তালিবান শাসনের দু'বছর পূর্তি! কেমন আছেন আফগানিস্তানের মেয়েরা?

2 years of Taliban takeover in Afghanistan: এরা গোড়াতেই শিকল পরায় নারীশিক্ষার পায়ে। কারণ শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখতে পারলেই বাকি সমস্ত কিছু জলের মতো সোজা। আর সেই সোজা পথেই মেয়েদের সমস্ত জোরকে ভেঙে ফেলা যাবে এক লহমায়।

Sohini Das
৩ মিনিট
তালিবান শাসনের দু'বছর পূর্তি! কেমন আছেন আফগানিস্তানের মেয়েরা?

দু'বছরের তালিবান শাসন। আর তা-ই যেন আফগানিস্তানকে ফের ঠেলে দিয়েছে একশো বছর পিছনে। এ যেন কেমন রঁদেভু। যতবার একটু এগোতে চায় আফগানিস্তান, ততবার আরও কিছুটা করে পিছিয়ে যায় দেশটা। মানবাধিকার শব্দের তেমন দাম বা মর্ম নেই তালিবানদের কাছে। মৌলবাদী শাসনের কাছে ছোট পড়ে যায় বাকি সমস্ত দেশ, মানুষ, অধিকার।

২০২১ সালের ১৫ অগস্ট হঠাৎ করেই আফগানিস্তান থেকে সেনা সরাতে শুরু করে আমেরিকা ও ন্যাটো। প্রায় দু'দশক পরে। কী ঘটতে চলেছে, তখনও বোধহয় আঁচ করতে পারেননি আফগানিস্তানবাসী। অল্প দিনের মাথায় আফগানিস্তানের দখল নিল কঠোর মুসলিমপন্থী সংগঠন তালিবান। শুরু হল অত্যাচার, নিষেধাজ্ঞা। নতুন পর্বের তালিবান শাসনের দেখতে দেখতে দু'বছর পার করল। নব্বইয়ের দশকে যখন তালিবানের দখলে ছিল আফগানিস্তান, তখন অবস্থা ছিল ভয়ঙ্কর। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে অবশ্য তালিবান দাবি করেছিল, এবার অনেকটাই নরমসরম তাঁরা। তবে খুব বেশিদিন লাগেনি প্রমাণ হতে যে তালিবান আছে তালিবানেই।

দেশে সরকার গড়ে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকে তালিবানেরা। মেয়েদের উপর শুরু হয় অত্যাচার। কেড়ে নেওয়া হয়, শিক্ষা-চাকরিবাকরির মতো একাধিক অধিকার। না, এর বিরুদ্ধে সরব হওয়ার জায়গা নেই আফগানিস্তানে। কারণ যে কোনও ধরনের প্রতিবাদের একটিই মাত্র উত্তর, মৃত্যু। উনিশ থেকে বিশ হলেই মাথার উপর নেমে আসে অত্যাচারের খাঁড়া। ঘাড়ের কাছে উঁচিয়ে থাকে মৌলবাদের ছুরি। আর সেই অভিশাপ মাথায় করেই আরও দু'টি বছর বেঁচে রইলেন বাসিন্দারা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্বাধীনতা অলীক স্বপ্ন, তালিবানের অধীনে যেভাবে দিন কাটে আফগানিস্তানের মেয়েদের

Afganistan Crisis: মাথার উপর ঠেকানো রয়েছে বন্দুকের নল। শিক্ষা বন্ধ, স্বাধীনতার গন্ধ তো এদ্দিনে ভুলেছে দেশবাসী। এবার আফগানিস্তানে জারি নয়া নিষেধাজ্ঞা।

সময়ের ঘড়ি সেখানে যেন উল্টোদিকে ছোটে। গোটা পৃথিবী যা করে, যা দেখে, তার থেকে একশো বছর পুরনো ভাবনাচিন্তায় চলতে বাধ্য হচ্ছেন সেখানকার মানুষ। শিক্ষার সুযোগ নেই, শিল্পের সুযোগ নেই, চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে নানা বাধার পাহাড়। ষষ্ঠ শ্রেণির পর আরও কোনও মেয়ে স্কুলের চৌকাঠ পেরোতে পারবে না, জানিয়ে দিয়েছিল তালিবান। সেই অবস্থান থেকে টলানো যায়নি তাদের। বরং ক্রমশ আরও এক পা, দু-পা করে মেয়েদের সমস্ত অধিকারের দিকে হাত বাড়িয়েছে তারা। শিক্ষার পর মেয়েদের পোশাক, চাকরিবাকরি, প্রসাধনী ব্যবহার, স্যালো বা পার্লার ব্যবহার এম হাজারটা জিনিস এখন তালিবানদের আতসকাচের তলায়।

