তিব্বতে নয়, এ দেশেও রয়েছে অন্য মানস! গেলেই আয়ু দ্বিগুণ?

Manas National Park: এই পুজোটা যদি একটু অন্যরকম ভাবে কাটাতে চান, তাহলে আপনার পছন্দের ঠিকানা কিন্তু হতেই পারে অসমের এই জঙ্গল। বর্ষার পর পর সবুজে সেজে ওঠা জঙ্গল আর পশুপাখির মেলা দেখতে দেখতে মনেও পড়বে না শহরের ক্যাকাফোনির কথা।

Sohini Das
৩ মিনিট
তিব্বতে নয়, এ দেশেও রয়েছে অন্য মানস! গেলেই আয়ু দ্বিগুণ?

কেউ ভালোবাসেন পুজোয় শোরগোল, রোল-ফুচকা-চুরমুরকে সঙ্গী করে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে টহল। আবার কেউ ভালোবাসেন, লোকারণ্য থেকে দূরে নির্জন অবসর। কেউ কলকাতার পুজো ছেড়ে যেতে চোখে জল, কারও আবার পুজোর শহরে প্রাণ হাঁসফাঁস। আর এর মধ্যে আপনি যদি পড়েন দ্বিতীয় দলে, তাহলে তো পুজো মানেই আপনার পায়ের তলায় সর্ষে। পাহাড়, সমুদ্রের হাতছানি তো অনেক হল। কেমন হবে এই পুজোটা যদি আপনার কাটে গহন অরণ্যে।

হাতের কাছে জঙ্গল মানেই ডুয়ার্স, বড়জোর কাজিরাঙা, যারা ভাবেন তাঁদের বলে বলে দশ গোল দেবে এই জঙ্গল। কাজিরাঙার একেবারে পাশেই কিন্তু কাজিরাঙার থেকে রঙে-রূপে একেবারে আলাদা এই জঙ্গল। মানস বলতেই বেশিরভাগ মানুষ বোঝেন সরোবরের কথা। কিন্তু এর বাইরেও আরও এক মানস রয়েছে। অসমের বরপেটার এক আশ্চর্য জঙ্গল মানস।

বেশিরভাগ জঙ্গলই জন্তুজানোয়ারের দিক থেকে পর্যটকদের হতাশ করে। দু-একটা হরিণ দেখেই মন ভরাতে হয়। মানস তেমন নয়। জঙ্গলের সদর দরজার ধারপাশটা চা-বাগানে ঘেরা। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি টুরিস্ট লজ। সেখানেও দিব্যি গুছিয়ে বসতে পারেন। সকাল বেলা ঘুম ভাঙাবে ময়ূরের তীব্র ডাক, পাখির কলকাকুলি। সেই সব কিছু সঙ্গী করে সারাদিনের খাবারদাবারের সরঞ্জাম জোগার করে বেরিয়ে পড়া জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। আপাতত সারাদিনের ঠিকানা আপনার ওটাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শহরের ক্যাকাফোনি থেকে দিন তিনেকের মুক্তি, পুজো কাটান এবার 'ঘুটঘুটানন্দজি'-র ডেরায়

Weekend Trip to Kankrajhore: একটা সময় এই কাঁকড়াঝোরেই শুটিং হয়েছিল জনপ্রিয় সিনেমা চারমূর্তির। এই সব জঙ্গলেই অভিযান চালিয়েছিলেন টেনিদা, ক্যাবলা, প্য়ালা আর হাবুল। কাঁকড়া শব্দের অর্থ পাহাড় আর ঝোড় মানে জঙ্গল। তার থেকেই নাম কাঁকড়াঝোড়।

জঙ্গলে ঢুকতে না ঢুকতে চোখে পড়বে বনমুরগির ঝাঁক। এদিক ওদিক থেকে আপনাকে স্বাগত জানাবে চিতল হরিণের ঝাঁক। গাছের ডালে বসে একটানা ডেকে চলেছে ময়ূরটা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা দিয়ে ছুটছে জিপ। ভোরের সূর্য অভ্যর্থনা জানাচ্ছে আপনাকে। একটু দূরে উঁচু গাছের ডালে উদাস চোখে বসে রয়েছে নীলকণ্ঠ পাখির ঝাঁক। কোথাও জঙ্গল ঘন, তো কোথাও ঘাসের বন।

আরেকটু এগোলেই উঁকি দিয়ে যাবে কেপলাঙ্গুরের ঝাঁক। কোথাও মার্চপাস্ট করছে বাইসনের পাল। এসব দেখতেই দেখতেই জঙ্গলের ভিতরে কোনও একটি বনদফতরের ওয়াচটাওয়ারে সেরে নেওয়া দুপুরের খাওয়াদাওয়া। জঙ্গলের ভিতরের জোনে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে নিতে হবে একজন সশস্ত্র রক্ষী। জঙ্গলের ভিতরে ভিতরে ছোট ছোট নদী। আশপাশে নানাবিধ ফুলের ঝোপ, নানাবিধ গাছ, জঙ্গুলে গন্ধে ম ম করে ওঠে গোটা বন।

