দেশের নব্বই শতাংশের রোজগার এতটা নিচে! সরকারি নথিতে স্পষ্ট ভারতের অর্থনীতির চেহারা

ভারতে যে সমস্ত মানুষ আয় করতে পারেন, তাঁদেরকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে এই রিপোর্টে- সাধারণ আয় করা ব্যক্তি, স্বনির্ভর এবং ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার।

উপার্জনের বন্টন এবং সাধারণ ভারতীয়র আয় নিয়ে আবারও একটি বিশাল বৈষম্যের চিত্র উঠে এল একটি নতুন সমীক্ষায়। ভারতের সম্পদের অসাম্য বিষয়ক একটি সরকারি রিপোর্টে জানা গিয়েছে আপনি যদি প্রতি মাসে মাত্র ২৫,০০০ টাকা রোজগার করেন তাহলে আপনি দেশের সর্বোচ্চ উপার্জনকারীদের প্রথম ১০ শতাংশের মধ্যে আছেন। ভারতের আর্থিক বৈষম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে তুলে ধরা এই রিপোর্টটি তৈরি করেছে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ। গত ১৮ মে এই উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেক দেবরায় এই রিপোর্টটি তুলে দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে। এই রিপোর্টে দেশের সম্পদের অসাম্যের একটি অত্যন্ত অন্ধকারময় চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ভারতে যদি এই মুহূর্তে আর্থিক বৈষম্য নিয়ে কোনওরকম পদক্ষেপ না গ্রহণ করা হয়, তাহলে ভারতের অবস্থা আরও সঙ্গিন হয়ে উঠবে আগামী ভবিষ্যতে। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, উপার্জনের সমতা আনা এবং দারিদ্র দূরীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজন ভারতে।

 

ওই একই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, প্রয়োজনীয় পণ্য এবং পর্যাপ্ত জল সরবরাহ ও শৌচাগারের সুবিধা দিয়ে সামগ্রিকভাবে পারিবারিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে ভারতে। তবে এই বিষয়টি ভারতের মানুষের আর্থিক পরিকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত যদিও নয়। ২০১৭-'১৮ অর্থবর্ষ থেকে ২০১৯-'২০ অর্থবর্ষের মধ্যে করা এই সমীক্ষায় দেশের সম্পদের অসম বন্টনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই সমীক্ষায় যে শুধুমাত্র সম্পদের অনুমান করা হয়েছে, তা কিন্তু নয়, বরং মূলধনের প্রবাহকে বোঝার জন্য এই প্রথমবার রিপোর্টে আয় বন্টনের অসমতার ওপর সরাসরি জোর দেওয়া হয়েছে।

 

এই রিপোর্টে উল্লেখ, মাসিক যাঁরা ২৫,০০০ টাকা কিংবা তার আশেপাশে রোজগার করে থাকেন, তাঁরা দেশের সর্বোচ্চ উপার্জনকারীদের প্রথম ১০ শতাংশের মধ্যে আছেন। অর্থাৎ, বাকি ৯০ শতাংশ মানুষের মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকার নিচে। আর এর থেকেও বিস্ময়কর তথ্যটি হল, দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ উপার্জনকারীর মোট আয়, জাতীয় আয়ের ৬ থেকে ৭ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর মোট আয়, জাতীয় আয়ের এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ বলতে গেলে, ভারতের ৯০ শতাংশ মানুষকে জাতীয় আয় এর মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

 

আরও পড়ুন: ‌দেশদ্রোহ গেলেও থাকছে ইউএপিএ, আসলে কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকা হচ্ছে? 

