আনিস হত্যায় নাগরিক নীরবতা চাইছে অস্বস্তিতে পড়া শাসক?

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
আনিস হত্যায় নাগরিক নীরবতা চাইছে অস্বস্তিতে পড়া শাসক?

সাল ২০১৯। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিয়ে এল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। প্রথমে আসামে বলবৎ হলেও ৯ ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে ঘোষণা করেন গোটা দেশে চালু হবে এন আর সি- সি এ এ। মুহূর্তের মধ্যে এর আঁচ ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকারের নীতি স্পষ্ট হতে শুরু করে। দেশের সংখ্যালঘু খুব বিশেষ ভাবে বললে মুসলিম তাড়ানোর জন্যই এই নীতির প্রণয়ন। যে রাজ্যগুলি দেশভাগের যন্ত্রণা দেখেছে তাদের কাছে এই নীতি আরও প্রতিবাদের কারণ হয়ে উঠল। বাদ গেল না পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের দিকে দিকে কলেজ ইউনিভার্সিটি রাজপথ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এনআরসি, সিএএ বিরোধী মিছিল। দিল্লির শাহিনবাগের পর খোদ কলকাতার বুকে পার্ক সার্কাসে শুরু হল মহিলাদের অবস্থান। এই আন্দোলনেই যোগ দিতে এলেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আনিস খান।

যদিও আনিসের রাজনীতিতে হাতেখড়ি বাগনান কলেজে। আমতার বাসিন্দা আনিস তখন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার সক্রিয় কর্মী। তারপরে সময় যত গড়িয়েছে আনিসের রাজনৈতিক পরিচিতি বেড়েছে। ২০১৫ সালে আনিস আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরেই ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এম টেকের স্টুডেন্টদের সাসপেন্ড করে। আন্দোলন শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। আনিস সেদিন সেই আন্দোলনের দায়ভার তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সেদিন ছাত্রদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। রাজনীতির শুরু এসএফআই-এর হাত ধরে হলে ও পরবর্তীকালে আব্বাস সিদ্দিকি যখন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট তৈরি করলেন আনিস ধীরে ধীরে আই এস এফের আদর্শে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। তার একটা বড় কারণ হয়তো আনিসের সংখ্যালঘু পরিচয়ের সঙ্গে আব্বাসের দলের মতাদর্শগত মিল।

শুধু তাই নয় আনিস হাওড়ায় নিজের এলাকাতে ও তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন। সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন আনিস। খুব স্বাভাবিকভাবেই যে হাওড়া শাসকদলের শক্ত ঘাঁটি সেখানে এমন বাম মনোভাবাপন্ন ছাত্রনেতার ‘রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি’ শাসকদলের অস্বস্তির কারণ। সে কথা বুঝেছিলেন আনিস নিজেও। নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য যে শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের আক্রমণের মুখে পরতে হবে সে কথা অনুমান করে পুলিশের হস্তক্ষেপও চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই পুলিশের উর্দিধারীদের হাতেই খুন হলেন আনিস। সমাপতন বললেও কম বলা হয়। পুলিশের ভূমিকা ঠিক না ভুল তা বিচার করবে প্রশাসন। কিন্তু এই ‘রাজনৈতিক হত্যা’ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল।

আনিস খানের মৃত্যুর পরের দু'দিন কার্যত নীরব ছিলেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। এই দু'দিনে কলকাতা দেখেছে কীভাবে আনিসের মৃত্যুর বিচার চেয়ে পথে নেমেছে গোটা নাগরিক সমাজ। অবশেষে নীরবতা ভেঙে মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। শাসকদলের অস্বস্তি কাটাতে মমতা আনিসের উপর আরোপ করেছেন নিজেদের দলের রাজনৈতিক পরিচয়। দাবি করেছেন ভোটের সময় আনিস সরাসরি তৃণমূলকে সাহায্য করেছেন নির্বাচনে। এই তথ্য ভুল না ঠিক তা যাচাই করবে কে! তার থেকেও বড় কথা নেত্রী এ কথা কেন বললেন! সংখ্যালঘু আনিসকে নিজেদের লোক প্রমাণ করতে না পারলে তৃণমূলের এতদিনের অর্জন করা মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে তা সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, সেই কারণেই কি?

অতীতে রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গ দেখেছে কীভাবে তৎকালীন শাসকদল সিপিএমের নাম জড়িয়ে গিয়েছিল ওই ঘটনায়। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হয়েছিল স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। নিজের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে মমতা জানেন এই ঘটনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে যায় এই ঘটনা তার গদি টলমল করে দিতে পারে। সেই কারণেই শাসকদলের ভিতর থেকেই একের পর এক নেতা প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই ‘রাজনৈতিক খুন’-কে লঘু করার।

রাজ্যের মন্ত্রী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক ফিরহাদ হাকিম ঘটনার নিন্দা করে আক্ষেপ করেছেন, এমন ঘটনা উত্তরপ্রদেশে ঘটলেও বঙ্গে তা অমিল। কিন্তু সেই মন্ত্রীই আবার পরমুহূর্তে বলেছেন যা ঘটেছে তা নিন্দনীয় হলেও বিক্ষোভ করে কোনও লাভ নেই। বিক্ষোভ বিরোধিতার গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকারটি তো সাংবিধানিক। সেখান থেকে বিরত হতে বলা কি ঠাণ্ডা গলার হুকুম! বিরোধিতা সইতে কেন পারছে না তৃতীয় ইনিংস শুরু করা একটি সরকার? কেন স্রেফ ববি হাকিমকেই এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিবৃতি দিতে? ছাত্রের মৃত্যুতে শিক্ষামন্ত্রীর কোনো বার্তা নেই কেন! ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।