বিধানসভায় বোমা ছোড়া থেকে সিনেমার গল্প লেখা! বটুকেশ্বর দত্তকে ভুলে গেছে বাঙালি

Batukeshwar Dutta: স্বাধীনতা সংগ্রামী, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কাহিনিকার হওয়া সত্ত্বেও বটুকেশ্বর দত্ত যেন সিংহভাগ বাঙালির কাছে বিধানসভায় বোমা নিক্ষেপ করা বিপ্লবী হিসেবেই শুধুমাত্র পরিচিতি পেয়ে চলেছেন।

Raktim Dey
৩ মিনিট
বিধানসভায় বোমা ছোড়া থেকে সিনেমার গল্প লেখা! বটুকেশ্বর দত্তকে ভুলে গেছে বাঙালি

১৯৬৫ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল মনোজ কুমার, প্রেম চোপড়া অভিনীত 'শহিদ' ছবিটি। ছবিটির পটভূমি স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদ ভগৎ সিংয়ের জীবন এবং সংগ্রামকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছিল। এই ছবি কাহিনির জন্য জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। কাহিনির দিক থেকে এই ছবিটিকেই বাস্তবের সবচেয়ে কাছাকাছি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, কারণ ছবির কাহিনিকারদের মধ্যে একজনের নাম ছিল বটুকেশ্বর দত্ত। এই চলচ্চিত্রের কারণেই বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত সিনেমার জগতে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কাহিনিকার হওয়া সত্ত্বেও বটুকেশ্বর দত্ত যেন সিংহভাগ বাঙালির কাছে বিধানসভায় বোমা নিক্ষেপ করা বিপ্লবী হিসেবেই শুধুমাত্র পরিচিতি পেয়ে চলেছেন।

বর্ধমানের গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও বটুকেশ্বর দত্তর ছাত্র এবং শুরুর দিকের বিপ্লবী জীবন কানপুরে কেটেছিল। কানপুরে থাকাকালীন তিনি দেখেছিলেন যে, কানপুরের মল রোডে একজন ব্রিটিশ একটি বাচ্চাকে বেধড়ক মারধর করছিল। ভারতীয়দের যেই রাস্তায় যাওয়া নিষেধ ছিল, বাচ্চাটি ভুল করে সেই রাস্তায় চলে গিয়েছিল। তার এই ছোট ভুল ইংরেজ প্রভুর কাছে পাপের সমান মনে হয়েছিল। তার ফলস্বরূপ বাচ্চাটির কপালে বেদম প্রহার জুটেছিল। নিজের দেশে কোনও রাস্তায় হাঁটার কারণে এই ধরনের প্রহার দেখে হয়তো অনেকেই কিছু করেননি। বটুকেশ্বর দত্ত তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন না। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা করেছিলেন সেদিনই। তাই তিনি সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্যর মাধ্যমে শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ছিলেন হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন। পরবর্তীকালে পরামর্শ করে তিনি হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে যোগদান করেছিলেন। সেই একই সময়ে ভগৎ সিং এই সংগঠনে যোগদান করেছিলেন। তাঁদের দু'জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হতে বেশি দেরি হয়নি। বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের নাম আসলেই বিপ্লবী সুখদেব এবং রাজগুরুর নাম মানুষের মনে পড়ে। বটুকেশ্বর দত্তর সঙ্গেও ভগৎ সিংয়ের যে গাঢ় বন্ধুত্ব ছিল, তা ভগৎ সিংয়ের মায়ের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়।

'শহিদ' ছবির পোস্টার

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জাতীয় সংগীত হওয়ার যোগ‍্য নয়! কেন এই দাবি উঠেছিল 'জনগণমন' নিয়ে

National Anthem: কবিগুরু নিজের যে সৃষ্টি মানুষকে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা শুধু তাঁকে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসাই এনে দেয়নি, একই সঙ্গে এনেছে লাঞ্ছনা, অপমান।

১৯২৪ সালে কানপুরে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। সেই সময়ে বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের জন্য তরুণ সংঘ নামে একটি দল তৈরি করা হয়েছিল। ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত সেই দলের সদস্য ছিলেন। দিনের বেলায় দুর্গতদের সাহায্য ছাড়াও তাঁরা রাতেও কাজ করতেন। রাতের বেলা তাঁরা লন্ঠন হাতে নিয়ে গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যদি কোনও মানুষ নদীতে ডুবে যায় অথবা বন্যার জলে ভেসে যেতে থাকে, তাঁকে বাঁচানোর জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো। বটুকেশ্বর দত্তর থেকেই ভগৎ সিং কিছুটা বাংলা শিখিয়েছিলেন। তিনি নিজে নজরুলগীতি পছন্দ করতেন এবং ভগৎ সিংকে নজরুলগীতি শুনিয়েছিলেন এবং কিছুটা শেখাতে সমর্থ হয়েছিলেন।

১৯২৫ সালে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার ফলে হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন কিছুটা ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছিল। বটুকেশ্বর দত্ত এই সময়ে বাংলা, বিহারের বিভিন্ন জায়গায় পরিচয় বদলে থাকতেন। ১৯২৭ সালে সংগঠন নতুন নাম এবং রূপ নিয়ে ফিরে এসেছিল। বটুকেশ্বর দত্ত তখন পুনরায় কানপুরে ফিরে গিয়েছিলেন।

এই ঘটনার বছর দুইয়ের মধ্যে ইংরেজ সরকার পাবলিক সেফটি বিল এবং ট্রেড ডিসপিউট বিল পাস করানোর চেষ্টা করছিল। এই বিল পাস হলে যেকোনো বনধ অথবা ধর্মঘটকে বেআইনি ঘোষণা করে সেই ধর্মঘট ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল। হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের নতুন নাম) ঠিক করে যে, তারা এই বিলের বিরোধিতায় ভরা বিধানসভায় বোমা ফেলবেন, কিন্তু কাউকে হত্যা করবেন না। সংগঠনের তরফে তখন ঠিক করা হয়েছিল যে তাঁদের চিন্তাধারা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনো দরকার। তাই তাঁরা এই বিলের বিরোধিতায় সভায় গিয়ে বোমা নিক্ষেপ করেছিল।

বোমা নিক্ষেপ করার ফলে তাঁরা দু'জনে গ্রেফতার হয়েছিলেন। বটুকেশ্বর দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডর আদেশ দিয়ে প্রথমে আন্দামানের সেলুলার জেলে এবং পরে হাজারিবাগের জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় করা অমানুষিক অত্যাচারের কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল। তাই তাঁকে কোনও রাজনৈতিক দলে এবং দলের কর্মসূচিতে যোগ না দেওয়ার শর্ত শুনিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়। যদিও বটুকেশ্বর দত্ত এই শর্ত মানেননি। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তিনি ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন।

বর্তমানে বটুকেশ্বর দত্তর নাম শুনলে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে একটি বোমার মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কথাই বেশি করে উঠে আসে, কিন্তু বহু মানুষ এটাও জানেন না যে, দিল্লিতে জোড়বাগের কাছেই বিকে দত্ত কলোনি আসলে বটুকেশ্বর দত্তর নাম থেকেই নিজের নাম পেয়েছে। মানুষের চোখের প্রায় আড়ালে থেকে নিজের এবং দেশের লড়াই লড়েছেন তিনি আজীবন।

তথ্য ঋণ: দ‍্য ওয়্যার, ইন্ডিয়া টাইমস, দ‍্য লজিক্যাল ইন্ডিয়ান

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।