আদৌ ভারতে জন্ম নয় ইডলির! কীভাবে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই পদ?

The origin of Idli : দক্ষিণ ভারতীয় খাবার হিসেবেই জানেন ইডলিকে, জন্ম রহস্য তো বলছে অন্য কথা! কীভাবে এ দেশে ছড়িয়ে পড়ল এই পদ?

Kankana Mukherjee
৪ মিনিট
আদৌ ভারতে জন্ম নয় ইডলির! কীভাবে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই পদ?

হরদম কোলাহল, ব্যস্ত অফিস পাড়া, আর টিফিন টাইম, এই তিনটের সঙ্গেই মিলে যায় কিছু জনপ্রিয় খাবারের অনুষঙ্গ। ভরপেট মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে আবার অফিসের কাজে ফেরা, আর এর মাঝেই ভিড় জমে রাস্তার ধারের ঘুমটি দোকানগুলোতে। ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁর সঙ্গে অবশ্য মেলে না এই ছবিটা, এখানে একটা প্যাচপ্যাচে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ আছে, জমাটি আড্ডা আছে, প্রচণ্ড ব্যস্ততা আছে, আর তারই মাঝে সবথেকে বেশি করে জমিয়ে যেটা আছে সেটা হল পরিচিত কিছু খাবারের গন্ধ। একটা সময় পর্যন্ত কেবল বাঙালি খাবার অথবা কিছু শুকনো খাবার এই ছিল কলকাতার অফিস পাড়াগুলির তালিকায়। পরে অবশ্য সময় এবং চাহিদার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বদলে যায় সেই রেওয়াজ। আর সেই বদলে যাওয়া সময়ের হাত ধরেই মাছে ভাতে বাঙালির খাদ্য তালিকায় ঢুকে পড়ে ইডলি, ধোসা, বড়া, সম্বর ইত্যাদি।

আজ থেকে বছর দশেক আগেও বাংলায় সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি ইডলি। তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কলকাতা তথা পার্শ্ববর্তী এলাকার জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডের মধ্যে পড়ে এটি। ব্যস্ত শহরের মোড়ে মোড়ে দেখা মেলে ইডলির দোকান। স্টিলের বড় একটা ক্যানের মধ্যে আগে থেকেই তৈরি করা থাকে ইডলি। শহরতলীর কিছু জায়গায় আবার সাইকেলে করে ফেরি করতেও দেখা যায় এই খাবারটি। যদি কখনও ঘাটশিলার দিকে বেড়াতে যান, দেখতে পাবেন ওখানে বাসিন্দা থেকে শুরু করে পর্যটক সকলেরই পছন্দের তালিকায় সবার আগে আসে এই ইডলি।

দেখতে সাদা রঙের এক প্রকার পিঠের মতো, ভাপিয়ে রান্না করা হয় এই পদ। আর পরিবেশন করা হয় দারুণ স্বাদের কারিপাতা, নারকেল এবং ছোলার ডালের চাটনি সহযোগে। খান কয়েক খেলেই পেটচুক্তি আহার। তার ওপর আবার এক্কেবারে ওয়েল ফ্রি! ফলে স্বাস্থ্যের দিকেও যথেষ্ট খেয়াল রাখে এই জনপ্রিয় পদটি। শুধু রাস্তার ধারের ছোটখাটো দোকানই নয়, পাশাপাশি আজকাল শহরের বিভিন্ন প্রান্তেই গজিয়ে উঠেছে বেশ কিছু নামজাদা রেস্তোরাঁ, যেখানে মেনুতে রয়েছে ইডলি। সময়ের সঙ্গে মানুষের মধ্যে ক্রমেই জনপ্রিয়তা বেড়েছে এই পদটির।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সঙ্গে তড়কা অথবা সামান্য আচার, ব্যাস! জানেন কীভাবে ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠল তন্দুরি রুটি?

Tandoori Roti : কোথা থেকে এল তন্দুরি রুটি? কীভাবেই বা লক্ষ লক্ষ মানুষের রসনা তৃপ্তি ঘটালো এই পদ?

বাংলায় জনপ্রিয়তা পেলেও এই পদ যে বাংলার নয় সে কথা অবশ্য কম বেশি সকলেই জানেন। দক্ষিণ ভারতীয় খাবার হিসেবেই চেনেন একে, কিন্তু জানেন কি বাংলা তো নয় এমনকী ভারতের দক্ষিণ প্রান্তেও জন্ম নয় এই পদটির। বাস্তবে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার হিসেবে পরিচিত ইডলি আসলে ভারতীয়ই নয়! কথাটা শুনে হয়তো অবাক হচ্ছেন ঠিকই, তবে এটাই সত্যি। এর পিছনে রয়েছে প্রাচীন এক ইতিহাস। আসুন জেনে নেওয়া যাক কবে কোথায় কীভাবে তৈরি হয়েছিল হালফিলের ইডলি, কীভাবেই বা ভারতে ঢুকে পড়ে এত জনপ্রিয়তা পেল এটি?