আপনার যদি পাখি দেখার নেশা থাকে, তাহলে এ জঙ্গল আপনার জন্য আদর্শ। ইতিউতি চোখ মেললেই দেখা মিলবে স্কারলেট মিনিভেট, ব্ল্যাক রেডস্টার্ট, ইয়োলো আয়েড ব্যবলারের ছড়াছড়ি। দেখা মিলবে ব্লু থ্রোটেড বারবেট, এশিয়ান ফেয়ারি ব্লুবার্ড-সহ অজস্র পাখির। তবে এই জঙ্গলের মূল আকর্ষণ বেঙ্গল ফ্লোরিকান, যা মানস ছাড়া ভারতবর্ষের খুব কম জঙ্গলেই দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া সিলভার ব্রেস্টেড ব্রডবিলের জন্যও এ জঙ্গল বিশেষ বিখ্যাত। মাথার উপর হঠাৎ করেই হেলিকপ্টারের মতো শব্দ শুনে চমকে উঠে দেখবেন ইয়াব্বড় ঠোঁটওলা ধনেশ পাখি লুফে খাচ্ছে ফল। এছাড়া নানাবিধ ছোটবড় পাখি তো রয়েইছে। গাছের কোটরে তক্ষকের ঝাঁকও কিছু কম অবাক করা নয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেদার জঙ্গল সাফাই! দুশ্চিন্তা কানহা, বান্ধবগড়ের মতো জঙ্গলের অস্তিত্ব নিয়েও

Forest Land Diversion: গত ১৫ বছরের মধ্যে ২০০৯-১০ সালে জঙ্গলসাফাইয়ের হার সবচেয়ে বেশি। মোট অঙ্কের প্রায় ৭৬,৭৪৩ হেক্টর জমিই সাফ করে দেওয়া হয়েছে এই এক বছরেই।

তবে মানসের জঙ্গলের মূল আকর্ষণ হাতি। হলফ করে বলা যেতে পারে, মানসে যে পরিমাণ হাতির দেখা আপনি পাবেন, তা অন্য কোনও জঙ্গলে পাওয়া দুষ্কর। একসঙ্গে একশো দুশো হাতির পাল রাস্তা পেরোলে কেমন লাগে, তা জানতে চাইলে একবার ঢুঁ মারতেই হবে এই জঙ্গলে। তাছাড়া মিলবে গন্ডারেরও দেখা। কপাল ভালো থাকলে মুলাকাত হয়ে যেতে পারে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ও চিতাবাঘের সঙ্গে।

জঙ্গলের বাইরে থাকার ব্যবস্থা তো রয়েইছে। তবে একটু অন্য রকম অ্যাডভেঞ্চারের শখ থাকলে রাত্রিবাস করতে পারেন মাথানগুড়ির ফরেস্ট বাংলোতেও। পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে মানসনদী। রাতে সে নদীতে জল খেতে আসে বন্যপ্রাণীরা। আর পূর্নিমা রাত হলে তো কথাই নেই। সে-ও এক দেখার মতো দৃশ্য। যা উপভোগ করতে পারবেন বাংলোর বারান্দায় বসেই।

জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগোতে এগোতে পৌঁছে যাবেন ভুটানের একদম কাছে। মধ্যিখানে নদী বেঁধে রেখেছে অস্পষ্ট বিভাজন রেখা। সেটুকু বাদ দিলে এ জঙ্গল, এ নদী, এ পাহাড়, সবটাই তো এক। কোথাও কোনও তফাৎ নেই। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে হালকা ঠান্ডা এসে ছুঁয়ে দেবে শরীর। সারাদিনের রোদে তপ্ত শরীর শিরশির করে উঠবে সেই হাওয়ায়। মানসের জঙ্গলে রয়েছে হাতি সাফারির ব্যবস্থা। খুব বেশি পথ নয়, তবে সেই অভিজ্ঞতা যে অনোন্য, তা সওয়ারি মাত্রেই কেবল জানেন।

কলকাতা থেকে মানসে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজতম রাস্তা রেলপথ। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে উঠে সোজা বরপেটা রোড স্টেশনে নামা। তারপর জঙ্গলের কাছাকাছি হোটেলে পৌঁছতে রয়েছে জিপ বা গাড়ির ব্যবস্থা। যেতে পারেন বিমানপথেও। গুয়াহাটি বিমানবন্দরে নেমে ট্রেন ধরেও পৌঁছতে পারেন বরপেটা স্টেশনে। থাকার জন্য রয়েছে অসংখ্য হোটেল, হোমস্টে। কপাল ভালো থাকলে পেয়ে যেতে পারেন ফরেস্ট বাংলোর বুকিংও।

এই পুজোটা যদি একটু অন্যরকম ভাবে কাটাতে চান, তাহলে আপনার পছন্দের ঠিকানা কিন্তু হতেই পারে অসমের এই জঙ্গল। বর্ষার পর পর সবুজে সেজে ওঠা জঙ্গল আর পশুপাখির মেলা দেখতে দেখতে শহরের ক্যাকাফোনির কথা মনেও পড়বে না, তার গ্যারান্টি জঙ্গলের। তবে জঙ্গলের পথে অচেনা পশুপাখির খোঁজ পেতে একজন গাইড নিতে ভুলবেন না যেন। ভুলবেন না কয়েকটা দিন বুকের হাপরে ভালো করে টাটকা অক্সিজেন ভরে নিতে।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।