নিজেকে নস্যাৎ করতে শেখান গায়ত্রী

গায়ত্রীর এক বৃহত্তর দুনিয়ার নারীবাদ নিজেকেও বাদ রাখে না সমালোচনার পরিসর থেকে। লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসনকে জুড়ে দেখার কথা বারবার বলেছেন গায়ত্রী।

Amrita Sarkar
৪ মিনিট
নিজেকে নস্যাৎ করতে শেখান গায়ত্রী

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক শেষ এক দেড় দশক ধরে ভারতীয় অ্যাকাডেমিয়ায় বিবিধ কারণে কুখ্যাত হয়েছেন। ভারতীয় দলিত বিদ্যা দিন দিন যত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, গায়ত্রী তো বটেই, রণজিৎ গুহদের পুরো সাবঅল্টার্ন চর্চাটিকেই বিবিধ সমালোচনায় বিদ্ধ করা হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের নারীবাদের যে ধারাটি গায়ত্রী, চন্দ্রা তালপাড়ে মোহান্তি, রাজেশ্বরী সুন্দর রাজন, কুমারী জয়বর্ধনেরা তাঁদের মেধা দিয়ে পুষ্ট করতেন, সেই ধারাটিই বন্দনা শিবা, শর্মিলা রেগেদের তোলা বিবিধ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ফলে আজকের দিনে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের গুরুত্ব নিম্নবর্গ চর্চার ক্ষেত্রেই হোক , কিংবা, নারীবাদের ক্ষেত্রেই হোক অনেকটাই কমেছে। তাহলে গায়ত্রী চর্চাকে আমি একজন দলিত নারীর প্রেক্ষিত থেকে কি বাতিল সংস্কৃতি হিসেবে ধরব? গায়ত্রীর ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রবণতার হেতু কি একজন দলিত নারী হিসেবে আমি গায়ত্রীকে পড়ব না? আমি গায়ত্রীর নারীবাদ নিয়ে ভাবতে বসি। ভাবতে বসেই মহাশ্বেতা দেবীর মুখ ভেসে আসে আমার সামনে। মহাশ্বেতার লেখার মধ্যে উদ্ধারকারী একটা প্রবণতা থাকলেও, সেই প্রবণতা মহাশ্বেতার লেখার শোষণের বিরুদ্ধে মূল যে সুর তাকে কখনোই চাপা দেয় না। মহাশ্বেতার লেখাকে হাতিয়ার করে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন ফরাসি নারীবাদের সর্বগ্রাসী প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন আমি গায়ত্রীর দিকে তাকাই।

তাকিয়ে দেখি সারা দুনিয়ার নারীকে এক ও অভিন্ন হিসেবে ভাবার যে ইউরোপীয় প্রবণতা তাকে মহাশ্বেতার ‘স্তনদায়িনী’ গল্পটির যশোদা চরিত্রটির বিশ্লেষণ করে কী অনায়াসে প্রশ্ন করছেন তিনি। ইউরোপীয় নারীবাদে মাতৃত্বকে বরাবরই মাগনার শ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাতৃত্বকে দেখা হয়েছে ‘নারীর অর্থনীতিতে বিন্দুমাত্র সাহায্য না করা একটি অস্তিত্ব’ হিসেবে। বারংবার বলা হয়েছে মাতৃত্ব এমন একটি পরিসর যেখানে একটি মেয়ের অর্থনৈতিক ভাবে ফায়দাজনক কাজের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে। গায়ত্রী ইউরোপীয় এই লেন্সকে তাকাতে বলেন মহাশ্বেতা দেবীর যশোদার দিকে। যশোদা যিনি একজন ‘প্রফেশনাল মাদার’। যশোদা বারবার মা হয়। উচ্চশ্রেণির বাচ্চাদের মধ্যে যাদের মায়ের বুকের দুধ জোটে না ,তাদের স্তন্য পান করিয়ে দু’টো পয়সা কামানোর জন্য। ইউরোপীয় নারীবাদের ধারণার সীমাবদ্ধতার বিপ্রতীপে গায়ত্রী যশোদার চরিত্রটিকে তৃতীয় বিশ্বের নারী হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। যশোদা তৃতীয় বিশ্বের সেই নারী যে মাতৃত্বকেও তার তথাকথিত স্বর্গীয় গরিমা থেকে সরিয়ে আক্ষরিক অর্থেই দুই-পয়সার কাজে রূপান্তরিত করে এবং সেই দুই পয়সার হেতুই সে তার স্তনকে ব্যবহার করে চলে । যশোদার স্তন ক্যানসার অব্ধি চাপা পড়ে যায় দুই পয়সার তাড়নায়। যশোদা নিজের পঙ্গু স্বামী ও বাকিদের প্রতিপালন করে চলে ‘প্রফেশনাল মাদার’ হিসেবে। গায়ত্রী এই প্যারাডক্সকেই আলোচনায় এনেছেন বারবার নারীবাদকে একটি নির্দিষ্ট বৃত্ত থেকে বের করে আনতে। অথচ একাডেমিক হিসেবে তাঁর দ্বারা সমালোচিত ফরাসি নারীবাদকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বৃহত্তর দুনিয়ার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও কিন্তু গায়ত্রী নিজেই করেছেন অনুবাদক হিসেবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সংবিধানের দলিত, দলিতের সংবিধান: একটি বোঝাপড়া