কর্ণাটকের একজন বিখ্যাত খাদ্য বিশারদ, পুষ্টিবিদ এবং খাদ্য ইতিহাসবিদ কে. টি আচার্যের মতে, ইডলির উৎপত্তি বর্তমান ইন্দোনেশিয়ায়। সময়টা ওই ৭০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। ওই অঞ্চলে এই পদটি ‘কেডলি’ বা ‘কেদারি’ নামে পরিচিত ছিল। পাশাপাশি এও জানা যায়, এই সময়ে ইন্দোনেশিয়া শাসন করেছিলেন বেশ কিছু হিন্দু রাজা। তাঁরাই ছুটির দিনে তাঁদের আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে বা নিজের জন্য পাত্রী খুঁজতে ভারতে আসতেন, আর সেই সময়ে তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন ও দেশের রাজকীয় শেফদেরও। আর সেই শেফদের হতেই প্রথম ভারতে এসেছিল এই কেদারি বা কেডলি নামক পদটি। সুতরাং, ইন্দোনেশিয়ান রাজপরিবারের রান্নাঘর থেকে সেখানকার দেশীয় রাঁধুনিরা এটি ভারতে নিয়ে আসেন, এমনটাই বিশ্বাস করেন খাদ্য ইতিহাসবিদরা। পরে সময়ের সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে ‘কেডলি’ পদটি এ দেশে পরিচিতি লাভ করে ‘ইডলি’ নামে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পিরামিডের যুগেও ছিল তন্দুরের চল, দেখতে কেমন ছিল প্রাচীন ভারতীয় চুলাগুলি?

Origin Of Tandoor Ovens : তন্দুর চুলা সঙ্গে করে বেড়াতে যেতেন সম্রাট শাহজাহান! কীভাবে ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই পদ?

ভিন্ন আরেকটি মত অনুসারে, ৯২০ খ্রিষ্টাব্দেই কন্নড় গ্রন্থে 'ইড্ডালিজ' এই শব্দটি ব্যবহৃত করা হয়েছে। তাই এই শব্দটি ইঙ্গিত দেয় যে, সে যুগেও এই পদের প্রচলন ছিল। এমনকী ১১৩০ খ্রিস্টাব্দের সংস্কৃত মনসোল্লা-তে ‘ইদ্দারিকা’ নামের উরদ ডালের তৈরি একটি পদের উল্লেখ ছিল।

এছাড়াও ইডলির উৎস সন্ধানে উঠে আসে আরও একটি তথ্য। যাতে বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে এই পদ আরবদের সাথেও যুক্ত। ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফুড হিস্ট্রি’ এবং ‘সিড টু সিভিলাইজেশন - দ্য স্টোরি অফ ফুড’ নামে বই দুটিতে বলা হয়েছে যে, ভারতে বসতি স্থাপনকারী আরবরা স্থানীয় খাবার হালাল না হওয়ার ভয়ে ভাতকে বৃত্তাকার আকৃতি দিয়ে নারকেলের চাটনি দিয়ে খেতেন। এই সিদ্ধ চালের বলগুলি ছিল আকৃতিতে কিছুটা চ্যাপ্টা অর্থাৎ আজকের ইডলির মতো।

আরব অথবা ইন্দোনেশিয়া, যেখান থেকেই আসুক না কেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আদ্যোপান্ত ভারতীয় খাবার হয়ে উঠেছে এই ইডলি। উৎসস্থল ব্যতিরেকে বিচার করলে দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের একটি অংশ হিসেবে যথার্থ স্থান দেওয়া যায় একে। ইডলির উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে, যার মধ্যে রয়েছে ৭ম শতাব্দীতে রচিত কন্নড় -এর “ভাদ্দারধনে” উল্লেখ্যযোগ্য, এই গ্রন্থটিতে ইডলি অর্থাৎ ‘ইদ্দালিজ’ -এর প্রস্তুতির বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। এছাড়া দশম শতকের তামিল পাঠ্য “পেরিয়া পুরানাম”-এও এই খাবারটির উল্লেখ করা হয়েছিল, যা শৈব সাধুদের একটি দল ৬৩ জন নয়নারদের জীবন কাহিনী বর্ণনা করে। এছাড়া আরও একটি ভিন্ন মত অনুযায়ী, গজনি মহম্মদ দশম শতাব্দীতে সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করার পর, সৌরাষ্ট্রীয় বণিকরা দক্ষিণ ভারতে চলে আসেন। তাঁরাই সঙ্গে করে নিয়ে আসেন জনপ্রিয় ইডলির রেসিপি। ‘ইডলি’ নামটি করেন তাঁরাই।

তবে উৎপত্তি যাই হোক না কেন, নিঃসন্দেহে বর্তমানে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ভারতীয় খাবারের মধ্যে একটি। দক্ষিণ ভারত থেকে ক্রমেই সেটি ছড়িয়ে পড়ে ভারতের অন্যত্র। বর্তমানে ডায়েট ফুড হিসেবেও নাম আসে ইডলির। শুধু তাই নয়, চিরাচরিত ডাল চালের ব্যবহার বদলে ভিন্ন ফিউশন এসেছে এই রান্নায়। সময় এগিয়েছে, বদলেছে খাবার তৈরির প্রক্রিয়াও, কেবল বদলায়নি এই স্বাদের মাহাত্ম্য।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।