বাউল সুর, আদিবাসী নাচের ছন্দ, সপ্তাহান্তে ঘুরে আসুন ঘরের কাছের এই হাটে

গোটা শান্তিনিকেতন ভালবেসে তার নাম দিয়েছে খোয়াই। আসল কারণটা অবশ্য আলাদা! সেই প্রসঙ্গে আসার আগে বলা দরকার, এখানকার প্রধান আকর্ষণ এখন শনিবারের খোয়াইয়ের হাট বা সোনাঝুরির হাট।

tiasa gupta
৪ মিনিট
বাউল সুর, আদিবাসী নাচের ছন্দ, সপ্তাহান্তে ঘুরে আসুন ঘরের কাছের এই হাটে

ওরে মন, হরি বিনে বন্ধু নাইরে ভবে,

সে যে পরমবন্ধু, দীনবন্ধু...

আশ্রমিক পরিবেশ ছেড়ে খোয়াইয়ের দিকে এগোতেই কানে আসবে বাউলের মন কেমন করা এই উদাস সুর। দূর থেকে ভেসে আসতে থাকে মাদলের মিষ্টি আওয়াজ। কাছে গেলেই আদিমতাকে স্পর্শ করা। আরও এগোতেই ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরির জঙ্গলে পাতার শনশন শব্দ। অদূরেই শান্তভাবে বয়ে যাচ্ছে কোপাই নদী। গোটা শান্তিনিকেতন ভালবেসে তার নাম দিয়েছে খোয়াই। আসল কারণটা অবশ্য আলাদা! সেই প্রসঙ্গে আসার আগে বলা দরকার, এখানকার প্রধান আকর্ষণ এখন শনিবারের খোয়াইয়ের হাট বা সোনাঝুরির হাট।

ভৌগোলিক তাৎপর্য এইরকম: ছোটনাগপুর মালভূমির সম্প্রসারিত অংশ বীরভূম। ভূতাত্ত্বিকদের কথায়, শান্তিনিকেতনের ভূমি কয়েকশো কোটি বছরের পুরনো আর্কিয়ান যুগের। অত্যন্ত শক্ত পাথুরে এই মাটি পরবর্তীকালে বৃষ্টিপাতের ফলে ক্ষয়ে প্রাকৃতিক ভাস্কর্যের রূপ নিয়েছে। তাই এর এত আকর্ষণ। ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট বলেই চলতি ভাষায় এই ভূমিরূপকে 'খোয়াই' বলা হয়। একটা সময় শান্তিনিকেতনের গোটা এলাকা খোয়াই ভূমিরূপে আবৃত ছিল। সময়ের নিয়মে সেসব অবলুপ্ত হয়ে জনবসতি গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বারো বছর বয়সে প্রথম শান্তিনিকেতনে এসে খোয়াইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন, যার উল্লেখ তাঁর 'জীবনস্মৃতি’-তে পাওয়া যায়। ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— ‘পৃথিবীর একটানা সবুজ উত্তরীয়/ তারই এক ধারে ছেদ পড়েছে উত্তর দিকে/ মাটি গেছে ক্ষয়ে... বর্ষাধারার আঘাতে বানিয়েছে/ ছোটো ছোটো অখ্যাত খেলার পাহাড়/ বয়ে চলেছে তার তলায় তলায় নামহীন খেলার নদী।’

এখানকার স্থানীয় আদিবাসী-পল্লীবাসীদের হাতের তৈরি শিল্পসামগ্রী কেনার জন্য হস্তশিল্পপ্রেমীরা এখানে আসেন। আসেন অনেক বিদেশি পর্যটকও। ফলে হস্তশিল্পর চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে চালু হয়েছে বীরভূম, বোলপুর এবং স্থানীয় এলাকার আদিবাসী সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। সেখানে আদিবাসী নারীরা মাদলের তালে নৃত্যের আলপনায় চতুর্দিক ভরিয়ে তোলেন। ধিতাং ধিতাং শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে এখানকার আকাশ-বাতাস। ধামসা বাজে, মাদল বাজে। আর সাঁওতালি ঝুমুর গানের সঙ্গে বাজে বাঁশি আর বানাম। অনেক আলাদা আলাদা দল এদিক-ওদিক নিজেদের মতো জায়গা করে নিয়ে অনর্গল নেচে চলেছে। মানুষ তাঁদের ঘিরে বসে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন মাটির সুর। নানা জায়গা থেকে এই আদিবাসীরা এসে সমবেত হন ধামসা-মাদল, বাঁশি-বানাম নিয়ে। মেয়েদের পরনে সাদা হলুদ রঙের লাল পাড় শাড়ি। মাথায় পিতলের কলসি দু'টি করে, একটির ওপরে আর একটি বসানো। তাতে গাছের শাখা। আদিম ছন্দে তাঁদের চিরন্তন ঝুমুর নাচ, ঝুমুর গান অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করে, যা থেকে আদিম সারল্য আর সনাতন সংস্কৃতির আঁচ পেতে ছুটে আসেন দূরদূরান্তের মানুষ। শনিবারের খোয়াইয়ের হাটে আসা পর্যটকরা আদিবাসীদের নাচের সঙ্গে কোমর দোলান। কয়েক মুহূর্তে আদিমতাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রেমের আদর্শ জায়গা প্রিন্সেপ ঘাট, যে ইতিহাস আজও অজানা

প্রেমিক-যুগল এখানে ভিড় করেন ঠিকই, কিন্তু প্রিন্সেপ ঘাটে ক্যামেরা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো লোকজন প্রচুর চোখে পড়বে আপনার।

