হারিয়ে যাওয়া জোকার খুঁজি আজও! তুমিও কি হাত লাগাবে বাবা?

Father's Day 2023: তাই এখন কার্ডটা খুঁজি বাবা আমি, খুব খুঁজি বুঝলে। আমার হাওয়ায় পাওয়া কার্ড তো.. খুঁজে পেতেই হবে!

Rifon Sarkar
৫ মিনিট
হারিয়ে যাওয়া জোকার খুঁজি আজও! তুমিও কি হাত লাগাবে বাবা?

বাবা,

এই চিঠির শুরুতে কোনো বিশেষণ বসাইনি তোমার নামের আগে, এতে তুমি কি খুব রাগ করবে? না। আমি জানি এসবে তোমার কিছুই আসে যায়না। যে তুমি কোনওদিন খবরের কাগজের হেড লাইন আর প্রথম পাতার রাজনীতির ছবি ছাড়া আর কিছুই দেখোনি, জানি কোনওদিনই আমার লেখা অক্ষরদের পড়বে না। তবে তুমিই ছিলে আমার প্রথম পাঠক-শ্রোতা। নাইন-টেনে পড়ার ফাঁকে প্রথম কবিতা লিখে তোমাকেই শোনাতাম। শুনতে, প্রেরণা দিতে তবে শুকনো। তবে আমি জানি, সেসবে তোমার গর্বও হত হয়তো খানিকটা। কী শ্রদ্ধায় ডেকে ডেকে লেখা শোনাতাম না তখন? এখন আফসোস হয়, কেন শোনাতাম!

তোমার সঙ্গে এখন আমার লক্ষ্য যোজনের দূরত্ব বাবা। তাই তো কোনো প্রীতি বিশেষণ তোমার নামের আগে বসিয়ে একটা শ্রদ্ধাবনত চিঠি লিখে উঠতে পারছি না। আমি তোমাকে ঘৃণা করিনা বাবা। তবে তোমাকে আমার ভালো লাগে না জানো। যেমন তোমারও আমাকে ভালো লাগেনা। তোমার পরিকল্পনা আর আচরণে তাই আমার শুধু সন্দেহ জাগে। আমি তোমার প্রতি কথায় প্রশ্ন করে বসি। বিশ্বাস মিইয়ে এসেছে এত দিনে, তাই সন্দেহ দানা বাঁধে অযথা । তুমি কি একটুও কিছু মনে করতে পারছো বাবা? সেই ছোটো থেকে যাকে তুমি গাড়ি চেনাতে চেনাতে, রাস্তা চেনাতে চেনাতে কতো কতো কৌশল করে রোজ ভোরের স্কুলে নিয়ে যেতে, নিয়ে আসতে কোলে করে, সে এখন তোমায় সন্দেহ করে।

বাবা তোমার মনে আছে, সেই যেবার মহালয়ার দিন আমার হাত কেটে গেল! অথচ সেদিনই তোমার সঙ্গে আমার পুজোতে যাওয়ার কথা ছিল। তোমার আনা ছোট্ট ধুতি পাঞ্জাবি পরে গিয়েছিলাম মাঝরাতের পুজোয়। আর সেই দিন.. ওই যে আমার জন্যে, পাঁচ বছরের ছেলের জন্যে পুজোর নতুন বিস্ময়, তুলে আনলে হকার্স কর্ণারের মার্কেট থেকে। সেদিন আমাদের মানিকতলা বাড়ির চাতালে আলো জ্বলে উঠল যেন। ভরা বিকেলে আমি স্থির হয়ে দেখলাম, তুমি আমার নতুন জামা গুলো সব খুলছ, সাইজ চেক করছো। আমার সেদিনের কথা সব মনে আছে জানো বাবা, কারণ সেদিনই তো আমি ফুল প্যান্ট হলাম। বটোল গ্রীন হাফ শার্ট আর কালো বক্স চেকের জিন্সের প্যান্ট। বহুদিন পরেছিলাম ওই পোশাক আমি । তারপর ওই পুরনো ঘরের আলমারি থেকে, মানিকতলা থেকে সেসব হাওয়া হয়ে গেল। বড়ো হয়ে গেলাম আমিও।

