জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যেই এলোপাথাড়ি গুলি, রক্তে ভিজল রাস্তা, যে হাড়হিম ঘটনায় শিউরে উঠছে বিশ্ব

Gun Shooting at Los Angeles Chinese New Year : আলোর মালায় ঝলমলে ওই এলাকা। হঠাৎই সেই আনন্দ বদলে গেল কান্না আর আর্তনাদে।

Aritra Som
৩ মিনিট
জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যেই এলোপাথাড়ি গুলি, রক্তে ভিজল রাস্তা, যে হাড়হিম ঘটনায় শিউরে উঠছে বিশ্ব

পার্কের আলোর রোশনাই তখন ফিকে হয়ে গিয়েছে খানিকটা। বাইরেই একটি বিশেষ ভ্যানের দিকে নজর সবার। সেদিকে বিস্ময়ের বদলে ভয়ের দৃষ্টি। যেন সেখান থেকে ভয়ংকর কেউ বেরিয়ে আসবে! ভ্যানটার দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে পুলিশের দল। গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হাতে বন্দুক। লক্ষ্য সেই ভ্যানটির দিকেই। একটু একটু করে গোটা ভ্যানটি ঘিরে ফেলা হয়েছে। হঠাৎই একটি গুলির আওয়াজ! তারপর… সব চুপচাপ। ভ্যানের ভেতর কোনও সাড়াশব্দ নেই। তারপর দরজা খোলার পরই বেরিয়ে এল এক বয়স্ক ব্যক্তির মৃতদেহ। হাতে ধরে রাখা বন্দুক; যেখান থেকে গুলি সোজা দেহ ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। খানিক আগেই এই বন্দুক আরও বহু মানুষের রক্ত মেখেছে…

২১ জানুয়ারি, শনিবার ছিল চিনা লুনার নববর্ষ। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা চিনা বাসিন্দারা এই দিনটি উদযাপন করেন। আমেরিকাও তার ব্যতিক্রম নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের মন্টেরে পার্কে প্রতিবারের মতো বসেছিল চিনা নববর্ষের আসর। আলোর মালায় ঝলমলে ওই এলাকা। রাতে সবাই সেখানে আনন্দ করছিলেন। হঠাৎই সেই আনন্দ বদলে গেল চিৎকার, কান্না আর আর্তনাদে।

মেশিনগান হাতে হঠাৎই এক ব্যক্তি বেরিয়ে এল ভিড় থেকে। তারপর এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল। কাছেই এক রেস্তোরাঁয় দৌড়ে গিয়ে ঢুকল তিনজন। ভয়ে কাঁপছে তাঁরা। একজন মেশিনগান হাতে গুলি চালাচ্ছে। তার কাছে অজস্র কার্তুজ। রক্ত আর চিৎকারে ভেসে যাচ্ছে এলাকা। নববর্ষের মুহূর্ত বদলে গেল হিংসায়। পুলিশ আসার পর সেই ব্যক্তিটিকে দেখা গেলেও ধরা যায়নি। ততক্ষণে ২০২২-এর মে মাসের পর সবচেয়ে ভয়ংকর বন্দুকবাজের হামলা দেখে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১০ জনের রক্তাক্ত, ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহ পড়ে রয়েছে মন্টেরে পার্কে, রাস্তায়। গুরুতর আহত আরও কয়েকজন।

1/

There was a shooting in Monterey Park in California, killing 10 people. At least 9 more were injured.

At the time, the neighbourhood was celebrating Chinese New Year. According to police, the attacker is still at large, his motives are unknown.

— David Kime (@CyberRealms1)

একটা সময় পর পুলিস এসে ওই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলে। ততক্ষণে একটি ভ্যানের ভেতর ঢুকে পড়েছে সে। হাতে তখনও রক্তমাখা মেশিনগান। শেষমেশ পুলিশের হাতে ধরার পড়া এড়াতে নিজের ওপরই গুলি চালায় সেই ব্যক্তি। ভ্যান থেকে তার মৃতদেহ বের করা হয়। পুলিশ জানতে পারে, এই একজনই হামলা চালিয়েছে। বয়সও আন্দাজ ৭২ বছর। কিন্তু কেন এই হামলা? এতগুলো লোকের প্রাণ কেন নিল সে? অনেক আগে থেকেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল? এখনও অন্ধকারে পুলিশ। তদন্ত জারি রয়েছে। অন্যদিকে শনিবারের পাশাপাশি রবিবার, অর্থাৎ ২২ জানুয়ারিও ওই পার্কে অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই ঘটনার জন্য সেটি স্থগিত হয়েছে। আমেরিকার পতাকাও অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের এই ঘটনা আবারও একই প্রশ্ন সামনে তুলে আনল। ২০২২-র মে মাসেই টেক্সাসের একটি স্কুলে বন্দুকবাজের হামলায় ২১ জন মারা যায়। আমেরিকার বুকে এগুলো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। সেখানকার হিসেব বলছে, ২০২২ সালে গোটা আমেরিকায় অন্তত ৬৪৭ বার জনসমক্ষে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে। স্রেফ গুলি চালানোর ঘটনায় গত বছর আমেরিকায় ৪৪,০০০-এরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। সেটা খুন এবং আত্মহত্যা – উভয়ই। প্রতিদিন ১১০ জন আমেরিকান বন্দুক হামলায় মারা যাচ্ছেন। অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় আমেরিকায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ১২ গুণ বেশি। আর বন্দুকবাজের হামলায় মৃত্যুর ঘটনা ২৬ গুণ বেশি! প্রতি বছর অসংখ্য কেস সামনে আসে। যত দিন যাচ্ছে, এই গ্রাফ আরও বাড়ছে। কিন্তু কেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পিছনে মানুষের মানসিকতাকে কেবল দায়ী করলে হবে না। দায়ী আমেরিকার অদ্ভুত একটি নিয়ম। আমাদের ভারতে যে কোনও কারোর বাড়িতে চট করে বন্দুক রাখা যায় না। তার জন্য অনেক নিয়মকানুন আছে। কিন্তু আমেরিকায় প্রচুর সাধারণ মানুষ নিজেদের ‘দরকারে’ বন্দুক কেনেন। বন্দুক ও গুলি বাড়িতে রাখেন। কোনও কঠোর নিয়মও নেই সেখানে। সিএনএনের একটি রিপোর্ট বলছে, আমেরিকায় ঠিক কতজনের বাড়িতে বন্দুক আছে, কে কখন কিনছে সেটা বের করা খুব মুশকিল। কারণ, বন্দুক বিক্রির কোনও সুনির্দিষ্ট ডেটাবেস নেই। ২০১৮-র একটি সমীক্ষা বলছে, আমেরিকায় প্রতি ১০০ জন বাসিন্দার মধ্যে বন্দুকের সংখ্যা প্রায় ১২০! যেখানে ইয়েমেনে এই সংখ্যাটি প্রায় ৫৩, আইসল্যান্ডে ৩১।

২০১৭-তে পেউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা বলছে, আমেরিকার প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে অন্তত তিনজন বন্দুক রাখে। এই সংখ্যাটি নিশ্চয়ই এখন বেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘বন্দুক সংস্কৃতি’ কি এখনও জারি থাকবে? 'গোলিঁও কা রাসলীলা'র এই মঞ্চে আরও রক্ত ঝরার অপেক্ষা? আর তার ফল ভোগ করবে নিরীহ মানুষেরা? প্রশাসনের দায়িত্ব, নিয়ন্ত্রণও কি একেবারে থেমে গিয়েছে?

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।