 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কমিটির তৈরি করা এই রিপোর্টে ভারত সরকারের জন্য বেশ কিছু উপদেশমূলক পদক্ষেপের ব্যাপারেও জানানো হয়েছে। এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, যেরকম ভাবে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম বা মনরেগা স্কিম ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে কাজ করে, সেরকমভাবেই ভারতের শহরের বাসিন্দাদের জন্য কোনও একটি স্কিম চালু করা উচিত ভারত সরকারের। ভারত সরকারকে বুঝতে হবে, গরিব মানুষ কিন্তু শুধুমাত্র গ্রামে থাকেন না, কিছু গরিব মানুষ এমন রয়েছেন, যাঁরা শহর কিংবা শহরতলি এলাকার বাসিন্দা, তাই তাঁরা মনরেগার মতো স্কিম ব্যবহার করতে অপারগ। তাই তাঁদের জন্য আলাদা করে কিছু ভাবা উচিত ভারত সরকারের।

 

এছাড়াও ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কমিটির তরফ থেকে বিশেষ কিছু আর্জি রাখা হয়েছে এই রিপোর্টের মাধ্যমে। ভারত সরকারের কাছে এই কমিটির আর্জি, যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতে ন‍্যূনতম একটি আয়ের মাত্রা এবং একটি বেসিক ইনকাম লেভেল তৈরি করা হয়। পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে থেকে করা একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী ১০ শতাংশ মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ শতাংশের আয় বাকি ৯ শতাংশের প্রায় ৩ গুণের সমান। এরকম আয়ের বন্টন যদি ভবিষ্যতে আরও চলে, তাহলে ভারতে আয় নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিতেই পারে।

Income inequality

তবে, এই পিএলএফ সার্ভে থেকে আরো কিছু জিনিস পরিষ্কার, ২০১৯-'২০ অর্থবর্ষে ভারতের মানুষের সর্বমোট আয় ছিল মোটামুটি ১,৮৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ের ১ শতাংশ মানুষের সর্বমোট আয় ছিল মোটামুটি ১২৭ কোটি টাকা। এরপরের ১০ শতাংশ মানুষের আয় ছিল সর্বমোট ৩২.১০ কোটি টাকা। শুধুমাত্র এই অর্থবর্ষে নয় ২০১৭-'১৮ অর্থবর্ষেও কিন্তু এই আয়ের তফাৎটা ৩:১-ই ছিল।

 

আরও একটি বিষয় এই পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসছে, যা দেখিয়ে দিচ্ছে, সারা ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ উপার্জনকারী ভারতের সমগ্র আয়ের প্রায় ৬-৭ শতাংশ পরিমাণ আয় করে থাকে সারা বছরে। ২০১৮-'১৯ অর্থবছরে এই শতাংশের হার ২০১৭-'১৮ অর্থবর্ষের ৬.১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছিল ৬.৮৪ শতাংশ। ২০১৯-'২০ অর্থবর্ষে এই আয়ের শতাংশ কিছুটা কমলেও এখনো ৬.৮২ শতাংশ কিন্তু রয়েছে। অন্যদিকে, সমস্ত ভারতীয়র সর্বমোট আয়ের পরিমাণের ৩০ শতাংশ কিন্তু যাচ্ছে শীর্ষ ১০ শতাংশের পকেটেই।

 

লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট

বস্তুত লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট বলতে কোনও দেশের যে বয়সের মানুষ যত সংখ্যক কোনও একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন অথবা কোনও নির্দিষ্ট কাজ খোঁজেন, তাঁদের একটি অনুপাতকে বোঝায়। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই জড়িত থাকে ওই বিশেষ কাজের ন‍্যূনতম বয়স। এই রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট বিগত ২০১৭-'১৮ অর্থবর্ষে ৪৮.৮ শতাংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবং ২০১৯-'২০ অর্থবর্ষে এই অনুপাত মোটামুটি ৫১.৮ শতাংশ। তবে এক্ষেত্রে দুঃখের বিষয় হলো, এখানে কাজ করা মানুষের থেকে কাজের সন্ধানে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। এছাড়াও যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে এমন রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের কাজ নিয়ে এবং সেই কাজের থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিয়ে খুশি নন।

 

ভারতের মানুষের গড় আয় কত?

