ব্যাগ পিঠে রোজ ৩ কিমি রাস্তা পেরিয়ে স্কুল, শেখার স্বপ্নে মশগুল আশির 'ছোকরা'

78YO Mizoram Man: এই বয়সে এসেও ইংরেজি শিখতে চান তিনি। শুধু শিখতেই চান না, ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে চিঠিও লিখতে চান লালরিং। টিভি-তে ইংরেজি খবর শুনবেন, সেসব বুঝতে পারবেন, এ সাধ তাঁর কতদিনের।

Sohini Das
৩ মিনিট
ব্যাগ পিঠে রোজ ৩ কিমি রাস্তা পেরিয়ে স্কুল, শেখার স্বপ্নে মশগুল আশির 'ছোকরা'

কথায় বলে, শেখার কোনও বয়স হয় না। কথায় এ-ও বলে, বয়স সংখ্যা মাত্র। এসব শুধুই কি কথার কথা, নাকি কেউ কেউ জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দেন এসব বাগধারা, কথার কথাকে। এই মানুষটার কথাই ধরুন না, বয়স আটাত্তর পেরিয়েছে। ক্রমে ধীর পায়ে হাঁটা লাগিয়েছেন আশির দিকে। অথচ ইচ্ছাশক্তিতে পড়েনি বয়সের ছোপ। বরং বয়সের ভারকে কাঁচকলা দেখিয়ে তিনি ছুটে চলেছেন নতুন কিছু শেখার, জানার আনন্দের কাছে।

টাকা পয়সার অভাব, সংসারের জোয়াল কাঁধে নিতে গিয়ে পড়াশোনা শেখার ইচ্ছাটাকে শিকেয় তুলতে হয়েছিল মিজোরামের বাসিন্দা লালরিংথারাকে। অর্থাভাবে স্কুলছুট হওয়ার ঘটনা এ দেশে নতুন কোনও ঘটনা নয়। সংসার টানতে গিয়ে কমবয়সেই উপার্জনের পথে নামাটাও। সেই একই স্রোতে ভাসতে হয়েছিল লালরিংথারাকেও।

কিন্তু তাই বলে স্বপ্ন কি থেমে থাকে! শিক্ষিত হওয়ার ইচ্ছা পিছু ছাড়েনি তাঁর এই আটাত্তরেও। আর সেই অদম্য ইচ্ছের ডানায় ভর করেই আশির দোরগোরায় পৌঁছে স্কুলে যান লালরিং। ১৯৪৫ সালে মিজোরাম-মায়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন চম্পাই জেলার খুয়াংলেং গ্রামে জন্ম লালরিংয়ের। পরিবার-পরিস্থিতির চাপে দ্বিতীয় শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি তাঁর। বাবার মৃত্যুর পর মাকে সাহায্য করতে হাত লাগাতে হয়েছিল চাষবাসের কাজে। তারপর বাড়িবদল। পড়াশোনার যেটুকু সুযোগ ছিল, তা-ও যেন শেষ করে দিল। লালরিংয়ের মতো আশা ছাড়েননি মা-ও। বছর তিনেক পর চেষ্টাচরিত্র করে ফের পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করালেন ছেলেকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। ফের সংসারের চাপে স্কুলছুট হলেন লালরিং।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অবিশ্বাস্য! বয়সকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন এই ব্যক্তি? কীভাবে?

Anti Ageing Technique: সকাল সকাল ৬০ খানি ওষুধ খান ব্রায়ান। বাকি দিনে আরও ৪০ টা!

