তাদের পুরুষ অভিভাবক ছাড়া কর্মক্ষেত্র বা অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। গত তিন মাসে বারো বছরের বেশি বয়সি মেয়েদের স্কুলে যেতে দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ছবি। সেখানেও মহিলাদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে নেমে এসেছে তালিবানি ফতোয়া। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, আগ্রাসন নেমে এসেছে কর্মক্ষেত্রেও। বিনোদন ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম- কোথাওই নারীর স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি আফগানিস্তানের তালিবান সরকার।

 

আরও পড়ুন: নয়া তালিবানি ফতোয়ায় বোরখার আড়ালে আফগান নারী! ফের ফিরবে কালো দিন?

 

সম্প্রতি আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করেছে তালিবান সরকার। হিজাব বাধ্যতামূলক হওয়ার পরই আফগানিস্তানে মেয়েদের অবস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন পাকিস্তানের নোবেলজয়ী সমাজকর্মী মালালা ইউসুফজাই। ট্যুইটে মালালা লিখেছেন, "তালিবান সরকার আফগানিস্তানের সমস্ত নাগরিক জীবন থেকেই মহিলাদের মুছে দিতে চায়। একদিকে যেমন তারা চায় মহিলারা স্কুলে পড়বে না, কাজে যাবে না, ঠিক তেমনই আবার পুরুষ সঙ্গী ছাড়া তারা জনসমক্ষে বেরবেও না। এখন হিজাব বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়েই তালিবান সরকার নারীস্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে দিল।" এখানেই না থেমে মালালা সমস্ত দেশের নাগরিক এবং রাষ্ট্রনেতাদের আফগানিস্তানে মেয়েদের লড়াইয়ের ‌পাশে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, "ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তালিবান একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চলেছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শিকার আফগানিস্তানের নারীরা। আজ তারা রাস্তায় নেমে এসেছে নিজেদের ক্ষমতার অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। সারা বিশ্বের, বিশেষত আমাদের মতো প্রত্যেকটি মুসলিম দেশের নাগরিক এবং নেতাদের উচিত, তাদের এই লড়াইকে সমর্থন জানানো‌।"

 

তালিবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানের গার্হস্থ নির্যাতন নিয়ে কাজ করা কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র গার্হস্থ হিংসা নয়, নারীদের ওপর আক্রমণও বেড়েছে বিস্তর। ডিসেম্বর মাসের শুরুতে কান্দাহারের কানাডিয়ান সশস্ত্রবাহিনীর হয়ে কাজ করা একজন ব্যক্তির ১০ বছর বয়সি মেয়েকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে তালিবান সেনা। আফগানিস্তানে মেয়েদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে আন্তর্জাতিক ডেটা কালেকশন সংস্থা আরআইডাব্লুআই একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। সংস্থাটি ২৭ আগস্ট থেকে ১ নভেম্বর ২০২১-এর মধ্যে ১৫ বছর বয়সি ১২,০০০ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেই সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, স্কুলে পড়া মেয়েদের মধ্যে প্রায় দুই পঞ্চমাংশ তালিবান ক্ষমতায় আসার পর স্কুলছুট হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ শতাংশের মতো ব্যক্তির দাবি, তাঁদের এলাকায় মেয়ে বা মহিলাদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আবার কিছু অংশের বক্তব্য, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাইরে নিরাপত্তার কারণে তারা যাওয়ার সাহস দেখিয়ে উঠতে পারেনি। সমীক্ষার রিপোর্টে এটুকু অন্তত স্পষ্ট, কীভাবে তালিবান শাসনে নারী ও মেয়েদের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

 

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী হেথার বার জানিয়েছেন, "তালিবান নিজেদের ক্ষমতা কায়েম করার জন্য নারী এবং মেয়েদের গৃহবন্দি করে রেখেছে। আফগানিস্তানের মতো দেশে নারী এবং মেয়েদের মানব সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারাটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই বিধিনিষেধ আফগানিস্তানকে মানবসম্পদ উন্নয়নে ক্রমাগত নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।"

 

ভয়ানক মানবাধিকার সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আফগানিস্তান। এক্ষেত্রে বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশ এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ এগিয়ে না এলে আফগানিস্তানের নারীর স্বাধীনতা চিরতরে হারিয়ে যাবে।

 

More Articles

;