পাখির চোখ ২০২৪, কোন ফন্দি আঁটছেন প্রশান্ত কিশোর?

নির্বাচন-কুশলী প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক ক্রমশই নিবিড় হয়ে উঠছে। কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পিকে। শনি থেকে সোম, এই তিনদিনে সোনিয়ার সঙ্গে দু'বার বৈঠক করলেন প্রশান্ত কিশোর। সোনিয়া-রাহুলদের সঙ্গে প্রশান্তের ঘন ঘন বৈঠক ঘিরে বাড়ছে জল্পনা। এইসব বৈঠকে কার কতখানি লাভ হবে, তা এখনই বলা মুশকিল, তবে রাজধানীর রাজনৈতিক অলিন্দে জোর জল্পনা, চলতি মাসেই পিকে কংগ্রেসের হাত ধরতে চলেছেন। নীতীশ কুমারের দলের জাতীয় সহ-সভাপতির পদ ছাড়ার পর থেকে পিকে এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যুক্ত নন। ইলেকশন-স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে দেশজুড়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছেন। হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটল যে, বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের চুক্তিভিত্তিক পেশাদার পরামর্শদাতা পিকে বিলীয়মান কংগ্রেসে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন? কী চাইছেন প্রশান্ত কিশোর?

২০২১-এ প্রথমবার প্রশান্ত কিশোরকে দলে আনতে উদ্যোগ নিয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্ব৷ দফায় দফায় বৈঠকও হয়। কিন্তু পিকে-র প্রথম কমিটমেন্ট ছিল তৃণমূল কংগ্রেসকে বাংলায় ক্ষমতায় ফেরানো। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে এ-রাজ্যে তৃণমূলের অন্যতম 'শত্রু' ছিল কংগ্রেস। জাতীয় স্তরে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কোনও এক রাজ্যে নিজের দলকেই নিশ্চিহ্ন করার কৌশল সাজানো কঠিন। তেমন হলে নিজস্ব ব্যবসা এবং নিজের পলিটিক্যাল কেরিয়ার, উভয় ক্ষেত্রেই প্রশান্ত কিশোরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। ফলে তখন পিকে-র কংগ্রেসে যোগদানের বিষয়টি ঠান্ডা ঘরে চলে যায়।

ওদিকে প্রশান্ত কিশোরের ওপর অনেকখানি ভরসা করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় নেত্রী হওয়ার পথে। দলের বিস্তার ঘটাচ্ছেন নানা রাজ্যে। ভিন রাজ্যে ভোটে লড়ছেন। দলের সর্বভারতীয় সংগঠনকে সময়োপযোগী করেছেন। জাতীয় স্তরে পরিচিতি আছে এমন কয়েকজন নেতা-নেত্রীকে দলে নিয়েছেন। এই সব ঘটনার পিছনে প্রশান্ত কিশোরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

আরও পড়ুন: প্রশান্ত কিশোরের জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় কি আদৌ প্রাণ ফিরবে কংগ্রেসের!

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোট বা ফ্রন্ট গঠন করার চেষ্টা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে দেশের বিরোধী নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে বিরোধী জোট গঠন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, চিঠি লিখেছেন। শরদ পাওয়ার, উদ্ধব ঠাকরে, এমকে স্ট্যালিনের মতো নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপি-বিরোধী জোট গঠনের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন এবং সঙ্গে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। মুম্বইয়ে দেশের বিজেপি-বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের কনক্লেভের ঘোষণা করেছেন শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউথ‌। মোটের ওপর, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে শক্তিশালী মহাজোট গঠনের একটা প্রক্রিয়া চলছে এবং এই উদ্যোগের পুরোভাগে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল-সুপ্রিমোর এই পদক্ষেপের সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের বুদ্ধি ও পরামর্শ রয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিজেপি-বিরোধী মহাজোট গঠনের যে প্রক্রিয়া ২০২৪-এর অনেক আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করে দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই উদ্যোগে এখনও কংগ্রেসকে দেখা যাচ্ছে না। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুসম্পর্ক থাকলেও এই জোট গঠনের প্রশ্নে এখনও সেভাবে সক্রিয় নয় কংগ্রেস, বিরোধী দলগুলিও তেমনভাবে ডাকছে না সোনিয়া গান্ধী বা তাঁর দলকে। ফলে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে, কংগ্রেসকে কার্যত বাদ দিয়েই বিজেপি-র বিরুদ্ধে জোট বা লোকসভা নির্বাচনে আসন সমঝোতার যে চেষ্টা চলছে, তার অন্যতম প্রধান মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস। এই তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা প্রশান্ত কিশোর। ওই প্রশান্ত কিশোর আবার জাতীয় কংগ্রেসকে পরামর্শ দিচ্ছেন, কোন পথে এগোলে কংগ্রেস ২০২৪-এর ভোটে চমকপ্রদ ফল করতে পারবে‌। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পিকে কংগ্রেস দলে যোগ দিয়ে বড় দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি। তাহলে কি এমন হতে পারে, কংগ্রেসকে সামনে রেখে বিজেপি-বিরোধী জোট হোক, এমনই ভাবছেন পিকে? যদি তাই হয়, তাহলে তো বলতে হয়, যে দলের তিনি প্রধান পরামর্শদাতা, সেই তৃণমূল কংগ্রেসের অ্যাজেন্ডার বাইরে যাচ্ছেন তিনি। পরামর্শদাতা হিসেবে পিকে যে পরামর্শ তৃণমূলকে দিচ্ছেন, ব্যক্তি পিকে অথবা সম্ভাব্য কংগ্রেস নেতা পিকে সেই পরামর্শ মোকাবিলা করতে নিজেই নেমেছেন। কিছুতেই হিসেব মিলছে না। কেন এমন হচ্ছে? এর একাধিক ব্যাখ্যা ভাবা যেতে পারে।

১) নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে। ২০২৪-এর আগেই গুজরাতে বিধানসভা ভোট। প্রশান্ত কিশোর লোকসভার আগেই গুজরাতে মোদিকে ধাক্কা দিতে চান। অনেকেই জানেন, প্রশান্ত কিশোর নিজে থেকেই যোগাযোগ করেছেন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে। রাহুল গান্ধী গুজরাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরই প্রশান্ত কিশোরের কাছ থেকে প্রস্তাব পান। সোনিয়া এবং রাহুলের সঙ্গে সাম্প্রতিক একাধিক বৈঠকে পিকে গুজরাতে কংগ্রেসের ভোট-কৌশল কী হবে, তার প্রাথমিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করেছেন। কংগ্রেস কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনও জানা যায়নি। কিন্তু এটাও তো ঠিক, প্রশান্ত কিশোর আগ বাড়িয়েই গুজরাত নিয়ে কংগ্রেসকে পরামর্শ দিয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের বুঝিয়েছেন, কোন পথে মোদিকে নিজের ভূমেই চিৎপাত করা সম্ভব। এর অর্থ, পিকে জানেন, একমাত্র কংগ্রেসই গুজরাতে বিজেপি-বধ করতে পারে। তৃণমূল বা অন্য কোনও দলের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। হতে পারে, পিকে মোদির বিরুদ্ধে নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতেই গুজরাতে কংগ্রেসকে পরামর্শ দিতে এত আগ্রহী।

২) গুজরাতে মোদিকে হারিয়ে এবং লোকসভা ভোটে ৩৭০ আসনে লড়াই করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া অথবা বিরোধী জোটে 'বড় ভাই'-এর আসন দখলের প্রাথমিক ফরমুলা পিকে দিয়েছেন সোনিয়া-রাহুলকে। সোনিয়া গান্ধী অসুস্থ। এর অর্থ, জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী প্রধান মুখ হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের পছন্দ সেই রাহুল গান্ধী, যাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিরোধী নেতা মানতে আদৌ রাজি নন। তাহলে পিকে এমন ভাবছেন কেন? অনুমানভিত্তিক উত্তর একটা আছে, উত্তরটি স্পর্শকাতর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিরোধী নেতা বেশ কিছুদিন আগেই বলেছেন, কংগ্রেসকে বাদ দিয়েই বিজেপি-বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তাহলে কি এই ডাকে বিশ্বাস রাখছেন না প্রশান্ত কিশোর? এমন কি হতে পারে, অভিজ্ঞ প্রশান্ত কিশোর বিজেপি-বিরোধী মহাজোটের অন্যতম মুখ হিসেবে তৃণমূল সুপ্রিমো-র ওপর সেভাবে আস্থা রাখতে পারছেন না? পিকে-র কি ধারণা, কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে মোদিকে হারানো সম্ভব নয়? তাহলে পরামর্শদাতা হিসেবে প্রশান্ত কিশোর কি তৃণমূলকে সঠিক পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন?

ঠিক কী চাইছেন নির্বাচন-বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কিশোর পাণ্ডে ?

 

More Articles

;