ভারতে যে সমস্ত মানুষ আয় করতে পারেন, তাঁদেরকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে এই রিপোর্টে- সাধারণ আয় করা ব্যক্তি, স্বনির্ভর এবং ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার।

 

২০১৯ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের রিপোর্ট দেখলে বোঝা যাবে গ্রাম্য এলাকায় সাধারণ আয় করা একজন পুরুষের মাসিক আয় ১৩,৯১২ টাকা এবং শহরাঞ্চলে একজন সাধারণ আয় করা পুরুষের মাসিক আয় ১৯,১৯৪ টাকা। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে সাধারণ আয় করা একজন মহিলার মাসিক আয় ১২,০৯০ টাকা এবং শহরাঞ্চলে একজন সাধারণ আয় করা মহিলার মাসিক আয় ১৫,০৩১ টাকা।

 

স্বনির্ভর ক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকায় একজন পুরুষের মাসিক আয় ৯,৬৬১ টাকা এবং সেখানেই একজন মহিলার আয় প্রতি মাসে ৪,৫৫৮ টাকা। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এই একই সময়ে একজন স্বনির্ভর পুরুষের আয় প্রতি মাসে যেখানে ১৭,১৬৬ টাকা, সেখানেই একজন মহিলার মাসিক আয় ৭,১৪১ টাকা। বর্তমানে ভারতের স্বনির্ভর মানুষের আয়ের পরিমাণ কিন্তু খুব একটা বেশি নয়। তাই স্বনির্ভরতা এখনও পর্যন্ত ভারতের ক্ষেত্রে খুব একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি।

 

গ্রাম এবং শহরের আয়ের তফাৎ
ন্যাশনাল ফ্যামিলি অ্যান্ড হেলথ সার্ভে এনএফএইচএস-র রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ২০১৫-'১৬ অর্থবর্ষ থেকেই গ্রামাঞ্চল এবং শহরাঞ্চলের মধ্যে আয়ের একটা বিশাল তফাৎ শুরু হয়ে গিয়েছিল। এখনও পর্যন্ত গ্রামে যাঁরা কাজ করেন, কিংবা গ্রামে যাঁরা ব্যবসা করতে চান, তাঁদের আয়ের পরিমাণ শহরাঞ্চলের মানুষের থেকে অনেকটাই কম। ভারতের সবথেকে বেশি রোজগার করা মানুষের মধ্যে প্রায় ৪৪.৪ শতাংশ মানুষ আসেন শহরাঞ্চল থেকেই। অন্যদিকে মাত্র ৭.১ শতাংশ মানুষ রয়েছেন যাঁরা গ্রামাঞ্চলে থেকেও ভালো টাকা আয় করতে পারেন। অন্যদিকে, আয় বৈষম্যের দিক থেকেও গ্রাম এবং শহরের মধ্যে এখনও তফাৎ রয়েছে। আয়ের দিক থেকে ভারতের নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে ২৮.৪ শতাংশ মানুষ এমন রয়েছেন, যাঁরা গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আসেন, আর এই আয়ের নিম্নসীমায় থাকা মানুষের মাত্র ৩.১ শতাংশ আসেন শহরাঞ্চল থেকে।

 

তবে শুধুই যে শহর এবং গ্রামের মধ্যে তফাৎ আছে, তা কিন্তু নয়। কিছু এমন শহর এবং রাজ্য রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের আয় অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে আবার ভারতে এমন কিছু রাজ্য রয়েছে, যেখানে কিন্তু মানুষের আয় অনেকটাই কম। চণ্ডীগড়, দিল্লি, পাঞ্জাব এবং গোয়ার মতো রাজ্যে এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ মোটামুটি ভালো টাকা রোজগার করতে পারেন প্রতি মাসে। অন্যদিকে বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে এই সংখ্যাটা খুবই কম। সেখানেও অধিকাংশ মানুষ আয়ের অনুপাতের একেবারে নিম্নসীমায় বিরাজমান।

More Articles