রবীন্দ্রপ্রেমীরা মাটির সুর ভালবাসেন। এ এক বিস্ময়! আধুনিকতার সঙ্গে আদিমতার মেলবন্ধন ঘটে বোলপুরের খোয়াইতে, ইউক্যালিপটাস আর সোনাঝুরির ফাঁকে ফাঁকে লাল মাটি আর কাঁকরের ওপরে আসন পেতে বসা মেলায়। মাটির সুর যাঁদের এখনও টানে, তাঁরা হাজির হন খোয়াইয়ের হাটে। নীরব প্রকৃতির মাঝে এই মিলনক্ষেত্র বড়ই আনন্দের।

মনের টানে যাঁরা এখানে আসেন, তাঁরা কেউই খালি হাতে ফেরেন না। অনেকের কেনাকাটার বহর খুব বেশি। এই হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গ্রামবাসীদের অনেকে আয়ের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন বল্লভপুর গ্রামের কিছু বাসিন্দা স্থানীয় জঙ্গলে গিয়ে হরেক ধরনের শেকড়, বুনো ফলফুল ইত্যাদি সংগ্রহ করে মহিলাদের অলংকার গড়েছেন। নাগালের মধ্যে দাম এবং নতুন সেই সম্ভারের চাহিদা মেটাতে এখন নাকাল গ্রামবাসীরা।

এই হাটে মেলে একতারা, বাঁশি থেকে শুরু করে নানা হস্তশিল্পর সম্ভার, এমনকী পিঠে-পুলিও, কিন্তু সব ছাপিয়ে চলছে এখন সেলফি বাজার। দু'-তিনটি আদিবাসী নাচের দল ধামসা-মাদল নিয়ে তাদের রীতি অনুযায়ী পোশাক পরে নাচ-গান করে এখানে। আদিবাসী বলতেই যাঁদের মনে এক রোমান্টিক ছবি ভেসে ওঠে, সেই সব পর্যটক এসে আদিবাসীদের দলে মিশে নাচেন, অবশ্যই সেলফি বা ছবি তোলার জন্য, বিনিময়ে প্রত্যেকেই দিয়ে যান নাচের দলকে টাকা। এক দলের হিসেব, শনিবারে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্তও পাওয়ার রেকর্ড আছে তাদের।

সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে হাট, আদতে যা ছিল শনিবারের হাট, তা এখন হয়ে গেছে প্রাত্যহিক। সরকারিভাবে কিছু চালা তৈরি করা হয়েছে, হয়েছে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও, তবে শান্তিনিকেতনকে এড়িয়ে পর্যটকদের শুধু হাট দেখা এবং ঘোরার প্রবণতা অবাক করে দিচ্ছে স্থানীয়দের। এবং আইনের পরোয়া না করে লাগোয়া এলাকায় চলছে একের পর এক রিসর্ট নির্মাণ, আর সকাল হলেই পর্যটকদের বিনোদনের হরেক উপকরণ হাজির হচ্ছে এলাকায়। তাই প্রশাসনের দুশ্চিন্তাও বাড়াচ্ছে সোনাঝুরির হাট।

আজ এই হাটের ব্যাপকতার পিছনে যে নাম সবার আগে আসে, তা হলো, বিশ্বভারতী কলাভবনের প্রাক্তনী, প্রয়াত শ্যামলী খাস্তগীর। তাঁর উদ্যোগে এই ‘শনিবারের হাট’ এলাকায় বিখ্যাত হয়ে ওঠে। তখন হাট বসত সপ্তাহশেষের বিকেলে। মূল উদ্দেশ্য, পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ, বিশেষত মহিলাদের তৈরি নানা হস্তশিল্প, খাবার বিক্রি। আস্তে আস্তে তার পরিধি বাড়তে থাকে। এখন তো গাছের নিচে তৈরি হয়েছে মাচা। কাতারে কাতারে বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। খোয়াইয়ের হাট আজ বহু মানুষের কর্মতীর্থ।

এখন হাটে গেলে দেখা যাবে হাজারেরও বেশি ব্যবসায়ী চারিদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে বসে আছেন। পুরনো ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন করে যাঁরা জিনিস বিক্রি করতে আসছেন, বেশিরভাগই ব্যবসায়ীদের নিজেদের হাতে বানানো নয়। একসঙ্গে অনেক জিনিস কিনে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে হাটে আসছেন। ট্রাক্টর, টোটো, ভ্যান থেকে ঢালাও জিনিস নামিয়ে বিক্রি করতে বসছেন তাঁরা। এর ফলে যাঁরা সত্যিই শিল্পী, তাঁদের ব্যবসায় ক্ষতি হতে শুরু করেছে।

শান্তিনিকেতনে ট্রেনে যেতে চাইলে শতাব্দী, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস, কবিগুরু এক্সপ্রেস, গণদেবতা ইত্যাদিতে যাওয়া যেতে পারে, এই সবক'টি ট্রেনই কমবেশি সকালে। বোলপুর থেকে টোটো সরাসরি সোনাঝুরি যায়, দেড়শো থেকে দুশো টাকা ভাড়া। আর গাড়িতে গেলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যাওয়া যায়। সোনাঝুরিতে থাকার বন্দোবস্তও এখন অজস্র, এমনকী রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য দোকানও। সপ্তাহান্তে তাই খোয়াইয়ে হাটে ঢুঁ মারাই যায়।

বাউলের উদাস সুর আর মাদলের মিষ্টি ধ্বনি সঙ্গে নিয়ে এখান থেকে ফেরার সময়, আপনার সঙ্গে রয়ে যাবে- 'উর্মিল লাল কাঁকরের নিস্তব্ধ তোলপাড়...।'

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।