সৌন্দর্যের ধারণাকে সপাট সওয়াল! ভারতের প্রথম মহিলা কমেডিয়ান টুনটুনকে ভুলেছে বলিউড

Bollywood First Female Comedian Tun Tun: নওশাদই কথায় কথায় একবার উমাকে বললেন, 'অনেক তো হল গানের জগতে। এবার অভিনয় চেষ্টা করো না কেন!'

সমাজ সৌন্দর্যের একরকম বাঁধাধরা গৎ ঠিক করে করে দিয়েছে। কোমরের মাপ থেকে শুরু করে গায়ের রঙের মাত্রা। সব কিছুই মেপে দেওয়া আছে। তার থেকে একটু উনিশ-বিশ হলেই আমাদের চোখে তা বড়ই উৎকট লাগে। অমনি শুরু হয়ে যায় কথাবার্তা, মন্তব্য-টিপ্পনীর জোয়ার ওঠে। কৌতূকে ফেটে পড়ি আমরা। হাসির কলরোল ওঠে। সে হাসির শব্দে চাপা পড়ে যায় অন্য কারওর কালো হয়ে আসা মুখ, চোখের কোলে ছলকে ওঠা জল। ক্রমে তথাকথিত ধারণার কৌটোয় বসতে না পারা মানুষটিকে দুর্বল ভাবতে শুরু করি। আর সেই সামাজিক ভাবে কোণঠাসা মানুষটি তাই তার দুর্বলতাকেই অস্ত্র বানিয়ে ফেলে। কলার খোসায় রাস্তায় পিছলে পড়া লোকটির মুচকে যাওয়া পা কিংবা যন্ত্রণাকাতর মুখের দিকে চোখ যাওয়ার আগেই পেটের ভিতর থেকে সোডার মতো ভসভসিয়ে ওঠে হাসি। এ যেন চিরাচরিত মনুষ্যস্বভাব। তাই পড়ে যাওয়া মানুষটি বানিয়ে তোলে নিজের নিরাপত্তাবলয়। কলার খোসায় পা মচকে পড়ে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠার আগে সে নিজেই হেসে ওঠে নিজেকে নিয়ে। সবার হেসে ওঠার আগে হেসে ওঠে। এ-ও এক প্রতিরক্ষা। যেমন কৌতূক।

বেশিরভাগ কৌতূকশিল্পীকেই তো আমরা দেখি, শারীরিক বৈচিত্রকে তার কৌতুকের বিষয় করে তুলতে। সমাজের ঠিক করে দেওয়া দাঁড়িপাল্লায় যা কিছু বেমানান, তাই যেন কৌতুকের একটি বিষয়। 'জিসকি বিবি মোটি উসকা ভি বড়া নাম হ্যায়'- এমন গানের লাইন তাই উঠে আসে বারবার। অবশ্য আজকের দিনে সেই কৌতুকের ধরন কিছুটা হলেও বদলেছে। বদলেছে কৌতুকশিল্পীদের বাজারও। এখম স্ট্যান্ডআপ কমেডি শো বা কমেডিয়ানদের যতটা রমরমা, আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কিন্তু তা ছিল না। কাউকে হাসানো যে একটা মানুষের পেশা হতে পারে, তা-ই ছিল ভাবনার বাইরে। আর তা যারা করতে চাইতেন, তাঁদের সহজেই দেগে দেওয়া যেত 'ভাঁড়' বলে। ফলে এমন একটা পেশায় যে মেয়েদের আসাটা তেমন সহজ হবে না, তা বুঝতে অসুবিধা হয়না।

আরও পড়ুন: দিয়েছিলেন বিসমিল্লা খানকে টেক্কা, প্রথম মহিলা সানাইবাদক বাগেশ্বরী যেন সুরের সরস্বতী

এদিকে ততদিনে বিশ্বসিনেমার মঞ্চে পা রেখে ফেলেছেন চার্লি চ্যাপলিন। দুনিয়ার সামনে খুলে গিয়েছে নতুন একটি ধারা। স্বাভাবিক ভাবে অনেকেই প্রভাবিত হয়েছিলেন সেসময় চ্যাপলিনের অভিনয়ে। তাঁদের মধ্যেই একজন ছিলেন নুর মহম্মদ মেমন। মঞ্চে চার্লি চ্যাপলিনকে নকল করে পেশাদার জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। এতটাই ভালো তিনি নকল করতেন, যে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল নুর মহম্মদ চার্লি। এক রকম ভাবে বলতে গেলে, তার হাত ধরেই ভারতীয় সিনেমায় শুরু হয়েছিল কমেডির ধারা। সে সময় আর কোনও কমেডিয়ান ছিলেন না বললে ভুল হবে। নাজির মহম্মদ বা মনোহর দীক্ষিতের মতো অনেকেই ছিলেন। তবে নুর ছিলেন তাঁদের থেকে আলাদা। একেবারে অন্যধরনের কৌতুকাভিনয়ের পথ প্রশস্ত করলেন তিনি নিজের হাতে। আর সেই পথ ধরেই পরবর্তীকালে বলিউডে পা রাখলেন জনি ওয়াকার, মেহমুদের মতো অভিনেতারা।

