মানহানির মামলার হুমকি দিয়েছিলেন উত্তমকুমার, কী ছিল সেই বিতর্কিত সাক্ষাৎকারে

একটা সিম্পল ইন্টারভিউ। যে ইন্টারভিউ প্রমাণ করবে, উত্তমকুমারের গ্ল্যামার, কারিশমা সব নেহাত ওপরের ব্যাপার। ভেতরের মানুষটা নেহাত সাধারণ। অর্থাৎ, খুব আস্তে আস্তে মানুষটির পায়ের তলা থেকে কার্পেটটা সরিয়ে নিতে হবে।

 

উত্তমকুমার আমার বিরুদ্ধে এবং জুনিয়র স্টেটসম্যান পত্রিকার বিরুদ্ধে হঠাৎ উকিলের চিঠি দিলেন, মানহানির মামলা করবেন, এই মর্মে। উত্তমকুমার পর্ব শেষ করব সেই গল্প বলে।

জুনিয়র স্টেটসম্যান পত্রিকার ডাকনাম ছিল জে. এস। প্রকাশিত হতো স্টেটসম্যান হাউস থেকে। সম্পাদক এক ইংরেজ। ডেসমন্ড ডয়েগ। জে. এস. জন্মেছিল তার সময়ের আগে। এতটাই আধুনিক ভাবনায়, ভাষায়, বিন্যাসে। আমি সেই পত্রিকায় লিখতাম।

ডেসমন্ড একদিন ডাকলেন। বললেন, উত্তমকুমারকে একটা ইন্টারভিউ করতে। তবে ইন্টারভিউটা একটু অন্যরকম হবে।

-কী রকম?

আরও পড়ুন: সুচিত্রা সেনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন উত্তমকুমার, উত্তরে কী বলেছিলেন মহানায়িকা?

ডেসমন্ড সংক্ষিপ্ত ব্রিফ দিলেন। একটা সিম্পল ইন্টারভিউ। যে ইন্টারভিউ প্রমাণ করবে, উত্তমকুমারের গ্ল্যামার, কারিশমা সব নেহাত ওপরের ব্যাপার। ভেতরের মানুষটা নেহাত সাধারণ। অর্থাৎ, খুব আস্তে আস্তে মানুষটির পায়ের তলা থেকে কার্পেটটা সরিয়ে নিতে হবে।

উত্তমকুমারকে এর আগে অনেকবার ইন্টারভিউ করেছি। বেশ ঘনিষ্ঠ আমি। তাঁকে শ্রদ্ধা করি। কিছুটা মুগ্ধ তো বটেই। কিন্তু চামচা নই। তাঁর গ্ল্যামারের নিচে তাঁর শিক্ষার অভাব আমার চোখে পড়ে। খারাপ লাগে। কিন্তু তিনি অনস্বীকার্য নায়ক। একথাও ঠিক। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর বিকল্প নেই, এও সত্যি!

উত্তমকুমারের ইন্টারভিউ পাওয়া সহজ নয়। তাঁর সময়ের অভাব। তিনটে শিফটে কাজ করেন তিনি। ছবির পর ছবি। হালভাঙা পাল ছেঁড়া টালিগঞ্জকে তিনি একা টেনে চলেছেন। তিনি মহানায়ক।

শেষ পর্যন্ত ডেট পাওয়া গেল। উত্তমকুমারের সহকারী ফোন করে জানালেন, কোনও এক সকালবেলা উত্তমকুমার আমাকে ইন্টারভিউ দেবেন। আমি গেলাম তাঁর ময়রা স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টে। লিফট ছিল না। চওড়া কাঠের সিঁড়ি। রাজকীয় ব্যাপার। অমন বাড়ি কলকাতায় আর বেশি নেই। ভেতরে ঢুকেই প্রসারিত লিভিং রুম। বাঁ-ধারে পরপর তিনটি সাদা দরজা। আরশির মতো পালিশ করা। ঘরের শেষে, দেওয়ালের ওপর ছবিতে তাকিয়া ঠেস দিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে হাসছেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা উত্তম। ছবিটা দেখে তাঁর গ্ল্যামারে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। প্রকাণ্ড ঘরের মাঝখানে এক পেল্লায় গণেশ ভুঁড়ি নিয়ে বিরাজ করছেন। উত্তমের সিদ্ধির উৎস। গণেশের পিছনে প্রায় সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত বাটিকের কালী মূর্তি। কালী মূর্তির উল্টোদিকে আট-দশজনের বসার ও খাবার টেবিল। ঘরের মাঝখানটি মহার্ঘ সোফা দিয়ে সাজানো।

