পাকিস্তানের মানববোমা আসলে কোন রহস্যময়ী নারী! ভয়ে কাঁপবে চিনও

rudranjan
৩ মিনিট
পাকিস্তানের মানববোমা আসলে কোন রহস্যময়ী নারী! ভয়ে কাঁপবে চিনও

২৬ এপ্রিল ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। সূত্র মারফৎ জানা যাচ্ছে, বিস্ফোরণের ফলে মৃত্যু হয়েছে অন্তত পাঁচ জনের, আহতের সংখ্যা দুই। সংসদের ভোটাভুটিতে ইমরান খানের পরাজয়কে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুটা উত্তপ্ত ছিল, তার ওপর এই ঘটনা পরিস্থিতিকে যেন আরও বেসামাল করে তুলেছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনার দায় স্বীকার করে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। তারা জানিয়েছে, শারি বেলুচ নামে ৩০ বছর বয়সি এক মহিলা ‘স্যুইসাইড বম্বার’ হিসেবে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। কিন্তু তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসায় কিছুটা আশ্চর্যই হচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তার কারণ, অতীতে কোনওরকম জঙ্গি কার্যকলাপে জড়িত থাকার ইতিহাস নেই শারি-র।

পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মেয়ে শারি। জুলজিতে স্নাতকোত্তর এবং এমফিল শেষ করে সে শিক্ষক হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করে। সাংবাদিক বশির আহমেদ গখ জানাচ্ছেন, বছরদুয়েক আগে বিএলএ-র কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শারির। সেই থেকেই তার জঙ্গিদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি হয় বলে মনে করছেন তিনি। সাম্প্রতিক ঘটনার পর শারি-র স্বামী হবিতন বশির বেলুচ নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, "শারি জান, তোমার আত্মবলিদান আমাকে গর্বিত করেছে। মেহরুচ এবং মীর হাসান বড় হয়ে জানতে পারবে তাদের মা কত বড় মাপের মানুষ ছিল। তুমি আমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে থেকে যাবে।" শারি-র কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলছেন বহু মানুষ। ইতিপূর্বে যে কোনওরকম জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, সে আজ হঠাৎ করে এমন ঘটনা ঘটাল কেন? তবে কি পাকিস্তানের প্রশাসনের বিরুদ্ধে বেলুচদের অসন্তোষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে?

বেলুচদের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রশাসনের সংঘাতের ঘটনা নতুন নয়। বহু যুগ ধরে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ঘটে চলেছে এমন ঘটনা। বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাবি, পাকিস্তান গড়ে ওঠার পর থেকেই নানানভাবে তারা বঞ্চিত হয়ে এসেছে। তাদের অভিযোগ, সমগ্র পাকিস্তানের তুলনায় বেলুচিস্তান অঞ্চলে উন্নয়নের হার অনেকটাই কম। সেই কারণেই তারা সেই অঞ্চলের তেল, কয়লা, সালফার, ফ্লোরাইড এবং সোনার ওপর সম্পূর্ণ মালিকানা বজায় রাখার দাবি জানিয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানের প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি।

২০০০ সালে গড়ে ওঠে ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’। পাকিস্তানের বহু সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্তা এবং পড়ুয়াদের তারা হত্যা করে। এর প্রায় এক দশক পর বিএলএ ছাড়াও বেলুচিস্তানে গড়ে ওঠে ‘লস্কর-এ-বেলুচিস্তান’ এবং ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ নামে আরও দুটো সংগঠন। অচিরেই তাদের ‘জঙ্গি’ তকমা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউনাইটেড কিংডম এবং পাকিস্তানের প্রশাসন। ২০১৬ সালে বিএলএ জঙ্গিদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনার ব্যাপক সংঘাত ঘটে। ঘটনার জেরে মৃত্যু হয় অন্তত ৬০০ জঙ্গির, ১০২৫ জন সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

২০১২ সালের এক সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, পাকিস্তানের অন্তত ৩৭ % বেলুচ ‘মুক্ত বেলুচিস্তান'-এর দাবিকে সমর্থন করেন। তাঁরা নিজেদের পাকিস্তানে ব্রাত্য বলে মনে করেন। তাঁদের বিশ্বাস, পাকিস্তান থেকে আলাদা না হওয়া পর্যন্ত বেলুচিস্তানের কোনওরকম উন্নতি সম্ভব নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রধান কূটনৈতিক সঙ্গী চিনের প্রতিও বেলুচদের একাংশ ইতিপূর্বে অনাস্থা জানিয়েছেন। ২০২১ সালে বিএলএ জঙ্গিরা হুয়াই, নেটকম, এক্সেলেরন এবং জেডটিই-র মতো কিছু চিনা তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মীদের অপহরণ করে। তাদের অভিযোগ ছিল, এই সংস্থাগুলো এক বিশেষ ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম তৈরি করার চেষ্টা করছে, যার মধ্য দিয়ে বেলুচিস্তানের মানুষদের ওপর নজরদারি চালানো হবে। অতীতে বেলুচিস্তানে বেশ কিছু চিনা কর্পোরেট সংস্থা বিনিয়োগ করার চেষ্টা করে, কিন্তু বেলুচদের একাংশ তার বিরোধিতা করে।

সাম্প্রতিক বিস্ফোরণেও নিহতদের তালিকায় অন্তত তিনজন চিনা নাগরিক ছিলেন। ঘটনার ঠিক পরেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁদের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করার উদ্দেশ্যে চিনা দূতাবাসে যান। চিনের প্রশাসনও সামগ্রিক ঘটনার দ্রুত তদন্তের জন্যে তাঁর ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। সমগ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পাকিস্তানের এবং চিনের প্রতি বেলুচদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। অবিলম্বে যদি পাকিস্তান সরকার তাদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রক্রিয়া শুরু না করে, তাহলে এই ক্ষোভ ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পেতে পারে, এমনটাই মনে করছেন তাঁরা।

বিস্তর নাটকীয়তার পর পাকিস্তানে ক্ষমতায় এসেছে নতুন সরকার। সেদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছ থেকে সুশাসনের আশা করবেন। এমতাবস্থায় দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসন্তোষের ফলে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলে তার সুযোগ কি নিতে পারে পশ্চিমা দেশগুলো? রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন এটাই।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।