হিন্দুত্ব আর গরিববন্ধু ইমেজ - উত্তরপ্রদেশ জয়ে যে দুই মন্ত্র সহায় হলো যোগীর

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
হিন্দুত্ব আর গরিববন্ধু ইমেজ - উত্তরপ্রদেশ জয়ে যে দুই মন্ত্র সহায় হলো যোগীর

শেষ ১৯৮৫ সালে উত্তরপ্রদেশে পরপর দুইবার বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী পদ প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন নারায়ণ দত্ত। কিন্তু পরপর দুবার নির্বাচিত হলে ও পাঁচ বছরের মুখ্যমন্ত্রীত্বের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি কংগ্রেস নেতা নারায়ণ দত্ত তিওয়ারী। উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে যোগী আদিত্যনাথই প্রথম যিনি পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করে আবার আগামী পাঁচ বছরের জন্য লখনউর তখতে বসলেন।

কিন্তু ঠিক কী মন্ত্রে উত্তরপ্রদেশে এত বিতর্কের তাপ ঠাণ্ডা করে সফল হল বিজেপি? শেষ কয়েক বছরে যোগী রাজত্বে উত্তরপ্রদেশের কর্মকাণ্ড গোটা ভারতে বেঞ্চমার্ক হয়ে উঠেছিল। লখিমপুর থেকে হাথরস একের পর এক ধর্ষণে যোগী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বে ও উত্তরপ্রদেশের মানুষের ভরসা অর্জন করতে কোনও সমস্যাই হয়নি যোগীর। এমনকি গোটা দেশ যখন এন আর সি, সি এ এ আন্দোলন নিয়ে উত্তাল তখন ও আদিত্যনাথের পুলিশ প্রশাসনের তীব্র দমন নীতির শিকার হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। স্বয়ং যোগী আদিত্যনাথ ও উত্তরপ্রদেশের ভোটের আগে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির ট্রাম্প কার্ড টি খেলে বিপক্ষকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে হিন্দু মুসলিম দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়েরই ভোট- ব্যাঙ্কের ওপর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সেই পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে ও যোগী স্পষ্ট হিন্দু-মুসলিম বিভেদরেখা টানতে পিছপা হননি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই ভোটের আগে আশি- কুড়ির ফর্মুলা বাতলে ছিলেন ‘যোগীজি’। নানা সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্তদের উদ্দেশ্যে তির্যক মন্তব্যও শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে।

সেসবের পরেও অন্য সব রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা উড়িয়ে দিয়ে বিজেপি উত্তরপ্রদেশ ভোটে পেয়েছে ২৬১ আসন। এমনকী ২০১৭ সালের থেকে ও ভোটের শতাংশ বেড়েছে বিজেপির। এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যোগীর আমলেই উত্তরপ্রদেশে আইন শৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে অনেক। আগের উত্তরপ্রদেশের আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ক্রাইম দুনিয়া থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে উত্তরপ্রদেশ। যার ফলে মহিলা ভোটারদের একটা অংশ প্রশ্নাতীত ভাবেই বিজেপির খাতায় গিয়েছে।

আবার যোগী মুখ্যমন্ত্রী হয়েই প্রশাসনকে কাজের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। আমলাদের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যাতে কোনও রাজনৈতিক বাধা বা অসুবিধার সম্মুখীন না হতে হয় সে ব্যাপারে নিজের রাজ্যে প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিলেন যোগী। উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যাতে আমলাদের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয় সে ব্যাপারে ও সতর্ক থেকেছেন তিনি। উত্তরপ্রদেশ ভোটের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট হল অয্যোধ্যায় রামমন্দিরের বাস্তব রূপায়নের ক্ষেত্রে বিজেপির একনিষ্ঠ উদ্যোগ। ২০২০ সালে রাম মন্দির রায় বেরনোর পর করোনা পরিস্থিতিতে ও যেভাবে মোদী-যোগী রামমন্দিরের রাজকীয় শিলান্যাস করেছেন তাতে নিঃসন্দেহে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর মন জয় করতে যোগী আদিত্যনাথ বা বিজেপির কোনও সমস্যাই হয়নি।

