রীতির ঐতিহ্য থেকে বিসর্জন, কোথায় আলাদা বাংলাদেশ আর পশ্চিমবাংলার পুজো? 

Bangladesh Durgapuja 2022: দুই বাংলার মানুষই নিজ নিজ নৌকায় দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানা বরাবর ইছামতী নদীর মাঝখানে সেই নৌকা নিয়ে ভেসে পড়েন। একই জলে বিসর্জিত হয় দুই বাংলার উৎসব।

Zerin Hossain
৩ মিনিট
রীতির ঐতিহ্য থেকে বিসর্জন, কোথায় আলাদা বাংলাদেশ আর পশ্চিমবাংলার পুজো? 

দুর্গাপুজো মানেই যে শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির শারদোৎসব, তা কিন্তু একেবারেই না। সেই আনন্দে ভাগ রয়েছে পড়শি বাংলাদেশেরও। করোনার চোখ রাঙানি পেরিয়ে যেভাবে পশ্চিমবাংলার মানুষ অপেক্ষা করছেন পুজোর আনন্দে সামিল হওয়ার, প্রতিবেশী দেশেও দুর্গাপুজোর সমস্ত তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। শুধুই নাড়ির টান নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে এই বঙ্গের রয়েছে উৎসবের টানও। অনেকের কাছেই অজানা, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নামকরণই করা হয়েছে দেবী ঢাকেশ্বরীর (দেবী দুর্গার এক নাম) নাম থেকে। ঢাকেশ্বরী মন্দির বাংলাদেশের জাতীয় এবং বৃহত্তম হিন্দু মন্দির। এই মন্দির বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশে প্রতি বছরই হাজার হাজার দুর্গাপুজো হয়। আর বাংলাদেশে সবথেকে বেশি দুর্গাপুজো হয় চট্টগ্রামে। ২২৪৫ পুজো মণ্ডপ রয়েছে শুধু চট্টগ্রামেই। বাকি সারা দেশ জুড়ে রয়েছে মোট ৩১,৯৩২ টি পুজো মণ্ডপ যার সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় রয়েছে মোট ৯৩৯ টি দুর্গাপুজো।

কেমন হয় ঢাকার পুজো?

এক কথায় বলতে গেলে, ঢাকার পুজো ঐতিহ্যের পুজো। পুরোনো ঢাকার গলিগুলোতে ছোট মণ্ডপের আশেপাশে বাড়ির মতো পরিবেশে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের প্রতিমা এখানে নজর কাড়ে। শুধুই প্রতিমা নয়, আশেপাশের মানুষের সীমাহীন আবেগের প্রতিচ্ছবিই ধরা পড়ে ঢাকার পুজোয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শুভ মহালয়া বলা কি ভুল? দিনটির তাৎপর্য জানলে চমকে যাবেন

Durgapuja 2022: মহালয়ার তিথি থেকেই দেবীপক্ষর সূচনা। কী তাৎপর্য এই দিনের?

বাংলাদেশের প্রাচীন পুজোগুলোতে শুধুমাত্র প্রতিমা নয়, মণ্ডপ বা আলোকসজ্জাও নজর কাড়ে। রাস্তা এবং আশপাশের এলাকা রঙিন মূর্তি, ব্যানার এবং নিয়ন লাইট দিয়ে সাজানো হয়। মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট খাবারের স্টল, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির আয়োজন। বাঙালিয়ানার নির্যাস এখানে ভরপুর।

মণ্ডপের ভিতরে ছেলেমেয়ে সহ উমা। দুর্গার বিশাল মূর্তি ঢাকার গরিমা বলা যায়। শুধু প্রতিমা আর পুজো নয়, দুর্গোৎসবের সঙ্গে দুই বঙ্গেই নিবিড়ভাবে জড়িয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা। মণ্ডপে মণ্ডপে তাই পুজোর অনুষ্ঠান এখানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গানের আসর, নাচ এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানও পুজোর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকার বেশ কিছু ঐতিহ্যশালী সার্বজনীন (বারোয়ারি) দুর্গাপুজোর মধ্যে রয়েছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুজো, শাঁখারিবাজারের দুর্গাপুজো, ঢাকার রামকৃষ্ণ আশ্রমের পুজো, শিকদারবাড়ির দুর্গাপুজো এবং এমন আরও বহু।

