পাখির চোখ ২০২৪, কোন ফন্দি আঁটছেন প্রশান্ত কিশোর?

Kanad Dasgupta
৪ মিনিট
পাখির চোখ ২০২৪, কোন ফন্দি আঁটছেন প্রশান্ত কিশোর?

নির্বাচন-কুশলী প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক ক্রমশই নিবিড় হয়ে উঠছে। কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পিকে। শনি থেকে সোম, এই তিনদিনে সোনিয়ার সঙ্গে দু'বার বৈঠক করলেন প্রশান্ত কিশোর। সোনিয়া-রাহুলদের সঙ্গে প্রশান্তের ঘন ঘন বৈঠক ঘিরে বাড়ছে জল্পনা। এইসব বৈঠকে কার কতখানি লাভ হবে, তা এখনই বলা মুশকিল, তবে রাজধানীর রাজনৈতিক অলিন্দে জোর জল্পনা, চলতি মাসেই পিকে কংগ্রেসের হাত ধরতে চলেছেন। নীতীশ কুমারের দলের জাতীয় সহ-সভাপতির পদ ছাড়ার পর থেকে পিকে এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যুক্ত নন। ইলেকশন-স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে দেশজুড়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছেন। হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটল যে, বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের চুক্তিভিত্তিক পেশাদার পরামর্শদাতা পিকে বিলীয়মান কংগ্রেসে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন? কী চাইছেন প্রশান্ত কিশোর?

২০২১-এ প্রথমবার প্রশান্ত কিশোরকে দলে আনতে উদ্যোগ নিয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্ব৷ দফায় দফায় বৈঠকও হয়। কিন্তু পিকে-র প্রথম কমিটমেন্ট ছিল তৃণমূল কংগ্রেসকে বাংলায় ক্ষমতায় ফেরানো। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে এ-রাজ্যে তৃণমূলের অন্যতম 'শত্রু' ছিল কংগ্রেস। জাতীয় স্তরে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কোনও এক রাজ্যে নিজের দলকেই নিশ্চিহ্ন করার কৌশল সাজানো কঠিন। তেমন হলে নিজস্ব ব্যবসা এবং নিজের পলিটিক্যাল কেরিয়ার, উভয় ক্ষেত্রেই প্রশান্ত কিশোরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। ফলে তখন পিকে-র কংগ্রেসে যোগদানের বিষয়টি ঠান্ডা ঘরে চলে যায়।

ওদিকে প্রশান্ত কিশোরের ওপর অনেকখানি ভরসা করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় নেত্রী হওয়ার পথে। দলের বিস্তার ঘটাচ্ছেন নানা রাজ্যে। ভিন রাজ্যে ভোটে লড়ছেন। দলের সর্বভারতীয় সংগঠনকে সময়োপযোগী করেছেন। জাতীয় স্তরে পরিচিতি আছে এমন কয়েকজন নেতা-নেত্রীকে দলে নিয়েছেন। এই সব ঘটনার পিছনে প্রশান্ত কিশোরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোট বা ফ্রন্ট গঠন করার চেষ্টা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে দেশের বিরোধী নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে বিরোধী জোট গঠন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, চিঠি লিখেছেন। শরদ পাওয়ার, উদ্ধব ঠাকরে, এমকে স্ট্যালিনের মতো নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপি-বিরোধী জোট গঠনের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন এবং সঙ্গে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। মুম্বইয়ে দেশের বিজেপি-বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের কনক্লেভের ঘোষণা করেছেন শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউথ‌। মোটের ওপর, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে শক্তিশালী মহাজোট গঠনের একটা প্রক্রিয়া চলছে এবং এই উদ্যোগের পুরোভাগে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল-সুপ্রিমোর এই পদক্ষেপের সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের বুদ্ধি ও পরামর্শ রয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিজেপি-বিরোধী মহাজোট গঠনের যে প্রক্রিয়া ২০২৪-এর অনেক আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করে দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই উদ্যোগে এখনও কংগ্রেসকে দেখা যাচ্ছে না। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুসম্পর্ক থাকলেও এই জোট গঠনের প্রশ্নে এখনও সেভাবে সক্রিয় নয় কংগ্রেস, বিরোধী দলগুলিও তেমনভাবে ডাকছে না সোনিয়া গান্ধী বা তাঁর দলকে। ফলে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে, কংগ্রেসকে কার্যত বাদ দিয়েই বিজেপি-র বিরুদ্ধে জোট বা লোকসভা নির্বাচনে আসন সমঝোতার যে চেষ্টা চলছে, তার অন্যতম প্রধান মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস। এই তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা প্রশান্ত কিশোর। ওই প্রশান্ত কিশোর আবার জাতীয় কংগ্রেসকে পরামর্শ দিচ্ছেন, কোন পথে এগোলে কংগ্রেস ২০২৪-এর ভোটে চমকপ্রদ ফল করতে পারবে‌। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পিকে কংগ্রেস দলে যোগ দিয়ে বড় দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি। তাহলে কি এমন হতে পারে, কংগ্রেসকে সামনে রেখে বিজেপি-বিরোধী জোট হোক, এমনই ভাবছেন পিকে? যদি তাই হয়, তাহলে তো বলতে হয়, যে দলের তিনি প্রধান পরামর্শদাতা, সেই তৃণমূল কংগ্রেসের অ্যাজেন্ডার বাইরে যাচ্ছেন তিনি। পরামর্শদাতা হিসেবে পিকে যে পরামর্শ তৃণমূলকে দিচ্ছেন, ব্যক্তি পিকে অথবা সম্ভাব্য কংগ্রেস নেতা পিকে সেই পরামর্শ মোকাবিলা করতে নিজেই নেমেছেন। কিছুতেই হিসেব মিলছে না। কেন এমন হচ্ছে? এর একাধিক ব্যাখ্যা ভাবা যেতে পারে।

১) নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে। ২০২৪-এর আগেই গুজরাতে বিধানসভা ভোট। প্রশান্ত কিশোর লোকসভার আগেই গুজরাতে মোদিকে ধাক্কা দিতে চান। অনেকেই জানেন, প্রশান্ত কিশোর নিজে থেকেই যোগাযোগ করেছেন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে। রাহুল গান্ধী গুজরাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরই প্রশান্ত কিশোরের কাছ থেকে প্রস্তাব পান। সোনিয়া এবং রাহুলের সঙ্গে সাম্প্রতিক একাধিক বৈঠকে পিকে গুজরাতে কংগ্রেসের ভোট-কৌশল কী হবে, তার প্রাথমিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করেছেন। কংগ্রেস কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনও জানা যায়নি। কিন্তু এটাও তো ঠিক, প্রশান্ত কিশোর আগ বাড়িয়েই গুজরাত নিয়ে কংগ্রেসকে পরামর্শ দিয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের বুঝিয়েছেন, কোন পথে মোদিকে নিজের ভূমেই চিৎপাত করা সম্ভব। এর অর্থ, পিকে জানেন, একমাত্র কংগ্রেসই গুজরাতে বিজেপি-বধ করতে পারে। তৃণমূল বা অন্য কোনও দলের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। হতে পারে, পিকে মোদির বিরুদ্ধে নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতেই গুজরাতে কংগ্রেসকে পরামর্শ দিতে এত আগ্রহী।

২) গুজরাতে মোদিকে হারিয়ে এবং লোকসভা ভোটে ৩৭০ আসনে লড়াই করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া অথবা বিরোধী জোটে 'বড় ভাই'-এর আসন দখলের প্রাথমিক ফরমুলা পিকে দিয়েছেন সোনিয়া-রাহুলকে। সোনিয়া গান্ধী অসুস্থ। এর অর্থ, জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী প্রধান মুখ হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের পছন্দ সেই রাহুল গান্ধী, যাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিরোধী নেতা মানতে আদৌ রাজি নন। তাহলে পিকে এমন ভাবছেন কেন? অনুমানভিত্তিক উত্তর একটা আছে, উত্তরটি স্পর্শকাতর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিরোধী নেতা বেশ কিছুদিন আগেই বলেছেন, কংগ্রেসকে বাদ দিয়েই বিজেপি-বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তাহলে কি এই ডাকে বিশ্বাস রাখছেন না প্রশান্ত কিশোর? এমন কি হতে পারে, অভিজ্ঞ প্রশান্ত কিশোর বিজেপি-বিরোধী মহাজোটের অন্যতম মুখ হিসেবে তৃণমূল সুপ্রিমো-র ওপর সেভাবে আস্থা রাখতে পারছেন না? পিকে-র কি ধারণা, কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে মোদিকে হারানো সম্ভব নয়? তাহলে পরামর্শদাতা হিসেবে প্রশান্ত কিশোর কি তৃণমূলকে সঠিক পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন?

ঠিক কী চাইছেন নির্বাচন-বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কিশোর পাণ্ডে ?

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।