মাতঙ্গিনী হাজরার আন্দোলনের পিছনে ছিল বড় পরিকল্পনা, পাল্টে যেতে পারত ভারতের ইতিহাস

মাতঙ্গিনী হাজরার কথা উঠলে আমরা সবাই সেই বিখ্যাত মিছিলের ঘটনা বললেও তার পিছনে থাকা বৃহৎ উদ্দেশ্যের কথা আমরা ভুলে যাই।

Raktim Dey
৩ মিনিট
মাতঙ্গিনী হাজরার আন্দোলনের পিছনে ছিল বড় পরিকল্পনা, পাল্টে যেতে পারত ভারতের ইতিহাস

স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামে বাংলার বহু বিপ্লবী আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। মেদিনীপুরের মাটিতে সেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক ৭২ বছর বয়সি মহিলার নাম। স্বাধীনতার ৭৫ বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে আমরা তাঁর ব্যাপারে কতটা জানতে চেয়েছি? মেদিনীপুরের গান্ধীবুড়ির শেষ লড়াইয়ে কি সত্যি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে সাহায্য করার পরিকল্পনার বীজ বপন করা হয়েছিল? মাতঙ্গিনী হাজরা কি শুধুই বহু মানুষ নিয়ে মিছিল করে একটা থানা দখল করতে গিয়েছিলেন, না কি তার পিছনে ছিল এক বিশাল পরিকল্পনা?

১৯৪২ সাল। মানুষ তখন সর্বস্তরে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা শুরু করেছে। সুভাষচন্দ্র বসু জার্মানিতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটা অংশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তখন তার পরিচয় শুধু সুভাষচন্দ্র বসু নেই। মানুষের কাছে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। জার্মানিতে থেকে তিনি ব্রিটিশদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন। সেই সময় মহাত্মা গান্ধী ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন। ভারতের সর্বত্র এই আন্দোলনের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছিল। বিপদ দেখে ইংরেজরা সমস্ত আন্দোলন প্রতিহত করার ব্যবস্থা করলেও মেদিনীপুরের আন্দোলনের তীব্রতা হয়তো তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ভারত ছাড়ো ডাক শুনে কিছু মিছিল, অবরোধ অথবা দখলের থেকেও বেশি দূর যে মেদিনীপুরের মানুষ এগিয়ে যাবে তা হয়তো সেই সময়ে কারওরই মাথায় আসত না। ব্রিটিশরা তাদের ততটাও গুরুত্ব দেয়নি, আন্দোলনকারীদের অংশ হিসেবেই দেখছিল। কিন্তু মেদিনীপুরের মানুষের মাথায় তখন অন্য পরিকল্পনা ছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামের আখড়া, আজ কলকাতার রাজপথে অবহেলিত হয়ে দাঁড়িয়ে এই বাড়ি

৪৮ নম্বর বিধান সরণির বাড়িটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুঃখের বিষয় হলো এই যে, এত বড় কর্মকাণ্ডর সঙ্গে জড়িত বাড়িটা মানুষের কাছে সেইরকম গুরুত্ব এবং সন্মান পায়নি, যা তার প্রাপ্য ছিল।