বেঁচে থাকার জন্য, পেট চালানোর জন্য স্থানীয় একটি গির্জায় পাহারাদারের চাকরি নিলেন লালরিং। এখনও সেই চাকরি করছেন তিনি। তবে তার সঙ্গে করছেন স্বপ্নপূরণও। বাংলা ভাষায় স্বশিক্ষিত বলে একটি কথা আছে। লালরিংও কিছুটা তাই। নিজের চেষ্টায় মিজো ভাষাটি শিখেছেন তিনি। ২০১৮ সালে সমস্ত বাধা-বন্ধকতার মুখের উপর দিয়ে ফের স্কুলে গিয়ে নিজের নাম নথিভুক্ত করান লালরিং। সত্তর বছর বয়সে এসে ভর্তি হন পঞ্চম শ্রেণিতে। যেখানে তিনি ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন পড়াশোনা। হ্রুয়াইকাওম গ্রামের ওই স্কুলেই সেরেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠন। তবে তার পর ফের বাধা। এর পরে আর পড়াশোনার সুযোগ নেই গ্রামে। হাইস্কুলের পড়াশোনা অসম্ভব সেখানে থেকে। কিন্তু হাল ছাড়তে নারাজ লালরিং।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১০৩ বছর বয়সেও লাগাতার জিম! বয়সকে তুড়ি মেরে দূরে সরানোর যে মন্ত্র শেখাচ্ছেন এই 'ঠাকুমা'

103 Years Old Grandma Gym Fitness : বাকিদের সঙ্গে টেরেসাকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। কারণ, এই শক্তিশালী ‘তরুণী’র বয়স খুব বেশি নয়, মাত্র ১০৩ বছর!

গত এপ্রিল মাসে লালরিং গিয়ে ভর্তি হয়ে এসেছেন রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অভিযান হাই স্কুলে। সেটা তাঁর গ্রাম থেকে আরও তিন কিলোমিটার দূরের পথ। কিন্তু কুছ পরোয়া নেই। আশির দোরগোরায় পৌঁছেও প্রতিদিন ওই রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যান লালরিং। বৃষ্টি হোক, জল হোক, চাঁদি ফাটানো গরম হোক। কোনও কিছুই আটকাতে পারেনা লালরিংয়ের পথ।

লালরিংয়ের সাফ কথা, বয়স তাঁর জ্ঞানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না কিছুতেই। এই বয়সে এসেও ইংরেজি শিখতে চান তিনি। শুধু শিখতেই চান না, ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে চিঠিও লিখতে চান লালরিং। টিভি-তে ইংরেজি খবর শুনবেন, সেসব বুঝতে পারবেন, এ সাধ তাঁর কতদিনের। লালরিংয়ের অসম্ভব মনের জোর দেখে স্তম্ভিত স্কুল। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শেখার ইচ্ছে ও ক্ষমতা, দুটোই কমে। আর লালরিং যেন সেই দুনিয়ায় নিপাতনে সিদ্ধ। স্কুল থেকে ইতিমধ্যেই বৃদ্ধের হাতে তুলে দিয়েছে পোশাকআশাক ও প্রয়োজনীয় বইপত্তর। ওই স্কুলের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য কোনও বাধা বয়স নেই। ফলে লালরিংকে বাধা দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। বরং তার এই অদম্য ইচ্ছে ও মনের জোরকে কুর্নিশ জানিয়েছে স্কুল। লালরিংয়ের এই যাত্রার সঙ্গী হতে পেরে, তাঁর স্বপ্নপূরণ করতে পেরে খুশি স্কুল কর্তৃপক্ষও। তাঁদের তরফে জানানো হয়েছে, লালরিংয়ের পড়াশোনা শেষ করতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করবে স্কুল।

চল্লিশ পেরোলেই চালসে, গেটে বাত, কোমর কনকনের যুগে লালরিংথারা যেন উদাহরণ, যিনি শেখান জীবনের প্রতিমুহূর্তকে নিংড়ে কীভাবে বাঁচতে হয়। কোন মন্ত্রে বৃদ্ধ অশীতিপর শরীরেও মনকে রাখা যায় টগবগে টাটকা। আসলে এ-ও এক শিক্ষা। যা তিনি অর্জন করে ফেলেছেন বহু আগেই। এই হার না-মানার মানসিকতা আর লালরিংয়ের আশ্চর্য জীবনীশক্তিকেই কুর্নিশ জানাচ্ছে গোটা দুনিয়া।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।