কথায় কথায় বেহাত ব‍্যক্তিগত তথ‍্য! সরকারের প্রতিশ্রুতি শুধুই ভাঁওতা? যে প্রশ্ন উঠে আসছে

Data Protection Bill: যে-দেশের প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হতে পারে, সে-দেশের সাধারণ মানুষের তথ্য কতটা সুরক্ষিত?

suman sengupta
৪ মিনিট
কথায় কথায় বেহাত ব‍্যক্তিগত তথ‍্য! সরকারের প্রতিশ্রুতি শুধুই ভাঁওতা? যে প্রশ্ন উঠে আসছে

আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি, আমাদের কাছে ‘গোপনীয়তা’ বা ‘তথ্য সুরক্ষা’ এই শব্দগুলোর কি কোনও তাৎপর্য আছে? আমরা কি আদৌ চিন্তিত, কীভাবে এবং কারা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লেষ করে আমাদেরই তাঁদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ব্যবহার করছে? এই যে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা আমাদের ফোন করেন, কিভাবে তাঁরা আমাদের নম্বর পান, কীভাবে তাঁরা বোঝেন, আমাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের কথা? আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি, আমরাই কি প্রাথমিকভাবে আমাদের গোপনীয়তার অধিকারে অন্যকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দিইনি? বিভিন্ন জায়গায়, আমরা যে আমাদের ফোন নম্বর না চাইতেই দিয়ে থাকি, বিভিন্ন কেনাকাটার সময়ে আমাদের থেকে ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে যে আমাদের ফোন নম্বর নেওয়া হয়, এবং আমরাও যে আহ্লাদিত হয়ে তা দিয়েও দিই, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কি আমাদের গোপনীয়তা প্রথমেই লঙ্ঘিত হয় না? এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই বেশ কিছু বহুজাতিক সংস্থা এবং রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

একজন ব্যক্তিমানুষকে যদি তাঁর নাম, লিঙ্গ, বয়স দিয়ে চিহ্নিত করা যায়, তাহলে তা তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য, কিন্তু এই চিহ্নিতকরণের বিষয়গুলো সরিয়ে যদি কোনও একজন ব্যক্তির ভালোলাগা-মন্দলাগাগুলোকে এক জায়গায় আনা যায়, তাহলে তাই হয়ে ওঠে বেনামি তথ্য। অনেক সময় একজন মানুষের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য, তাঁর আর্থিক তথ্য কিংবা তাঁর জাত বা ধর্মবিষয়ক কোনও তথ্য বা আরও বেশ কিছু সংবেদনশীল বিষয়ের তথ্যাদি ও রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতেও কি বাধ্যতামূলক হবে ভোট দেওয়া! বোলসেনারোর হার সবক শেখাবে বিজেপিকে?

Lula da Silva: যখনই দেখা গেছে, শাসকদল নিজেদের সমর্থকদের ভোট দেওয়াতে উৎসাহী করতে পারছেন না, তখনই তারা হারার ভয় পাচ্ছেন, আর তখনই তারা ভোটদানকে বাধ্যতামূলক করতে চাইছেন

২০১৯ সালে যে তথ্য সুরক্ষা বিল পেশ হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, ইচ্ছে করলে সরকার ব্যক্তিগত তথ্য ছাড়াও বেশ কিছু সংবেদনশীল তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে। শুধু তাই নয়, আরও বলা হয়েছিল, বিজ্ঞাপনদাতারা যাতে আরও নির্দিষ্টভাবে তাঁদের লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছতে পারেন, তাই তাঁদের সুবিধার্থে তাঁরাও এই তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। এই সমস্ত তথ্য হয়তো একজন ব্যক্তিমানুষের কাছে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ না মনে হতে পারে, কিন্তু যাঁরা এই তথ্য হাতে পাবেন, তাঁদের কাছে এই তথ্য অত্যন্ত দামী। একটু উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝা জরুরি। একজন ব্যক্তি তাঁর আধার নম্বর দিয়ে রেশনের ভরতুকি-যুক্ত চাল বা বিনামূল্যে চাল পাচ্ছেন, তাহলে কোনও শাসক দলের কাছে যদি এই তথ্য থাকে, কোন মোবাইল নম্বরের অধিকারী বিনামূল্যে রেশনের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাচ্ছে, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে কে পাচ্ছেন না জানা গেলেও, নির্বাচনের সময়ে তাঁর কাছে কি সরকারের গুণগান গাওয়া বিজ্ঞাপনী বার্তা পাঠানো সম্ভব নয়? এই মুহূর্তে কথা চলছে, ভোটার কার্ডের সঙ্গে আধারের সংযোগের, তাহলে সরকারের কাছে যদি এই তথ্য থাকে, কোন আধার নম্বর এবং কোন ফোন নম্বর সরকারি কী কী সুবিধে নিয়েছে, তাহলে সেই ফোন নম্বর বা সেই ব্যক্তি বা পরিবারকে কি চিহ্নিত করা খুব কঠিন? সরকারি যে কোনও সুযোগসুবিধার সঙ্গে আধার যুক্ত করা হলে, এবং ভবিষ্যতে তা দিয়ে যদি নির্বাচন করানো বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে এই ধরনের নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও কলঙ্কবিহীন বলা যাবে?

