নুপুর ইস্যুতে উত্তাল দেশ, বিক্ষোভের আঁচ কতটা গনগনে?

 

১. কয়েকদিন আগেই বিজেপি মুখপাত্র নুপুর শর্মা হজরত মহম্মদের বিয়ে নিয়ে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন।

২. তাঁকে সমর্থন করে ট্যুইটারে পোস্ট করেন বিজেপি নেতা নবীন জিন্দাল।

৩. জ্বলে উঠল কানপুর, ফুঁসে উঠল বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ।

৪. দলের মুখপাত্র পদ থেকে নুপুর শর্মাকে সরিয়ে দিল বিজেপি।

ঘটনাপরম্পরা যেভাবে এগোচ্ছিল, তাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারতেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু বাদ সাধল দেশের বর্তমান পরিস্থিতি। শুক্রবার নুপুর শর্মার মন্তব্য নিয়ে আগুনে টগবগ করে ফুটল দেশ। ঘুম উড়ল মোদি-শাহদের। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধ-উপরোধ কাজে এল না বাংলায়। শোনা যাচ্ছে, হাওড়া জেলাজুড়ে বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে। তবে এই বিষয়ে তৎপর প্রশাসন।

প্রশ্ন হল, আমরা হিন্দু- একথা বুক বাজিয়ে বলার জন্য মহম্মদকে নিয়ে মুসলিমদের গায়ে ছ্যাঁকা লাগার মতো মন্তব্য করতে হবে? তেমনটাই তো করলেন নুপুর। তাঁকে দলের মুখপাত্রের পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে, নবীন জিন্দালকে সাসপেন্ড করেও বিক্ষোভের আগুন নিভছে না। এই নিয়ে কার্যত ল্যাজে-গোবরে অবস্থায় বিজেপি। বরং ১০ জুন সারা দেশে দাউ দাউ করে জ্বলল বিক্ষোভের আগুন। বাংলা, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি- বাদ গেল না কোনও প্রান্ত। এর শেষ কোথায়, জানেন না মোদি-শাহ-কেউই।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার বাঁচাতেই নুপুর-ইস্যুতে নীরব মোদি? জানুন আসল কারণ

কোথায় কোথায় বিক্ষোভের আগুন

১. জ্বলছে বাংলা, উত্তাল হাওড়া, বন্ধ ইন্টারনেট: বিক্ষোভ-অবরোধে উত্তাল হাওড়া। উলুবেড়িয়ায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের খণ্ডযুদ্ধ চলছে! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার কড়া পদক্ষেপ করল প্রশাসন। জানা যাচ্ছে, সোমবার পর্যন্ত জেলাজুড়ে বন্ধ থাকবে ইন্টারনেট পরিষেবা।

৯ জুন হাওড়ার ডোমজুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে পথ অবরোধ করে রেখেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। সঙ্গে রাস্তায় টাওয়ার জ্বালিয়ে চলে বিক্ষোভ। ছবিটা বদলাল না এদিনও। উলুবেড়িয়ার বানিতবলা চেকপোস্ট এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যায়। ৬ নম্বর জাতীয় সড়কে পুলিশের গাড়ি-সহ বেশ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। বাদ যায়নি মহকুমা-শাসকের কার্যালয় ও পুলিশের কিয়স্কও।

গতকাল নুপুর শর্মাদের গ্রেফতারির দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছিল অঙ্কুরহাটি ও সংলগ্ন এলাকায়। ১১৬ নং জাতীয় সড়ক প্রায় ১১ ঘণ্টার ওপর অবরুদ্ধ ছিল। এই দিন দফায় দফায় বিক্ষোভে উত্তাল হয় ধুলাগড় অঞ্চল। নানা জায়গা থেকে মিছিল বের হয়। পুলিশ অবরোধ-বিক্ষোভ তুলতে গেলে তাদের ওপরও চলে ইটবৃষ্টি, পাথর নিক্ষেপ। পুলিশের গাড়ি ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও লাঠিচার্জ করে।

বিকেল পর্যন্ত এই অবস্থা দেখে হস্তক্ষেপ করেন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ‍্যায়। দিল্লির ঘটনার জন্য কেন বাংলায় অবরোধ আন্দোলন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। হাত জোড় করে আন্দোলন প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়েছিলেন তিনি।

এর প্রায় চার সাড়ে চার ঘণ্টা পর জাতীয় সড়ক থেকে অবরোধ ওঠে। তবে, তার আগে টায়ার জ্বালিয়ে, মোদীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলে। এই দিন সকালে নুপুরদের গ্রেফতারির দাবিতে পার্ক সার্কাসে প্ল্যাকার্ড হাতে, রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান মুসলমান সম্প্রদায়ের একদল মানুষ। ধুলাগড়েও দুপুরের পর আন্দোলন শুরু হয়। ক্রমেই যা তাণ্ডবে পরিণত হয়েছে।