তোমার আচরণ আমায় কাঁদিয়েছে বাবা, আমাকে আরও একা করে দিয়েছে একটা ঘরেই। ভেবেছি পালিয়ে যাব। কিন্তু পারিনি। ছোটো বেলা থেকেই তোমার জনপ্রিয়তা আমার মধ্যে ঈর্ষা জাগিয়ে তুলেছে। আমার সমস্ত অবিশ্বাস, সন্দেহ আর ভালো না-লাগা আসলে তোমার কথা না রাখতে পারার ফল। আমি তোমার থেকে কোনওদিন কিছু কি চেয়েছিলাম? খুব দামী কিছু? যে দামের সংজ্ঞায় তুমি 'না' বলবে.. এদিক ওদিক যুক্তি দিয়ে আমায় কাটিয়ে যাবে, এমন তো কিছুই চাইনি আমি। আমার সাহসই হয়নি চাওয়ার, প্রয়োজনও পড়েনি কোনোদিন।

আমি তোমায় তখন থেকে জানতাম বাবা, তুমিও তো চিনতে তখন থেকেই আমায়.. কেন হঠাৎ সব বদলে গেল? কেন হঠাৎ এই ক্লান্তিহীন অতিরিক্ত মাত্রায় একরোখা হয়ে উঠলে তুমি? দিনের পর দিন ভুল ভাবে সময়ের অপব্যয় করলে? পেশা বাছতে গিয়ে অপরিণামদর্শীর মতো দু'হাতে সময়কে ওড়ালে, ক্লান্ত করলে আমাদের। তোমার সব সব সব নির্বাচন ভুল ছিল বাবা। তাই তো আজও ভ্রাম্যমাণ হয়ে বেঁচে থাকতে হয়..

বাবা তুমি কি এই সব করতে করতে ক্লান্ত হয়েছো কোনওদিন? আমার দিক থেকে উত্তেজনার বান যতবার তোমার দিকে গেছে, ততবার তুমি শান্ত থেকেছো। নয় নিজের অস্তিত্বের জন্যে এঁড়ে তর্ক চালিয়ে গেছো। সত্যিই কি তুমি কোনওদিন এসবে ক্লান্ত হতে বাবা? হতে, আমি জানি। তাই তো তুমি কাঁদতে পারতে না। অথচ দেখো আমি কেঁদে ফেলি যখন-তখন, তাই আমার কোনো পুরুষালি ভাব নেই। তোমার পৌরুষ ছিল তোমার ওই এঁড়ে তর্ক। আর না-কাঁদাটা ছিল তোমার মূলধন। ভেঙে না-পড়া ভগ্নতার মূলধন। আমি তো সেটুকুও পারিনা।

একাধিক বার তুমি আমার সঙ্গে কথায় পেরে ওঠনি আমি জানি, আমাদের যুদ্ধ তাই থামেনি। তুমিও আমায় কথা শোনাও, আমিও শোনাই। আমাদের দু পক্ষের সব আবদারের সব রাস্তাই তাই বন্ধ এখন। কেউ কিছু প্রত্যাশাই করি না। কিছু চেয়ে উঠিনা আর। অথচ তুমি খুব প্রত্যাশা করো আমার থেকে জানি। সেই প্রত্যাশার মধ্যে আমি আর স্নেহ দেখিনা কোনো। আমিও তাই বাধ্য পুত্রের কর্তব্য করতে চাই। শুকনো কাঠ হয়ে যাওয়া মায়াহীন কর্তব্য করি। কারণ আমি বড্ড তেতো হয়ে গেছি বাবা। আমি আর ভালো নই।

