সেন্সরড দিলীপ এবার পাল্টা বিঁধছেন বিজেপিকেই! কত দূর গড়াতে পারে জল?

দলের শীর্ষ স্তর থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকানে আসর বসানো কর্মীরা হামেশাই দাবি করেন, বিজেপি নাকি The Party with a Difference, দলটি নাকি অন্যান্য দলের থেকে আলাদা‌। ওদিকে যত দিন যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন কংগ্রেসের সঙ্গে নানা ক্ষেত্রে এই বিজেপির অসম্ভব মিল রয়েছে। দিলীপ ঘোষের ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে, কান দিয়ে দেখার যে প্রচলিত পদ্ধতিতে কংগ্রেস চালিত হয়, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেই ধারার গুণমুগ্ধ অনুগামী। আবার শীর্ষ নেতারাও যখন দলীয় কোনও নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন, তখন কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতা যে স্টাইলে রিয়্যাক্ট করেন, বিজেপি সাংসদ দিলীপ ঘোষের গলায় এখন সেই সুরই বাজছে। সুতরাং প্রশ্ন উঠেই যাচ্ছে, কীসের 'আলাদা' দল বিজেপি? অন্য কোনও দলের থেকে 'আলাদা' বলে যতই নিজের পিঠ নিজেই চাপড়াক বিজেপি, আসলে ওসব নেহাতই প্রচার‌।

কেন্দ্রীয় গেরুয়া নেতৃত্ব দিনকয়েক আগে 'সেন্সর' করেছে দিলীপ ঘোষকে। প্রায় সকলেই জানেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় জনৈক কেন্দ্রীয় নেতার এই সংক্রান্ত একটি চিঠি ফাঁস করে দলের এই সিদ্ধান্তের কথা সামনে এনে ফেলা হয়েছে‌। এসব ঘটনা দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু ঘটনাটি জানাজানি হতেই তা আর 'অভ্যন্তরীণ' থাকেনি‌। এখন বঙ্গ-রাজনীতিতেই বহুলচর্চিত এই বিষয়টি। বোঝাই যাচ্ছে, দিলীপ ঘোষকে পাবলিকলি হেনস্থা করার লক্ষ‍্যেই চিঠিটি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করা হয়েছে এবং তা ধরেও ফেলেছে দিল্লি। ওদিকে এই চিঠি প্রসঙ্গে দলেরই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে নিশানা করে এবং কংগ্রেস-সংস্কৃতির বাহক হয়ে দিলীপ ঘোষের সাফ কথা, "কোনও সেন্সর নয়, নিজের রাস্তাতেই হাঁটব।"

এদিকে, বঙ্গ বিজেপির আদি-গোষ্ঠীর অভিযোগ, রাজ্য দলের ক্ষমতাসীন লবি-র অনভিজ্ঞতা, ভুল, অদক্ষতা, অযোগ্যতা নিয়ে মুখ খুলে কিছু সত্যি কথা বলেছিলেন দিলীপ ঘোষ। স্রেফ এই কারণেই দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে মিথ্যা নালিশ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে রাজ্যের অফিসিয়াল গোষ্ঠী। দিলীপ-শিবিরের বক্তব্য, এই গোষ্ঠী এই মুহূর্তে দলীয় সংগঠনকে তলানিতে পাঠিয়েছে। রাজ্যের কর্মী-সমর্থকদের হতাশায় ডুবিয়েছে। সংগঠনের অন্দরে দলবাজি কায়েম করেছে। বাংলার সংগঠনকে 'শক্তিশালী' করার অভিপ্রায়ে ঠিক কারা দিল্লির কান ভাঙিয়েছেন, রাখঢাক না করে সেসব নামও প্রকাশ্যে এনেছে দিলীপ-শিবির। আদি-গোষ্ঠীর সাফ কথা, ট্যুইটার-মালব্যের (অমিত মালব্য) মদতে দিল্লির কানে বিষ ঢেলেছেন শুভেন্দু অধিকারী, অমিতাভ চক্রবর্তীরা। এরাই এই চিঠি পাঠাতে বাধ্য করেছেন। এরাই চিঠি ফাঁস করেছেন। আর দিল্লিও এদের কথায় কান দিয়েই ব্যবস্থা নিয়েছে।

আরও পড়ুন: দিলীপ ঘোষকে রাজ্য থেকে সরিয়ে লাভ হলো কাদের?

