আতঙ্কের একুশে দেশের ভাঙা হৃদয়টাকে জুড়েছিলেন ওঁরাই, কুর্ণিশ মীরাবাই, নীরজ...

অতিমারী  সঙ্গে যুদ্ধ করেই কেটে গেল আরও একটা বছর। কোভিডের হানাদারি বদলে দিয়েছে চারপাশের পৃথিবীকে। ক্রীড়াজগতও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। তবে এই ভাঙনের দিনগুলিতেও আমাদের দুমড়েমুচড়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসকে কিছুটা হলেও যেন পুনর্স্থাপিত করেছেন এই ক্রীড়াবিদরাই। কখনও তীব্রভাবে জ্বলে উঠে পিছনে ফেলে দিয়েছেন বিশ্বসেরাদেরও, আবার কখনও প্রতিপক্ষের কাছে নাস্তানাবুদও হয়েছে দল কিংবা ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, কিন্তু দাগ রেখে গিয়েছে তাদের লড়াই। এই লড়াইটুকু এই দুঃসময়েও ভারতবাসীর মনে আশার সঞ্চার করেছে। আমাদের মনের ভাঙা টুকরোগুলিকে জুড়ে রেখেছে।  বর্ষশেষে সেই বাজিকরদের লড়াইকে ফিরে দেখা যাক আরও একবার।

অতিমারীর  দাপটে ২০২০  সালের যে সমস্ত বড় টুর্নামেন্ট স্থগিত হয়ে গিয়েছিল টোকিও অলিম্পিক্স তার মধ্যে অন্যতম। তবে এ বছর অলিম্পিকে ভারতের ফলাফল চার দশকের সেরা।এ বছর পদক তালিকায় ৪৮ নম্বরে শেষ করেছে ভারত ।এর আগে ২০০৮ সালে বেজিং অলিম্পিকে ভারতের র‍্যাঙ্কিং  সবচেয়ে ভালো ছিল। সে বছর অভিনব বৃন্দা সহ তিনটি স্বর্ণপদক জিতেছিল ভারত। তারপর ১৩  বছর পরে ভারতের সগৌরব প্রত্যাবর্তন এ বছর। টোকিও অলিম্পিকে সোনা এসেছে  ভারতের ঝুলিতে। একটি সোনা , দুটি রুপা ও চারটি ব্রোঞ্জ সহ মোট ৭ টি পদক জিতেছে ভারত। তবে  অলিম্পিকের প্রত্যেক প্রতিযোগীর পারফরম্যান্সই ছিল নজরকাড়া। এ বলে আমাকে দেখ ও বলে আমাকে ! জ্যাভলিনে সোনা জিতেছেন ২৩ বছরের নীরজ চোপড়া। জ্যাভলিন সহ ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে এই প্রথম কোনো কোনো ভারতীয় সোনা জিতলেন। আর স্বাধীনতার পর এই প্রথম জ্যাভলিনে সোনা এলো নীরজের হাত ধরে। ফাইনালে ৮৭.৫৮ মিটার ছুঁড়ে সোনার আক্ষেপ মিটিয়ে দিলেন আমাদের সোনার ছেলে।

মহিলাদের ৪৯ কেজি ওয়েট লিফটিং বিভাগে রূপো জিতেছিলেন মীরাবাই চানু। তাঁর হাত ধরেই টোকিও অলিম্পিকে প্রথম পদক আসে ভারতের। ৫৭ কেজি ফ্রিস্টাইল কুস্তির বিভাগে রবি কুমার দাহিয়া জিতেছেন দ্বিতীয় রুপোর পদকটি। রিও অলিম্পিকের পর এবারেও দেশবাসীকে নিরাশ করেননি পিভি সিন্ধু। প্রতিপক্ষ চীনের হি বিংজিয়াওকে হারিয়ে টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জিতেছেন সিন্ধু। অন্যদিকে ভারতীয় হকি দল ৪১ বছর পর অলিম্পিকে পদক জিতল। অদম্য মানসিকতার ওপর ভর করেই এই  ব্রোঞ্জ  নিয়ে এল মনপ্রীত সিংহরা। এছাড়াও বজরং পুনিয়া ( ছেলেদের ফ্রিস্টাইল কুস্তি ৬৫ কেজি) ও লাভলিনা বড়গোহাই ( বক্সিং) জিতেছেন ব্রোঞ্জ পদক।