শাঁখারিবাজারে মোট ৯ টি পুজো আয়োজিত হয় এবং প্রতিটি পুজোই অন্তত ৪০-৫০ বছরের পুরোনো। রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কুমারীপুজো। পশ্চিমবাংলার বেলুড় মঠের মতোই, মহাষ্টমীতে সেখানে কুমারীপুজো দেখতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ভিড় জমান। এছাড়াও রয়েছে বনানী পুজোমণ্ডপ, খামার বাড়ি মণ্ডপ, উত্তরা পুজোমণ্ডপ, শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির এবং আরও অনেক মন্দির যা লিখে শেষ করা যায় না।

সারা দেশে মণ্ডপগুলিতে মহাষষ্ঠী পুজোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপুজো উদযাপন। সকালে মন্দিরে কল্পারম্ভে দুর্গা প্রতিমা উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিন। সপ্তমীর আগমনে ‘কলাবউ’ বা ‘নবপত্রিকা’ পুজো হয়। পুজোর সব দিনই দেবীর ভোগ প্রসাদ হয় সম্পূর্ণভাবে নিরামিষ। নবমীর সন্ধ্যায় ধুনুচি নাচে মাতেন মানুষ। মাটির পাত্রে জ্বলন্ত কাঠকয়লা ভরে তা হাতে নিয়ে ঢাকের তালে নাচ, দুই বাংলাকে মিলিয়ে দেয়। পাঁচ দিনব্যাপী উদযাপন বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা এবং প্রতিমার বিসর্জনে শেষ হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সারা কালনা অন্ধকারে ডুবিয়ে নিরঞ্জন হয় প্রতিমার! অবাক করবে মহিষমর্দিনীর ঐতিহ্য

Mahishamardini Puja: আগে পুজোর সময় এই ঘাটে হোরমিলার কোম্পানির স্টিমারে করে আসত বেলোয়ারি ঝাড় লণ্ঠন। তাই দিয়েই আটচালা সাজানো হতো।

বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর ইতিবৃত্ত

ঐতিহাসিকভাবে পঞ্চদশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে রাজা কংসনারায়ণ বাংলাদেশের রাজশাহীর তাহেরপুরে একটি বৃহৎ আকারে দুর্গাপুজো শুরু করেন। বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজো ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই করেছিলেন।

ধর্মীয় রীতিনীতিগুলি সীমান্তের দুই পাশে অনেকাংশে একই, যদিও বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুশীলনের ফলে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু আজও বাংলাদেশের গ্রামে দুর্গাপুজো পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়। ধর্মীয় আচারগুলি আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় বাংলাদেশে।

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গামূর্তিগুলি যুবতী সর্বানী দত্তকে যামিনী রায়ের আঁকা মহিলাদের প্রতিকৃতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের দেবদেবীরা আকৃতিতে বেশি আদিবাসী।

দেবীর বিসর্জনের দিন সীমান্তে এসে মেলে দুই বাংলা। পশ্চিমবঙ্গে টাকির বাসিন্দারা যখন বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত হন তখন বাংলাদেশের সীমান্তের সাতক্ষীরা জেলাতেও একই রকম দৃশ্য দেখা যায়। দুই বাংলার মানুষই নিজ নিজ নৌকায় দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানা বরাবর ইছামতী নদীর মাঝখানে সেই নৌকা নিয়ে ভেসে পড়েন। একই জলে বিসর্জিত হয় দুই বাংলার উৎসব।

বেশ কয়েক মিটারের দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী দুই দেশই একে অপরের দিকে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং “আসছে বছর আবার হবে” রব ওঠে দুই পাড় থেকেই। ভূ-রাজনীতি দ্বারা বিভক্ত দুই দেশের নাগরিকরা এক দিনের জন্য যৌথ ঐতিহ্য উদযাপন করতে একত্রিত হন– এই পরম্পরা আজও সগৌরবে বহমান।

ঢাকার জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজোর উৎসবে বরাবরই বাঙালি মুসলিমরা মেতে ওঠেন। উৎসবের আমেজেই মণ্ডপ দর্শন করেন, উৎসবে সামিল হয়ে মুসলিম প্রতিবেশী ও বন্ধুরা হিন্দু বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন প্রসাদ খেতে। গল্প, আড্ডা আর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও উল্লেখের দাবি রাখে। দুর্গার বিসর্জনের যাত্রাতেও শরিক হন সকলেই। কোভিডের কারণে হুল্লোড় কিছুটা স্তিমিতই ছিল গত দু’বছর। তবে এবার দুই বাংলাই এই উৎসবকে স্বাগত জানাতে একেবারে প্রস্তুত।

লিখেছেন
Zerin Hossain
Zerin Hossain
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।