কিন্তু যাঁকে ঘিরে এই বিতর্ক, যাঁকে 'গ্যারেজ' করতে অফিসিয়াল লবি সব কাজ ফেলে 'সিঙ্গল পয়েন্ট' কর্মসূচি নিয়েছে, যাঁকে সেন্সর করার ঘটনায় বঙ্গ বিজেপি প্রায় ভাঙনের মুখে, এই চিঠিতে সেই দিলীপ ঘোষের মধ্যে কোনও ভাবান্তরের হদিশ মিলেছে কি?

দিল্লির বিজেপি চিঠি দিয়ে তাঁকে মুখ বন্ধ রাখতে বললেও এমন কিছুই আপাতত দেখা যাচ্ছে না। দিলীপ ঘোষ যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। সাতসকালের সেই বিখ্যাত প্রভাতী-বাণীতে বলেছেন, "দলের ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবার জন্য আলাদা লোক আছে। আমি ওসব নিয়ে চিন্তিত নই!" বলেছেন, "মানুষই আমাকে বিরোধী নেতা বানিয়েছে। তাই মানুষ ঠিক যে ভাষায় কথা শুনতে চান, আমি সেই ভাষাতেই কথা বলি। আমি তো চিরকালই সংযত। যতটুকু দরকার, তার চেয়ে বেশি কথা কখনওই বলি না।"

দিলীপবাবু যতই বলুন 'যতটুকু দরকার, ততটুকুই কথা বলি', আসলে দিলীপবাবুর অন্যতম ইউএসপি তাঁর কথা, তাঁর তির্যক মন্তব্য। কখনও তাঁর নিশানায় বিরোধী পক্ষ, কখনও বা নিজের দলের একাংশ। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্পর্কে একাধিকবার ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন দিলীপবাবু। তাঁর বাক্য-তোপের মুখে পড়েছেন রাজ্য নেতাদের একাংশও। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে দলের অসীম ব্যর্থতার জন্য দিলীপ দায়ী করেছিলেন বেলাগাম দলবদলকে। কিছুদিন আগেও একবার তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, রাজ্য দলের বর্তমান সভাপতি কতখানি অভিজ্ঞ, তা নিয়ে। বিরোধী দলনেতা সম্পর্কে তাঁর প্রকাশ্য মূল্যায়ণ, তিনি একজন জেলা স্তরের নেতা। দিলীপ-বিরোধী শিবির এই সব মন্তব্যকে জড়ো করে দিল্লিতে নালিশ করেন, এই ধরনের মন্তব্যের জন্যই বাংলায় দলের সংগঠন পোক্ত হচ্ছে না। হয়তো তাঁরা বোঝাতে চেয়েছেন, দিলীপবাবু রাজ্য কমিটির কাজে মাথা না গলালে আমরা দেখিয়ে দিতাম, সংগঠন কাকে বলে। দিল্লি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রথমে দিলীপ ঘোষকে বাংলার বাইরে আট রাজ্যের দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে রাজ্যছাড়া করতে চায়। দলের ওই ‘ফতোয়া’ উড়িয়ে দিলীপ ঘোষ স্পষ্ট জানান, "দেখি কে আমাকে রাজ্যছাড়া করে? যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা ভার্চুয়ালি পালন করে বাকি সময়টা রাজ্যেই ঘোরাঘুরি করব। তাছাড়া আমি বাংলার সাংসদ, আমার কেন্দ্রে তো থাকতেই হবে।" পাশাপাশি সুকান্ত-শুভেন্দুদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, "আমি তো নেই, এবার ৪০% ভোট পেয়ে দেখান।" এসব কথার পর দিল্লিতে ফের নালিশ জমা পড়ে৷ এবার দল দিলীপ ঘোষকে মুখ খুলতেই নিষেধ করেছে। এর জবাবও তিনি দিয়েছেন। বলেছেন, "বিরোধী দলের ভুল নিয়ে আওয়াজ তুলি, এটাই আমার ধর্ম, এটাই বিরোধী দলের কাজ। এই কাজ আমি চালিয়েই যাব। সবার মাথায় রাখা উচিত, আমি কিন্তু কারও পথ আটকাইনি। নিজের চলার রাস্তা আমি নিজেই তৈরি করেছি। সেই রাস্তাতেই হাঁটব।"

একইসঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ চিঠি তাঁর হাতে আসার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হল কীভাবে, সংগত সেই প্রশ্নও তুলেছেন। শুধু প্রশ্ন তোলাই নয়, চিঠি ফাঁসের মতো ঘটনার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশকে দায়ীও করেছেন। দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ইকো পার্কে প্রাতঃভ্রমণে বেড়িয়ে বলেছেন, “আমি বুঝতেই পারছি না, এই ধরনের কোনও চিঠি আগেই কী করে আসে মিডিয়াতে। সংগঠনে তাহলে ফাঁক রয়েছে‌। এটা চিন্তার ব্যাপার। এর জবাব তো চাইতেই হবে। আর এর জবাব দিতে পারবেন যাঁরা এসব করছেন, যাঁরা চিঠি লিখেছেন এবং যাঁরা চিঠি ফাঁস করেছেন, তাঁরাই। এর মধ্যে আবার সেন্সর কীসের?"