Constitutional Rights of Dalits: সংবিধানের রক্ষাকবচ না থাকলে ভারতীয় দলিত বহুজন যে বহু পরিসর থেকে আজও বহু দূরে থাকত তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

গায়ত্রীর এক বৃহত্তর দুনিয়ার নারীবাদ নিজেকেও বাদ রাখে না সমালোচনার পরিসর থেকে। লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসনকে জুড়ে দেখার কথা বারবার বলেছেন গায়ত্রী। নিজেকে যশোদার জায়গায় বসাবার অক্ষমতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তারপর ভেবে দেখতে বলেছেন গায়ত্রীর মতো তথাকথিত প্রিভিলেজপ্রাপ্ত তৃতীয় বিশ্বের নারীদেরকে কীভাবে ব্যবহার করেছে ইউরোপীয় ও মার্কিন অ্যাকাডেমিয়া।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গায়ত্রী স্পিভাকদের নিয়ে আমরা কী করি?

গায়ত্রী স্পিভাকদের নিয়ে এই আমরাই নিরলস তর্ক করি। মুক্তির দাবি, আজাদির স্লোগানে অটুট-আস্থা নিজের উত্তেজিত যুবক-মনের সঙ্গে তর্ক করি। বলে বসি, স্লোগান যথেষ্ট নয়।

১৯৫০-এর কলকাতায় গায়ত্রীর মতো উচ্চঘরের পড়াশোনায় ভালো মেয়েদের শেষ পরিণতি যে ইংরেজি অনার্স এবং তারপর ইউরোপ বা আমেরিকায় পাড়ি দিয়ে কেবলমাত্র ইংরেজি সাহিত্য নিয়েই অধ্যাপনা করা তা যেন আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকত। এই মেয়েরা যখন এই লাইন না মেনে ইউরোপ বা আমেরিকায় গিয়ে নারীবাদকে নিজেদের পেশাদার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে থাকল, তাই নিয়ে তথাকথিত রক্ষণশীল অ্যাকাডেমিকদের যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছিল। এই অস্বস্তি নিয়েই গায়ত্রীর নারীবাদী চর্চার শুরু এবং নারীবাদকে নিজের দেশের প্রেক্ষিত থেকে ভিন্ন ভাবে দেখার চেষ্টা করা।

গায়ত্রীর এই যাত্রাপথটি যদি আমরা একটু সংবেদনশীল হয়ে দেখি, তাহলে দেখতে পাব, একটি মেয়ে এক বৃহত্তর দুনিয়ার সন্ধানের জন্য নিজের জন্য পূর্ব-নির্ধারিত একাডেমিক পরিকল্পনা বাতিল করতে করতে এগোচ্ছে ক্রমাগত। নিজের চর্চার ক্ষেত্রকেই বারবার সে আলাদা আলাদা প্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষণ করে সমালোচনায় বিদ্ধ করছে। আপাত ভাবে আমাদের তাকে খুব দ্রুত মতামত পাল্টাতে থাকা এক নারী মনে হতে পারে। তখনই আমার মনে হয় নারী বলেই তো যা কিছুই শিখেছেন তাকে দ্রুত আনলার্ন করতে বলেছেন গায়ত্রী বারবার। নারী বলেই তিনি জানতেন, আনলার্নিং সেই পথ যা একজন নারীর পক্ষে সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা। তাই নিজেই নিজের মতকে বারবার প্রশ্ন করেছেন, ভেঙেছেন এবং নয়া ভাবে গড়েছেন গায়ত্রী। বাংলা-বিহারের সীমান্তবর্তী এক এলাকায় নিজের দাদুর জমিদারিতে একবার দুই ধোপা-বউ-এর কথাবার্তা শুনেছিলেন গায়ত্রী ভারত স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপরই। সেই দুই মহিলা নিজেদের জমির মালিকানা প্রসঙ্গে বারবার ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র উল্লেখ করছিল। তরুণী বয়সের গায়ত্রী ভেবেছিলেন তথাকথিত শিক্ষা থেকে দূরত্বের জন্যই এই শ্রেণির মহিলাদের এই ভুল ধারণাগুলো থাকে এবং ভুল ধারণাগুলোর জন্যই তারা শোষিত হন। অনেক বছর পর সেই দুই মহিলার সংলাপ নিয়ে আবার ভাবতে বসেন গায়ত্রী এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছন, ওই দুই মহিলা ঠিকই বলছিল। তথাকথিত স্বাধীন ভারতবর্ষেও ওই দুই মহিলার জমির মালিকানা ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র আমলের চেয়ে কিছু বেশি হয়ে যায়নি কারণ পিতৃতান্ত্রিকতার প্রশ্নে দুই কালেই পার্থক্য খুব সামান্যই। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে , নিজের জানাকে নিজেই আনলার্ন করে জানার যে চর্চা তার বীজভূমি তৈরি করতে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের অবদান অনস্বীকার্য ।

লিখেছেন
Amrita Sarkar
Amrita Sarkar
2 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।