তালিবান শাসনে কেমন আছে আফগানিস্তানের মেয়েরা? জানলে শিউরে উঠতে হবে

তালিবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানের গার্হস্থ নির্যাতন নিয়ে কাজ করা কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র গার্হস্থ হিংসা নয়, নারীদের ওপর আক্রমণও বেড়েছে বিস্তর।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
তালিবান শাসনে কেমন আছে আফগানিস্তানের মেয়েরা? জানলে শিউরে উঠতে হবে

২০২১-এর ১২ আগস্ট আফগানিস্তানের ইতিহাসের কালো দিন। সেই দিনই আফগানিস্তানের সরকারের পতন ঘটিয়ে কাবুলের দখল দিয়েছিল তালিবান। প্রায় এক বছর হতে চলল কাবুল শাসন করছে তালিবান।কিন্তু যে প্রশ্ন বারবার বিশ্ববাসীকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তালিবান শাসনে কেমন আছে সেখানকার মেয়েরা?

বিভিন্ন সমীক্ষার রিপোর্টে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে স্টেট ইউনিভার্সিটির মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট বলছে, তালিবান কাবুল দখলের পর থেকেই আফগানিস্তানের নারী-স্বাধীনতা সূর্যাস্তের পথে। কিন্তু আফগানিস্তান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরই আন্তর্জাতিক মহলে তালিবানের প্রতিনিধিরা তাঁদের অসংজ্ঞায়িত ইসলামিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কাজ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে সম্মান করা হবে। কিন্তু শেষ কয়েক মাসে তালিবানের কার্যকলাপ বলছে, আফগানিস্তানের তালিবান শাসনে নারীদের অবস্থা এতটুকুও বদলায়নি। অতীতে ঠিক যেভাবে নারীদেরকে সামাজিক নিপীড়ণের শিকার হতে হতো, এখনও অবস্থাটা ঠিক একই আছে।

দু'-একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে বিষয়টা। কাবুলের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেওয়ার পর থেকেই তালিবান কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তানে মেয়েদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি তথ্য বলছে, নারীদেরকে জানানো হয়েছে, তারা তাদের পুরুষ অভিভাবক ছাড়া কর্মক্ষেত্র বা অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। গত তিন মাসে বারো বছরের বেশি বয়সি মেয়েদের স্কুলে যেতে দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ছবি। সেখানেও মহিলাদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে নেমে এসেছে তালিবানি ফতোয়া। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, আগ্রাসন নেমে এসেছে কর্মক্ষেত্রেও। বিনোদন ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম- কোথাওই নারীর স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি আফগানিস্তানের তালিবান সরকার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নয়া তালিবানি ফতোয়ায় বোরখার আড়ালে আফগান নারী! ফের ফিরবে কালো দিন?

পর্দা প্রথা মেয়েদের নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করেছে তালিবান সরকার। হিজাব বাধ্যতামূলক হওয়ার পরই আফগানিস্তানে মেয়েদের অবস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন পাকিস্তানের নোবেলজয়ী সমাজকর্মী মালালা ইউসুফজাই। ট্যুইটে মালালা লিখেছেন, "তালিবান সরকার আফগানিস্তানের সমস্ত নাগরিক জীবন থেকেই মহিলাদের মুছে দিতে চায়। একদিকে যেমন তারা চায় মহিলারা স্কুলে পড়বে না, কাজে যাবে না, ঠিক তেমনই আবার পুরুষ সঙ্গী ছাড়া তারা জনসমক্ষে বেরবেও না। এখন হিজাব বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়েই তালিবান সরকার নারীস্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে দিল।" এখানেই না থেমে মালালা সমস্ত দেশের নাগরিক এবং রাষ্ট্রনেতাদের আফগানিস্তানে মেয়েদের লড়াইয়ের ‌পাশে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, "ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তালিবান একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চলেছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শিকার আফগানিস্তানের নারীরা। আজ তারা রাস্তায় নেমে এসেছে নিজেদের ক্ষমতার অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। সারা বিশ্বের, বিশেষত আমাদের মতো প্রত্যেকটি মুসলিম দেশের নাগরিক এবং নেতাদের উচিত, তাদের এই লড়াইকে সমর্থন জানানো‌।"

তালিবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানের গার্হস্থ নির্যাতন নিয়ে কাজ করা কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র গার্হস্থ হিংসা নয়, নারীদের ওপর আক্রমণও বেড়েছে বিস্তর। ডিসেম্বর মাসের শুরুতে কান্দাহারের কানাডিয়ান সশস্ত্রবাহিনীর হয়ে কাজ করা একজন ব্যক্তির ১০ বছর বয়সি মেয়েকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে তালিবান সেনা। আফগানিস্তানে মেয়েদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে আন্তর্জাতিক ডেটা কালেকশন সংস্থা আরআইডাব্লুআই একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। সংস্থাটি ২৭ আগস্ট থেকে ১ নভেম্বর ২০২১-এর মধ্যে ১৫ বছর বয়সি ১২,০০০ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেই সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, স্কুলে পড়া মেয়েদের মধ্যে প্রায় দুই পঞ্চমাংশ তালিবান ক্ষমতায় আসার পর স্কুলছুট হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ শতাংশের মতো ব্যক্তির দাবি, তাঁদের এলাকায় মেয়ে বা মহিলাদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আবার কিছু অংশের বক্তব্য, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাইরে নিরাপত্তার কারণে তারা যাওয়ার সাহস দেখিয়ে উঠতে পারেনি। সমীক্ষার রিপোর্টে এটুকু অন্তত স্পষ্ট, কীভাবে তালিবান শাসনে নারী ও মেয়েদের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী হেথার বার জানিয়েছেন, "তালিবান নিজেদের ক্ষমতা কায়েম করার জন্য নারী এবং মেয়েদের গৃহবন্দি করে রেখেছে। আফগানিস্তানের মতো দেশে নারী এবং মেয়েদের মানব সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারাটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই বিধিনিষেধ আফগানিস্তানকে মানবসম্পদ উন্নয়নে ক্রমাগত নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।"

ভয়ানক মানবাধিকার সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আফগানিস্তান। এক্ষেত্রে বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশ এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ এগিয়ে না এলে আফগানিস্তানের নারীর স্বাধীনতা চিরতরে হারিয়ে যাবে।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।