গান্ধীর ইংরেজ ভারত ছাড়ো ডাক শুনে মেদিনীপুরের বিপ্লবীরা ঠিক করেছিলেন যে, তাঁরা মেদিনীপুরে ব্রিটিশদের উৎখাত করে তাঁর বদলে ভারতীয়দের সরকার স্থাপন করবেন। সেই পরিকল্পনামতো বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা কেটে, গাছ ফেলে আন্দোলন শুরু হয়েছিলো। এই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে এল সেই দিন। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রায় ছ'হাজার মানুষের মিছিল তমলুক পুলিশ স্টেশন দখলের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলল। মিছিলের শুরুতে এগিয়ে চলেছেন তাঁদের নেত্রী, ৭২ বছরের মাতঙ্গিনী হাজরা। মানুষের কাছে তিনি গান্ধীবুড়ি নামে পরিচিত ছিলেন। বহু সামাজিক এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডর সঙ্গে জড়িত মাতঙ্গিনী মানুষের খুবই কাছের ছিলেন। কথিত আছে যে, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডর জন্য জেলবন্দি থাকার পরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ামাত্র তিনি মানুষের সেবায় ছুটে গিয়েছিলেন। ভাবাই যায় না যে, সেই সময় এক বৃদ্ধা নিজে মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ছ'হাজার মানুষকে নিজেদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। ভাবলে মনে হয়, কল্পকাহিনি; কিন্তু বাস্তব মাঝে মাঝে কল্পনার থেকেও এগিয়ে থাকে। লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পুলিশের তরফ থেকে ১৪৪ ধারার কথা জানিয়ে গুলি চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মাতঙ্গিনী তাদের হুঙ্কার শুনে দমে যাননি। পতাকা হাতে মিছিল নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুখপত্র অনুযায়ী তিনি একাধিকবার গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। হয়তো গুলিগুলো ছুটে এসেছিল ইংরেজদের অধীনে কাজ করা কোনও ভারতীয়র তাক করা বন্দুক থেকেই। বিপ্লবী সংবাদপত্র অনুযায়ী জানা যায় যে, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি সবাইকে পিছনে ফেলে একাই এগিয়ে গিয়েছিলেন। শেষে হাতে পতাকা ধরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে সংগ্রামের আগুন আরও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। তারই ফলস্বরূপ ১৭ ডিসেম্বর তাম্রলিপ্ত সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতায় বিভিন্ন এলাকায় বিপ্লবীদের দ্বারা নিজেদের সরকার গঠন হলেও তাম্রলিপ্ত সরকারের মতো দীর্ঘ সময়ের জন্য সেইগুলি স্থায়ী হতে পারেনি। ১৭ ডিসেম্বর গঠিত হওয়া এই সরকার ৮ আগস্ট, ১৯৪৪ অবধি স্থায়ী ছিল। এই স্বাধীন সরকারের নিজস্ব এলাকা, আদালত, থানা এমনকী, রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি ছিল। ব্রিটিশ শাসনের পাশাপাশি এই স্বাধীন সরকার নিজের বিভিন্ন কার্যকলাপ বজায় রেখেছিল। সতীশকুমার সামন্ত, সুশীলকুমার ধাড়া, অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো বিপ্লবীরা এই সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সেই সময় মেদিনীপুরে ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যা হয়েছিল। তাম্রলিপ্ত সরকারের পক্ষ থেকে দুর্যোগ-কবলিত এলাকায় ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। স্কুলে বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাম্রলিপ্ত সরকার বিদ্যুৎবাহিনী নামে একটি সেনাদল তৈরি করেছিল। এই সেনাদের প্রধান ছিলেন সুশীলকুমার ধাড়া। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন ছাড়া তাঁদের একটি গোপন উদ্দেশ্য ছিল। নেতাজি সেই সময়ে ব্রিটিশ শাসনের ওপর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যদি নেতাজি সেনা-সহ বাংলায় প্রবেশ করতে পারেন, তাহলে বিদ্যুৎবাহিনীর তাঁকে সবরকমের সাহায্য করার পরিকল্পনা ছিল। মহাত্মা গান্ধী ভারত ছাড়ো আন্দোলন বন্ধ করার অনুরোধের পর তাম্রলিপ্ত সরকারের অবসান ঘটে।

মাতঙ্গিনী হাজরার কথা উঠলে আমরা সবাই সেই বিখ্যাত মিছিলের ঘটনা বললেও তার পিছনে থাকা বৃহৎ উদ্দেশ্যের কথা আমরা ভুলে যাই। আসলে আমরা নিজেদের ইতিহাস ভুলে যাই। তাই হয়তো তাম্রলিপ্ত সরকার এত বড় একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলার পরেও ইতিহাসের একটা ধুলোপড়া পাতায় কয়েকটা লাইন হয়ে থেকে গিয়েছে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।