২. দিল্লির জামা মসজিদে জমায়েত: শুক্রবারের নামাজের শেষে দিল্লির জামা মসজিদের সামনে নুপুর শর্মা ও নবীন জিন্দালের গ্রেপ্তারির দাবি তোলে বিশাল জমায়েত। জামা মসজিদের শাহি ইমাম জানিয়েছেন, তাঁদের তরফে কোনও অবস্থান বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘আমরা জানি না, এটা কারা শুরু করল। নামাজ শেষ হওয়ার পরই কয়েকজন স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। তাঁদের ঘিরে আরও মানুষ জড়ো হন। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকা ফাঁকা করে দেয়। এখন সবই ঠিক আছে।’’

৩. লুধিয়ানা ও প্রয়াগরাজে বিক্ষোভ: এদিন নুপুর শর্মা ও নবীন জিন্দালের মন্তব্যের জেরে উত্তাল হয়ে ওঠে লুধিয়ানা। বিক্ষোভের ডাক দেয় লুধিয়ানা জামা মসজিদ কর্তৃপক্ষ। কাতারে কাতারে মানুষ জড়ো হন পাঞ্জাবের এই শহরে। যাঁরা মহম্মদকে অপমান করেছেন, তাঁদের গ্রেফতারের দাবিতে সরব হন তাঁরা। তাঁদের মুখে স্লোগান, হাতে প্ল্যাকার্ড। তাঁদের আন্দোলনে বিজেপি-বিদ্বেষী সুর। পাঞ্জাবের বিভিন্ন অংশে প্রতিবাদের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারির দাবি জানান তাঁরা।

উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজের নিকটবর্তী অটলা এলাকাও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা কোথাও ছুড়লেন পাথর, কোথাও আবার রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে সরব হলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশবাহিনী ও সিআরপিএফ মোতায়েন করা হয়। বেহাল যোগীর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা।

৪. উত্তাল রাঁচি: মহম্মদকে নিয়ে বিজেপি নেত্রী নুপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে শুক্রবার দেশের একাধিক এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। দিল্লি, কলকাতা, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানার পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে আজ বিক্ষোভ দেখান বেশ কিছু মানুষ। গাড়ি ভাঙচুর থেকে শুরু করে ইটবৃষ্টি, আজ কার্যত উত্তাল হয়ে ওঠে রাঁচি। বিভিন্ন জায়গায় টায়ার পোড়ানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে হেনস্থার শিকার হয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি চলে। বিক্ষোভকারীদের মুখে ছিল মোদি-বিরোধী স্লোগান। এই অশান্তির মাঝে দু'জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

নুপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যর জেরে দেশের একাধিক রাজ্যে আত্মঘাতী হামলার হুমকি আল-কায়দার। নুপুর শর্মাকে বিজেপি সাময়িক বরখাস্ত করলেও বিতর্ক থামেনি। ইসলাম ও হজরত মহম্মদকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর, দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন পার হলেও বিজেপি নেত্রী নুপুর শর্মাকে নিয়ে বিতর্ক লাগামছাড়াভাবে বাড়ছে। ক্ষোভের আগুন নিভে যাওয়া তো দূরের কথা, তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য, আরও একাধিক দেশ ভারতের সমালোচনায় যোগ দিয়েছে। অন্তত ১৫টি দেশ এই ইস্যুতে তাদের সমালোচনা প্রকাশ করেছে। ভারতীয় কূটনীতিবিদদের ওইসব দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রক তলব করেছে। ইরাক, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক-সহ এক ডজনেরও বেশি মুসলিম রাষ্ট্র এই সমালোচনায় যোগ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বিস্ফোরক কথা বলেছে আল-কায়দা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী। আল-কায়দা জানিয়েছে, নবীর সম্মানের জন্য লড়াই করতে দিল্লি, মুম্বই, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাতে তারা আত্মঘাতী হামলা চালাবে।

মোদ্দাকথা হলো, নুপুরকে নিয়ে ঘরে-বাইরে বিজেপি হিমশিম খাচ্ছে। নুপুরকে সরিয়ে বিজেপি মোটেই আগুনে জল ঢালতে পারেনি। দায় ঝেড়ে ফেলেও ঘাড় থেকে দায় নামাতে পারেনি। এখন কী উপায় মোদি-শাহর?

More Articles

;