মনে আছে, সেদিন উত্তমের ঘর ফাঁকা। হয়তো এই ইন্টারভিউয়ের জন্য। আমি বসতে না বসতেই চা এল। কিছুটা পানসে ঠান্ডা চা। তবে কাপটি অভিজাত। আমি জানি, অন্তত আধঘণ্টা আমাকে উদগ্রীব অপেক্ষায় রাখবেন উত্তম। তিনি মহানায়ক। এবং আবার একবার চা আসবে। একইরকম পানসে চা, দামি কাপে।

উত্তমকুমার ঘরে এলেন। ঠিক এলেন না। আবির্ভূত হলেন। গত রজনীর ক্লান্তি এবং মেক আপ এবং আবেশ এখনও তাঁর মুখে। একই কি বলে গ্ল্যামার? অনামিকায় হীরের আংটি! এত বড় হীরে! যতবার দেখেছি, একই কথা মনে হয়েছে। একবার বলেছি তাঁকে। কোহিনূর নয় তো! সে কী হাসি ! কোহিনূরের থেকেও ঝলমলে!

Uttam Kumar

'নায়ক' ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্য

আমার সামনের আসনে বসলেন উত্তম। সোনার লাইটার দিয়ে ধরালেন আমেরিকান সিগারেট। পরনে পাঞ্জাবি, ঢোলা পাজামা। সাদা চটি। পাঞ্জাবিতে হিরের বোতাম । সবক'টি বোতাম ছড়াচ্ছে মুক্ত দ্যুতি!

-আজ কোন কাগজ? তুমি তো একেকদিন একেক কাগজ থেকে। বললেন উত্তম।

সেই রোম্যান্টিক কণ্ঠ।

আমি হেসে বললাম, আজ জে.এস।

-আই সি। খুব নাম করেছে কাগজটা। বললেন উত্তম।

বললাম, আপনি কভার স্টোরি।

উত্তম আবার বললেন, আই সি। তারপর বললেন, কে যেন এডিটর?

-ডেসমন্ড ডয়েগ, বললাম আমি।

-সাহেব?

-হ্যাঁ।

-কী জানতে চাও বলো।

-আপনি রোববার সকালে কী করেন?

-সানডে মর্নিং?

-হ্যাঁ, সানডে মর্নিং-ই বটে।

-আই রিড।

-কী পড়েন?

-শেক্সপিয়র, বললেন উত্তম।

আমি কপট, সিরিয়াস, শেকসপিয়র! মানে?

-ম্যাকবেথ, বললেন উত্তম!

আমি মনে মনে লিখলাম, উত্তমকুমার এভরি সানডে মর্নিং রিলিজিয়াসলি রিডস ম্যাকবেথ।

তারপর জানতে চাই, আপনার খাবার টেবিলের একটি চেয়ার সিংহাসনের মতো কেন?

উত্তম বলেন, ওটাতে আমি বসি।

আমি আবার মনে মনে লিখি, উত্তমকুমার সিংহাসনে বসে আহার করেন।

তারপর জানতে চাই, আপনার বুক কেসে অনেক বই উল্টো করে রাখা কেন?

উত্তম বলেন, আরে! খেয়াল করিনি তো!

তারপর জিজ্ঞেস করি, যখন অতীতের কথা ভাবেন, নস্টালজিক লাগে?

'নস্টালজিক' শব্দটি তাঁকে ভাবায়। তারপর এক আশ্চর্য উত্তর দেন।

-খুব নস্টালজিক লাগে আজ-কাল। তবে অতীতের কথা বিশেষ মনে নেই।

মনে মনে লিখে রাখি, উত্তম ফিলস ইনটেন্সলি নস্টালজিক এবাউট আ পাস্ট হি হ্যাস ফরগটেন!

জে. এস.-এর প্রচ্ছদকাহিনি হয়ে প্রকাশিত হয় এই ইন্টারভিউ। প্রচ্ছদে নিমাই ঘোষের তোলা অসাধারণ ছবি।
এরপর উকিলের চিঠি। মানহানির হুমকি। তারপর ডেসমন্ড আমার পাশে দাঁড়ালেন। উত্তমকুমার আর এগোলেন না।
আমার একটি স্বীকারোক্তি আছে। আজকের আমি এই ইন্টারভিউ করতাম না। সেদিনের আমি করেছিলাম।
সেই অনুশোচনা আমাকে ছেড়ে যাবে না কখনও।

 

 

More Articles

;