Umadevi  

তবে এই সবের ভিড়ে মহিলা কৌতুকাভিনেতা! না, তখনও সেই পথ ছিল মেয়েদের জন্য এক্কেবারে বন্ধ। আর সেই দরজাতে গিয়েই প্রথম কড়া নাড়লেন এক গায়িকা-অভিনেত্রী। সমাজ এতদিন ধরে মেয়েদের সৌন্দর্যের যে মাপকাঠিতে দেখতে পছন্দ করে এসেছে, তার মূলে দিলেন গিয়ে ধাক্কা। প্রথমবার গ্ল্যামারের দুনিয়ায় পা রাখলেন এমন একজন, যার চেহারা সেই অর্থে নায়িকাচিত নয়। নেপথ্যগায়িকা হিসেবে বলিউডে পা রেখেছিলেন উমাদেবী খাতরি। তবে অভিনয়ের জন্য নিজেই পরে বেছে নেন ছদ্মনাম। দুনিয়া তাঁকে চিনতে শুরু করে টুনটুন নামে। যে শরীরি অভিনয় দিয়ে দুনিয়াকে মুগ্ধ করেছিলেন চার্লি চ্যাপলিন, টুনটুনও বেছে নিলেন সেই ঘরানাই। মুখে একটিও শব্দ না-করে মুগ্ধ করলেন অযুত দর্শককে।

আগেই বলেছি, তথাকথিত সৌন্দর্যের মাপকাঠির সঙ্গে মিলত না উমাদেবীর চেহারা। আর সেটাকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তিনি। তাঁর বড় হয়ে ওঠা উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলার ছোট্ট একটি গ্রামে। ছোটবেলাটা সহজ ছিল না। খুব ছোটবয়সে পরিবারকে হারান। জমি নিয়ে বিবাদের জেরে খুন হতে হয়েছিল বাবা-মা-কে। তখন উমার কতই বা বয়স? বড় জোর দুই কি তিন হবে। হরি নামে এক বছর আটেকের দাদা ছিল তাঁর। উমার যখন পাঁচ বছর বয়স, কারা যেন হরিকেও খুন করে ফেলে রেখে যায়। উমা পড়ে থাকে বাড়ির কাজের লোকের কাছে অনাদরে। কোনও মতে দু'বেলার খাবার জুটত শুধু। আর সেই ট্র্যাজেডির মধ্যেই বড় হতে লাগল আগামীর কমেডিয়ান।

আসলে জীবন তো সার্কাস। সেখানে থামার কোনও সুযোগ নেই। থামেননি উমাও। এরই মধ্যে তাঁর আলাপ হল আখতার আব্বাস কাজি নামে এক্সাইজ কর্তার সঙ্গে। তাঁর হাত ধরেই উমা পাড়ি দিলেন পাকিস্তানে। এই অনটন, অনাদরের জীবনে প্রথমবার ভালোবাসার ছোঁয়া পেলেন উমা। পেলেন সমর্থন। তবে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল নয়া ঝামেলা। কাঁটাতার বসে গেল ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। ঠিক সেই সময়েই লাহৌরে পোস্টিং পেলেন আখতার। এসব ঝঞ্ঝাট-ঝামেলায় যেন বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন উমা। সব ছেড়ে পালিয়ে এলেন বম্বেতে। বুকে রূপোলি পর্দার নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে।

বরাবরই গান গাইতে ভালোবাসতেন উমা। তবে প্রথাগত শিক্ষা ছিল না তাঁর কোনওদিনই। তবে নিজের প্রতি বিশ্বাস ছিল। আর সেটুকু সম্বল করেই পৌঁছে গিয়েছিলেন সুরকার নওশাদ সাহেবের কাছে। নওশাদ আলির বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেছিলেন, 'একবার শুনে দেখুন আমার গান। একটা সুযোগ আমায় দিতেই হবে। নাহলে সমুদ্রে গিয়ে মাথা কূটে মরব।' শুনেছিলেন নওশাদ। আর শোনা মাত্র উমাকে পছন্দও হয়ে গেল তাঁর। সুযোগ এসে গেল পরপরই। উমা গান গাইলেন 'ওয়ামিক আজরা' নামে একটি ছবিতে। হিট হয়ে গেল সেই গান। খুব শিগগিরই পরিচালক-প্রযোজক এ আর কারদারের সঙ্গে চুক্তিপত্রে সই করেন উমাদেবী। সেই শুরু। এর পর একের পর এক ছবিতে গান গেয়েছেন। রোজগারও করেছেন দু'হাতে। 'আফসানা লিখ রাখা হু', 'ইয়ে কন চলা মেরি আখোঁ মে', 'আজ মচি হ্যায় ধুম'-এর মতো উমার গাওয়া একাধিক গান জনপ্রিয় হয়েছে। তবে সেই ভালো দিন খুব বেশিদিন সইল না। এর মধ্যেই বদলাতে শুরু করল গানের ধরন। ততদিনে হিন্দি ছবির দুনিয়ায় পা রেখে ফেলেছেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীরা। স্বাভাবিক ভাবেই বাজার শেষ হয়ে আসছিল উমাদের মতো পুরানো ঘরানার শিল্পীদের।