মাঝেমধ্যেই শোনা যায়, বেশ কিছু তথ্যভান্ডার থেকে বহু মানুষের তথ্য চুরি হয়েছে, তারপর সমস্ত ক্ষেত্রে সরকারি যা বয়ান থাকে, তাতে বলা হয়, সবার তথ্য সুরক্ষিত আছে, কিন্তু আদৌ কি তা সুরক্ষিত থাকে? ভারতের আধারের ক্ষেত্রেও এই ধরনের অভিযোগ শোনা গেছে বহুবার। অনেকে বলে থাকেন, আধারের তথ্যভান্ডারে ডেমোগ্রাফিক তথ্য ও বায়োমেট্রিক তথ্য রাখা থাকে, যদি চুরিও হয়, তাহলেও শুধু ডেমোগ্রাফিক তথ্য, অর্থাৎ একজন মানুষের বহিরঙ্গের কিছু তথ্য চুরি গেলেও তাঁর বায়োমেট্রিক তথ্য, অর্থাৎ হাতের ছাপ, চোখের মণি এইজাতীয় তথ্য সুরক্ষিতই থাকে। কিন্তু শুধু ডেমোগ্রাফিক তথ্যই কি যথেষ্ট নয়, সেই মানুষটি সম্পর্কে জানার জন্য, কিংবা তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর জন্য?

তথ্য সুরক্ষার যে খসড়া বিল সাম্প্রতিক সময়ে আনা হয়েছে এবং নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, যদি এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটে, তাহলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে জানাতে হবে, যাতে তাঁরা সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতেপারেন। অতীতে এই ধরনের কোনও ব্যবস্থা না থাকলেও, এই খসড়া বিলে এই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা আছে, কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকের কি এই সচেতনতা আছে, কীভাবে তাঁর তথ্যকে তিনি সুরক্ষিত রাখবেন? প্রথমত, যদি তিনি জানতেও পারেন, তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে, তাহলে তিনি কার কাছে অভিযোগ করবেন, তা কি তিনি জানেন? যদি তাও জানেন, কী পদ্ধতিতে এই অভিযোগ করা হবে, তাঁকে মেল করতে হবে, না কি মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে এই অভিযোগ দায়ের করতে হবে, তা কি একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে জানলেও, করা সম্ভব?

যে-দেশের প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হতে পারে, সে-দেশের সাধারণ মানুষের তথ্য কতটা সুরক্ষিত, সেই প্রশ্ন করার কি সময় আসেনি? ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কি সবাই ইংরেজি ভাষায় এতটাই দক্ষ, যে তাঁরা সকলে ইংরেজিতে এই বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করতে পারবেন? গুগলের নিজস্ব রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯০ শতাংশ মানুষই নিজের মাতৃভাষায় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। দেখা গেছে, ৫ শতাংশরও কমসংখ্যক মহিলা সাধারণভাবে সামাজিক মাধ্যমে সড়গড় হলেও, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং করেন। তাহলে কত শতাংশ মানুষ এই ‘তথ্য সুরক্ষা বিল'-এর খসড়ায় তাঁদের মতামত দিতে পারবেন? সরকার হয়তো ‘তথ্য সুরক্ষা’ বিল নিয়ে মতামত চাইছে, কিন্তু সেই মতামত কারা দেবেন, কীভাবেই বা দেবেন, তা নিয়ে কি সরকার চিন্তিত? না কি এই মতামত চাওয়াটাও একটা লোক দেখানো কাজ? আগামী ১৭ ডিসেম্বর অবধি এই মতামত চাওয়া হয়েছে, দিতে হবে mygov.in-এ, কিন্তু ভারতের ৭৬ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কতজনই বা জানেন, বা ইচ্ছুক এই বিষয়ে মত দিতে?

লিখেছেন
suman sengupta
suman sengupta
2 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।