এদিকে সংবাদমাধ্যমে দিলীপ ঘোষকে পাঠানো 'কড়া' চিঠি এভাবে হুবহু ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও দায় এড়াতে পারছেন না। দিলীপ-শিবির দিল্লির দিকে আঙুল তুলে ইতিমধ্যেই বলেছে, "দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে দিল্লির নেতাদের একাংশ। দলের এক সাধারণ সম্পাদক দলেরই এক সহ-সভাপতিকে চিঠি দিচ্ছেন, সেই চিঠিও যদি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে তো বলতে হয়, যে কোনও মুহূর্তে ভয়ংকর বিপাকে পড়তে পারেন মোদি, শাহ, নাড্ডাজি-রাও। তাঁরা বড় নেতা, কাজের পরিধি অনেক বড়। তাঁদের লেখা কোনও গুরুত্বপূর্ণ চিঠিও দলের অন্দর থেকেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও অমূলক নয়।"

এই অভিযোগের জবাবই দিতে পারছে না দিল্লি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চরম বিব্রত। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে পাঠানো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর চিঠি ফাঁস হওয়ার ঘটনা নাকি বিজেপিতে বিরল। কয়েকজনের 'হাতযশে' এবার সেই ঘটনাও ঘটে গিয়েছে। শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই বিষয়টিকে শৃঙ্খলাভঙ্গ বলেই মনে করছে। শোনা যাচ্ছে, তাঁর পাঠানো চিঠি কীভাবে প্রকাশ্যে চলে এল তা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন ওই সাধারণ সম্পাদকও। ঘনিষ্ঠ মহলে এজন্য দু'-তিনজনকে দায়ীও করেছেন। কে বা কারা, কীভাবে এই গোপনীয় চিঠি ফাঁস করেছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন‌। দলের আদি নেতা-কর্মীরা এদিকে চিঠি ফাঁসের দায় সরাসরি চাপিয়ে দিয়েছে রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সহ-পর্যবেক্ষক অমিত মালব্য, রাজ্যের সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী ও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীদের ওপরেই। এখন দেখার, কেন্দ্রীয় বিজেপি এই বিষয়ে ঠিক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

আসলে বঙ্গ বিজেপির ঘরের দ্বন্দ্ব সামলাতেই দিলীপ ঘোষকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন সেই চিঠিকেই হাতিয়ার করে দিলীপ ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, এটি আগাম ফাঁস হলো কীভাবে? দিলীপ ঘোষের এই প্রশ্নে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টে বিতর্ক আরও বেড়েছে। এই চিঠি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের মুখও পুড়েছে।

দিল্লিতে যাই-ই হোক, রাজ্যে এখন শিরোনামে দিলীপ ঘোষই। বঙ্গ বিজেপির দিলীপ-বিরোধী যে অংশটি তাঁকে সেন্সর করার ঘটনায় উৎফুল্ল হয়েছিল, ওই চিঠি ফাঁস হওয়ায় তাঁরাই এখন বড়সড় বিপাকে। দিলীপ ঘোষ দলের সর্বভারতীয় পদাধিকারী। তাঁকে লেখা দলীয় চিঠি আগাম পাবলিক হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সম্ভবত শাপে বর হতে চলেছে দিলীপের।

ফলে তোফা আছেন দিলীপ ঘোষ। তাঁকে রাজ্যছাড়া করা বা সেন্সর করা যে খুব একটা সহজ কাজ নয়, প্রতি মুহূর্তেই কংগ্রেসি স্টাইলে দলীয় হাই-কম্যান্ডকে সেটাই বুঝিয়ে চলেছেন এই সাংসদ। এবং এসব বোঝাচ্ছেন মিডিয়ার মাধ্যমেই।

কীসের The Party with a Difference? গেরুয়া-আপ্তবাক্যটি শুনতে ভালো লাগলেও এই ক্যাচ-লাইনের অস্তিত্বই আজ ভেন্টিলেশনে ঢুকতে চলেছে।

More Articles

;