নওশাদই কথায় কথায় একবার উমাকে বললেন, 'অনেক তো হল গানের জগতে। এবার অভিনয় চেষ্টা করো না কেন!' বলার কারণও ছিল। উমার কৌতুকরস ছিল চমৎকার। তেমনই ছিল কমেডি টাইমিং। পরামর্শটা মন্দ লাগেনি উমার। তবে চাইলেই তো আর হল না। অভিনয়ে সুযোগ পাওয়া তো আর মুখের কথা নয়। তবে সেই পথটাও দেখিয়ে দিয়েছিলেন নওশাদ সাহেবই। উমা আবার ছিলেন দিলীপ কুমারের অন্ধ ভক্ত। নওশাদ তা জানতেন। তিনিই উমার ব্যাপারে কথা বললেন দিলীপ কুমারের সঙ্গে। সুযোগ পেলেন উমা। টুনটুন ছদ্মনামে অভিনয়ে পা দিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে 'বাবুল' ছবিতে তিনি সুযোগ পেলেন দিলীপ কুমারের সঙ্গে কাজ করার। উল্টোদিকে ছিলেন নার্গিস। শুরু হল উমার নতুন যাত্রা।

আরও পড়ুন: বাইজি গলি থেকে মুম্বই শাসন! ভারতের প্রথম দুই মহিলা সুরকারকে ভুলেছে সিনেমা

তাঁর হাত দিয়েই খুলে গেল নতুন এক দুনিয়ার দরজা। মেয়েরাও যে চাইলেই কৌতুকশিল্পী হতে পারেন, তা প্রথম দেখিয়ে দিলেন উমাই। শুধু দিলীপ কুমারই নয়। গুরু দত্তের সঙ্গেও করেছেন একাধিক অভিনয়। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল, পরের পর কাজ পেয়েছেন টুনটুন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে বলিউডে কমেডির দুনিয়া শাসন করেছেন তিনি। কাজ করেছেন অমিতাভ বচ্চনের 'নমক হালাল' ছবিতেও। হিন্দি, উর্দু মিলিয়ে কম করে হলেও ১৯৮টি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়তা।

কিন্তু অভিনেতা হিসেবে কি আদৌ সেই জায়গাটা পেয়েছিলেন টুনটুন। নাকি ভারতীয় সৌন্দর্যের উল্টোপিঠ হয়েই কেবল বলিউডে থেকে গেলেন টুনটুন ওরফে উমাদেবী। প্রশ্ন জাগে। তথাকথিত সৌন্দর্যের ধারণার সঙ্গে কোনওদিনই যে মিলত না টুনটুনের চেহারা বা আকৃতি। বরং তুলনামূলক স্থুলকায় চেহারার জন্যই কমেডি শিল্পী হিসেবে বিশেষ মান্যতা পেয়েছিলেন টুনটুন। পৌঁছে গিয়েছিলেন ঘরে ঘরে। এমনকী দিনে দিনে মোটা মহিলাদের সমার্থক হয়ে উঠেছিল 'টুনটুন' শব্দটি। ২০০৩ সালের নভেম্বরে মুম্বইতেই বয়সজনীত রোগে মারা যান টুনটুন ওরফে উমাদেবী। তবে কমেডির দুনিয়াটা যে কেবল পুরুষদের জন্য নয়, সেই সত্যটুকু প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন উমা দেবী। আজ কমেডির দুনিয়ায় একাধিক মহিলা শিল্পীদের উঠে আসতে দেখি আমরা। হাল আমলের ভারতী থেকে শুরু করে জেমি লিভার কিংবা সুমুখী সুরেশ, তাঁদের এই পথটা কিন্তু একদিন দেখিয়েছিলেন টুনটুনই। আজও দুনিয়া জুড়ে 'বডিশেমিং'-এর এই জঘন্য প্রবণতা একটা বিরাট সমস্যা। তবে বদল যে আসছে না একেবারে, তা বললে ভুল হবে। সৌর্ন্দর্য বা গুণ যে কেবল মুখ-বুক- চুল-কোমরে আটকে নেই, তা দেরিতে হলেও বুঝতে শুরু করেছে সমাজ। আর সেই বদলের ভূমিতে একটি ইঁট অন্তত গেঁথে গিয়েছিলেন তথাকথিত ভাবে 'মিসফিট' এই অভিনেত্রী।

 

More Articles