'এরা যতবেশি পড়ে, যত বেশি জানে, তত কম মানে।'- এই আপ্তবাক্য যেন যে কোনও স্বায়ত্ত্বশাসনেরই। হীরক রাজার মুখের সেই কথা যেন অবিকল ধ্বনিত হয় তালিবানদের কাজকর্মে। তাই যেন এরা গোড়াতেই শিকল পরায় নারীশিক্ষার পায়ে। কারণ শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখতে পারলেই বাকি সমস্ত কিছু জলের মতো সোজা। আর সেই সোজা পথেই মেয়েদের সমস্ত জোরকে ভেঙে ফেলা যাবে এক লহমায়। সেখান থেকে ভাঙবে সমাজ, দেশ ক্রমশ। যৌনদাসী করে রাখা যাবে মেয়েদের ইচ্ছামতো। আর এমনই সব পরিকল্পনা নিয়ে কাবুল জয়ের দু'বছর পালন করে ফেলল আফগানিস্তানের তালিবান সরকার।

সেই জয়ের উদযাপন উপলক্ষে বিবৃতি জারি করেছেন তালিবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। সেখানে তিনি জয়ের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তালিবানের পবিত্র সংগ্রামীদের। তাঁদের এই জয়ের জন্য ধন্যবাদ জানাতে বলেছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহকে। বিজয়দিবস উপলক্ষে নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে দেশ। ঘোষণা করা হয়েছে জাতীয় ছুটি। আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই কোনও অংশে। তালিবানের মতে, আফগানিস্তানে তালিবান সাম্রাজ্য 'ওপেন এন্ডেড'। এককথায় তারা অপ্রতিরোধ্য। তাদের শাসনব্যবস্থা টলাতে পারে এমন শক্তি তাদের আশপাশে নেই। অতএব নিশ্চিন্তে দেশে চলবে তালিবান শাসন। নারীশিক্ষার ব্যাপারেও অবস্থান পরিবর্তনের প্রশ্নে নেই তারা। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের তরফে।

দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার, যাকে তালিবানদের আতুড়ঘর বললে খুব একটা ভুল বলা হয়না, সেখানে দেখা গেল অদ্ভুত ছবি। তালিবানি পতাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট ছেলেপুলেরা। রাস্তায় টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ি। তরুণ তুর্কিরা সব সাইকেল, বাইকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে সত্যিই কি মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে মৌলবাদী প্রশ্নে! এদিকে ক্রমশ নিম্নমুখী আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা। বছর দুয়েক আগেও অন্যান্য দেশগুলি থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থসাহায্য পেত। আফগানিস্তানের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই আসত সেখান থেকে। তবে তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে তা প্রায় বন্ধ। কোভিডকালীন পরিস্থিতি আরও কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল আফগানিস্তানের মানুষদের। চিকিৎসা পরিকাঠামোর অভাব, অপুষ্টির মতো সমস্যা ছেঁকে ধরেছে তাঁদের। তার উপরে তিন বছর ধরে লাগাতার খরার জেরে বিপাকে পড়েছে দেশ। কমছে পারিবারিক আয়। তার উপর আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কগুলি আফগানিস্তানের সঙ্গে কোনওরকম অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর প্রাকৃতিক বিপর্যয় তো লেগেই আছে।

সব মিলিয়ে ভালো নেই আফগানিস্তান। ভালো নেই বাসিন্দারা। অবশ্য প্রজাকল্যাণ নিয়ে তেমন কোনও মাথাব্যথা তালিবানের নেই। আর তা থাকার কথাও না। বরং মৌলবাদের মতো সংক্রমণকে দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাতেই বেশি মজে তারা। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ভয়াবহ শাসনকাল চালিয়েছিল তালিবানেরা। সেই প্রথম পর্যায়ের ভয়বহতাকেও কি মাত দিতে চলেছে তালিবান 2.O? আর কতদিন এমন দগ্ধে দগ্ধে বেঁচে থাকবেন আফগানিস্তানের মানুষ। কতদিন অন্ধকার বোরখার নিচে চাপা পড়ে থাকবে মেয়েদের মৌলিক অধিকারটুকু। সেই প্রশ্নটাই শুধু এখন ঘুরপাক খায় বাতাসে। কিন্তু সদুত্তর মেলে না।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।