আবার যোগী সফলভাবেই উত্তরপ্রদেশে উন্নয়নের বুলডোজার চালিয়েছেন। অযোধ্যাকে আন্তর্জাতিক মানের তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে তুলতে কোনো বাধাই মানেননি তিনি। রাস্তা চওড়া করতে ভক্তকুলের দোকান সরিয়ে দিয়েছেন। করোনার সময়ে উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে , অক্সিজেনের অভাবে রোগীর নাভি শ্বাস উঠেছে। সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে লাশের পর লাশ কাপড়ে মুড়ে গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। করোনায় গণচিতা জ্বলার দৃশ্য় দেশে একমাত্র উত্তরপ্রদেশেই দেখা গিয়েছে। হাথরসে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে।

আবার করোনার সময়েই প্রতিটি পরিবারকে বিনাপয়সার আনাজ, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল দিয়েছে যোগীর সরকার। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল ভোট মিটে গেলেই বিনামুল্যের রেশন পরিষেবা বন্ধ করে দেবে সরকার। কিন্তু বাস্তবে উত্তরপ্রদেশে এখন ও ফ্রি রেশন চালু রয়েছে যা নিঃসন্দেহে উত্তরপ্রদেশের মত একটি রাজ্যের আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির ভোটকে বিজেপির দিকে নিয়ে গিয়েছে। তবে এসব পেরিয়ে আসলে জিতেছে কড়াপাকের হিন্দুত্ব। বাবরির পরিবর্ত হিসেবে রামমন্দির পাওয়াকে যোগীর সাফল্য, হিন্দুত্বের জয় হিসেবে দেখেছে একটা বড় অংশ। পাশাপাশি সকলের জন্য পাকাবাড়ি, সব বাড়িতে পাকা শৌচালয় তৈরির উদ্যোগ যোগীকে দিয়েছে ডিভিডেন্ট। আর সেই কারণেই অখিলেশকে তারা বিকল্প হিসেবে ভাবেননি। বিজয়ীর বরমাল্য গিয়েছে আদিত্যনাথের গলায়। সব হিসেব উল্টে দিয়েছেন যোগী। এই জয় সামান্য নয় কারণ আগেও বলেছি, এই প্রথম জন্য উত্তরপ্রদেশে কোনো মুখ্যমন্ত্রী পরপর দুবার ক্ষমতায় এলেন, শুধু তাই নয়, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ভোট শতাংশও বাড়ল ২০১৭ সালের তুলনায়।

সর্বোপরি ভোট ভাগাভাগির যে অঙ্ক উত্তরপ্রদেশে হয়েছে তার থেকে ও বিপুল ফায়দা তুলেছে বিজেপি। দলিত নেত্রী মায়াবতীর বিজেপিকে নীরব সমর্থন, বিজেপির বিরুদ্ধে সব জায়গায় প্রার্থী না দেওয়া বিজেপিকে উত্তরপ্রদেশ ভোটে বাড়তি অক্সিজেন দিয়েছে। আবার এইবারের ভোটে দেখা গিয়েছে শুধুমাত্র উচ্চবর্ণীয় হিন্দু নয় দলিত বা অন্যান্য হিন্দুদের ভোট ও বিজেপির খাতায় গিয়েছে। আদিত্যনাথের স্পষ্ট মেরুকরণের নীতি থাকলে ও কার্যক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশের মুসলিম জনসংখ্যা ও বিজেপির ওপরেই ভরসা রেখেছে।

করোনা পরিস্থিতিতে বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতির দায় ও সরাসরি আদিত্যনাথের সরকারের উপর বর্তায়নি। তাই এই বিপুল জনাদেশ নিয়ে উত্তরপ্রদেশের মসনদ দখলকে যোগী বলেছেন এই জয় উন্নয়ন সুশাসন রাষ্ট্রবাদ, বিকাশ এবং সুরক্ষার জয়। নিন্দুকের কুৎসায় বুলডোজার চালিয়ে তাই উত্তরপ্রদেশ যোগীরই।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?