আমাদের দুজনের মাঝে তাই একজনই আছে নিয়তির পরিহাসের মতো- মা। সেই তোমায় এখনও ভালোবাসে বাবা। তোমার ভুলের ফিরিস্তি দিলেও, তুমি কী কী করতে বলেছো, সে আমাকে শোনায়। আর আমি মায়ের এই অগাধ অন্ধ প্রীতি দেখলে রেগে যাই। উনি সব ভুলের পরও আলগা বিশ্বাস করে তোমায়, নির্ভর করে কোনও অলীক লেগে থাকা মায়ার কারণে। আর এসব শুনলেই প্রথমে আমি উত্তেজিত হই, আর তারপর মায়ের ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে দেখি। কিন্তু কি মূর্খ দেখো আমি, শিখতেই পারিনা কিছু। অথচ এই শেখা শব্দটা আশৈশব তাড়া করল আমায় । তুমি যাদের দেখে শিখতে বলেছিলে। কিন্তু নিজে হাতে শেখাওনি সেসব। যেটুকু শিখিয়েছো, শুধু তাই রয়ে গেছে। তোমার চেনানো রাস্তাগুলো, তাঁদের আধা শোনা পাঁচমেশালি অল্প ইতিহাস..রয়ে গেছে, বয়ে নিয়ে যাচ্ছি সব। বাবা তুমি যে কাউন্টার শটটা শিখিয়েছিলে নতুন কেনা ক্যারামে পাউডার ঘষতে ঘষতে, সেটাও রয়ে গেছে। তুমি আমায় যে কোচিং ফেরত এলেই রাতে তাস সাজানো শেখাতে, টেক্কা সাহেব গোলামের রং চিনিয়ে চিনিয়ে মেলানো শেখাতে, আমার মতো বিস্ময় কিশোরের কাছে সব রয়ে গেছে বাবা। চিরেতন, রুইতন, থেকে কালো পান এসব বিচিত্র আকর্ষণের নামকে তোমার হাতেই চিনে ফেলেছিলাম না বাবা? কি সহজে চিনেছিলাম। তাই তো সব বদলে গেলো। তোমার বাঁ হাতে লুকানো জোকারের মতো সব লুকোনোই রইলো, আমার শখ তোমার পুরোপুরি না-শেখানো তাসের ঘরে।

কিন্তু বাবা শোনো, তুমি যে জোকারটাকে লুকিয়েছিল হাতে, তাকে আমি অনেক ছোটবেলাতেই দেখে ফেলেছিলাম। তুমি যেবার প্রথম আমায় একা একা বাসে তুলে দিয়েছিলে, আমার তখন ক্লাস ফাইভ। আমার ছোটো শরীর তখন বাসের হাতল ধরতেই হিমশিম খায়। অথচ কন্ডাকটরকে ভাড়া মিটিয়ে আমার পকেটে টাকা দিয়ে, তুমি সব বুঝিয়ে নেমে পড়লে ব্যাস থেকে। সেদিন থেকেই আরেকটা জোকার আমি তাই পকেটে পুরে নিয়েছিলাম। এই শহরকে দেখার সাহসের জোকার। আমি সেদিন জানো, একটুও ভয় পাইনি। সাহস করে মানিকতলার সেই স্টপেজে নেমেছিলাম। সিগন্যাল দেখে কারোর হাত ধরে ট্রাম লাইন পার , হয়ে তারপর সোজা বাড়ি এক ছুট্টে। ক্লাস ফাইভেই তাই আমার বড়ো হওয়া বাবা। এই একখানা জোকার তাই সেদিন থেকে পকেটে নিয়ে ঘুরছি আমি। কার্ডটা তখন ছোট্ট পকেট থেকে বেরিয়ে থাকত। আজ দেখতে দেখতে আমি এতো বড়ো, কোথায় যেন লুকিয়ে গিয়েছে সে.. কোথায়, কোথায় গেল বলো তো?

আমি বরং সেই কার্ডটাকেই খুঁজি বাবা, ক্লাস ফাইভ থেকে লুকোনো কার্ড। যদি এই বড়োবেলায় খুঁজে পাই, তবেই দেখবে সব আগের মতো হয়ে যাবে। আমার চারিদিকে তখন কোনো মতান্তর থাকবেনা, তখন আমাদের মধ্যে বিশ্বাসের হওয়া বইবে শুধু। আমি নীচু স্বরে জবাব দেব তোমার সব প্রশ্নের, তুমিও এককাট্টা রোয়াব কমিয়ে সরল হবে.. তখনই আমাদের ভ্রাম্যমান জীবনে স্থিতি আসবে হয়তো। তাই এখন কার্ডটা খুঁজি বাবা আমি, খুব খুঁজি বুঝলে। আমার হাওয়ায় পাওয়া কার্ড তো.. খুঁজে পেতেই হবে! ওটা খুঁজে পেতে তুমিও একটু হাত লাগাবে বাবা?

ইতি

তোমার সন্দেহপ্রবণ অবিশ্বাসী ছেলে

লিখেছেন
Rifon Sarkar
Rifon Sarkar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।