তবে অলিম্পিকে পদক না জিতলেও ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মন জয় করেছেন অদিতি অশোক ( গলফ), মহিলা হকি দল, মেরি কম( বক্সিং) , দীপক পুনিয়া, কমলপ্রীত কৌর ( ডিসকাস থ্রো), দীপিকা কুমারী ও অতনু দাস (তিরন্দাজিজি) ।  তিরন্দাজি বিশ্বকাপে তিনটি সোনা জিতে বাংলা তথা ভারতের উজ্জ্বল করেছেন দীপিকা কুমারী। প্যারা অলিম্পিকেও রেকর্ড সংখ্যক মেডেল জিতেছে ভারত। মোট ১৯ টি পদক জিতে পদক তালিকায় ২৪  নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে ভারত। ১৯ পদকের মধ্যে ৫ টি সোনা,৮ টি রূপো এবং ৬ টি ব্রোঞ্জ। পাশাপাশি গড়েছেন রেকর্ডও। এঁদের মধ্যে অবনী লেখারা (১০ মিটার এয়ার রাইফেলে সোনা জয়ী প্রথম মহিলা) , সুমিত অন্তিল (ছেলেদের  জ্যাভলিনে সোনা), কৃষ্ণ নাগার (ছেলেদের ব্যাডমিন্টনে সোনা), ভাবিনাবেন পটেল( টেবিল টেনিসে রূপো), মনীশ নরওয়াল (ছেলেদের ৫০ মি. পিস্তলে সোনা) - রা উজ্জ্বল নক্ষত্র। বুঝিয়ে দিয়েছেন, শারিরীক অক্ষমতা মানসিক শক্তির কাছে কিছুই না- জীবন যুদ্ধেও জিতে গেছেন তাঁরা। জিতিয়ে দিয়েছেন আমাদের, সমস্ত ক্ষতে প্রলেপ পড়েছে।

চোখ ঝলসামো টুর্নামেন্ট পারফরম্যান্স  না হলেও ভারতীয় ফুটবল দল নেপালকে হারিয়ে অষ্টম বার সাফ ( সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডােশন) কাপ জিতেছে এবছর। পাশাপশি  জাতীয় দলের হয়ে ৮০ তম গোল করে লিওনেল মেসির রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেছেন অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী। এ বছর বিশ্ব দাবায় বাংলার অন্যতম মুখ মিত্রাভ গুহ। ২০ বছরের মিত্রাভ দেশের ৭২ তম গ্র্যান্ডমাস্টার। এ আলেখ্য তাকেও কুর্ণিশ জানায়।

তবে ভারতীর ক্রিকেপ্রেমীদের জন্য ২০২২ খুব ভালো কাটেনি বরং হতাশাই গ্রাস করেছে তাঁদের। টি ২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে খেলতে নামা ভারত লীগ পর্বেই বাদ পড়েছেন টুর্নামেন্ট থেকে। প্রথম দুটো ম্যাচে পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের কাছে বড় রানের ব্যবধানে হেরে জেতার তারা আশা চুর্ণ করে দিয়েছে ভারতীয় দল।বিতর্কও পিছু ছাড়েনি ভারতীর ক্রিকেট বোর্ড ও অধিনায়ক কোহলির। বর্ষশেষে সাদা বলের অধিনায়কত্ব নিয়ে বিরাট- সৌরভের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। সাদা বলের খেলায় এখন থেকে অধিনায়কত্ব করবেন রোহিত শর্মা। নতুন কোচ হিসেবে ভারতীয় দলে যোগ দিয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়।তাই আগামীদিনে দ্রাবিড় সভ্যতায় রোহিতের অধিনায়কত্বে দলের পারফরম্যান্সের ওপর নজর থাকবে ভারতবাসীর। 
২১-এর শেষ লগ্নে নতুন পালক যোগ করেছেন শ্রীকান্ত কিদাম্বি। বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে পৌঁছে রূপো এনেছেন দেশের জন্য তিনি। শ্রীকান্তই প্রথম ভারতীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় যিনি এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছেছেন। ‌

আরও পড়ুন-বিশ্বে মাত্র ১৫টি আছে! প্রধানমন্ত্রীর এই নতুন গাড়ি সর্বংসহা, কেন এই বাহন বাছলেন মোদী

এখন দেখার আগামী বছরের শীতকালীন অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকে ভারতের ফলাফল কেমন হয়। পাশাপশি ক্রিকেটপ্রেমী ভারতবাসীর চোখ থাকবে পুরুষদের আইসিসি টি২০ বিশ্বকাপ ও মহিলাদের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপের দিকে। অতিমারীর দাপট কমে এসেছে। খেলাই আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল আরও বেঁধে বেঁধে থাকার মন্ত্রটা। সেই  ঠেকে শেখা মন্ত্রই আমাদের ২০২২-এর পাথেয় হোক। 

More Articles

;