দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততম রাস্তা! হরিশ মুখার্জি রোডের নেপথ্যের মানুষকে চিনলই না বাঙালি

Harish Mukherjee Road: দক্ষিণ কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোড অথবা হরিশ মুখার্জি পার্ক যার নামে সেই হরিশ মুখার্জি কে?

Raktim Dey
৪ মিনিট
দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততম রাস্তা! হরিশ মুখার্জি রোডের নেপথ্যের মানুষকে চিনলই না বাঙালি

২০০১ সালে সরকারের তরফে ঘোষণা করা হলো, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নাম এইবার থেকে কলকাতা। কলকাতার নাম আবার কলকাতা হবে কীভাবে? আসলে কলকাতার নাম ইংরেজিতে হয়ে গিয়েছিল ক্যালকাটা। সৌজন্যে, প্রায় দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসন। এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ অথবা আনন্দ কোনওটাই বৃদ্ধি করতে পারেনি। বেশিরভাগ হিন্দীভাষীদের জন্য কলকাতা কলক্কাত্তাই থেকে গেল। বাঙালিরা তো এমনিতেই শহরটাকে কলকাতা বলেই ডাকে। তাদেরও সেইরকম খুব একটা মাথাব্যথা হলো না। নাম বদল অথবা নামের পুনঃনিয়োগ সংক্রান্ত প্রশ্ন না থাকলেও এই প্রশ্নটা থেকেই যায় যে কলকাতা শহরের নাম কলকাতা কেন হলো? যদিও বেশিরভাগ বাঙালির সেই ব্যাপারেও কোনও মাথা ব্যাথা নেই। কলকাতার নাম কলকাতা হলো কেন সেটা জেনে কী হবে? কলকাতার নামের উৎস জানলে কি পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, সহজে সরকারি চাকরি মিলবে, নাকি বাজারে সবজির দাম কমবে? কোনওটাই হবে না, উল্টে বেশিরভাগ মানুষের মতে সময় নষ্ট হবে। তাহলে শহরের নামের উৎস জেনে লাভ কী?পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী এই শহর বহু মানুষের বাসস্থান এবং কর্মক্ষেত্র হওয়ার পাশাপাশি বাঙালি তথা ভারতের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের সাক্ষী। তাই শহরের পরিচয় শুধু সাধারণ জ্ঞান নয় বরং বাঙালির অতীতকে জানার এক পথ। এই অতীতকে খুঁজে বের করে তাকে জানা এবং সেই অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার কারণ যে জাতি নিজের অতীতকে জানে না এবং তার থেকে শিক্ষা নেয় না সেই জাতির সঠিক মাত্রায় উন্নতি সম্ভব নয়।

কলকাতার ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা থেকেই সম্ভবত কলকাতার নামের উৎস সংক্রান্ত বিভিন্ন গল্প কলকাতার অলিগলিতে ঘোরাঘুরি করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত গল্প হলো এক ইংরেজ এবং চাষির গল্প। গল্প অনুসারে, এক ইংরেজ কলকাতায় ভ্রমণকালীন নদী থেকে জমির দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই এলাকার নাম কী? চাষি ইংরেজের ভাষা বুঝতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন যে ইংরেজ তাঁর জমির পাশে কেটে রাখা ঘাসের দিকে আঙুল করে কিছু জিজ্ঞাসা করেছে। তাই উত্তর দিয়েছিলেন 'কাল কাটা' অর্থাৎ কাল ঘাস কেটেছেন। সেই থেকে কলকাতা নাকি তার নাম পেয়েছিল। শুনতে হাস্যকর তো বটেই, এই গল্প থেকেই বোঝা যায় যে বাঙালি কতটা ইতিহাস বিমুখ। ইংরেজরা বাংলায় আসার বহু আগেই বিভিন্ন নথিতে অথবা রচনায় কলকাতার নাম পাওয়া যায় যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আইন-ই-আকবরি। এছাড়া কলকাতার আর্মেনিয়ান চার্চের কবরখানায় থাকা রেজা বিবির কবরে লেখা সময়কাল ইংরেজদের বাংলায় আগমনের অনেক আগের সময় নির্দেশ করে। নিজের ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই এই খোস গল্প মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব ছিল না। ইংরেজদের আগমনের পূর্বে থাকা কোনও এলাকার নাম ইংরেজদের দেওয়া হতেই পারে না। যেটা বাস্তবে সম্ভব তা হলো, সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতা নামের তিনটি বড় গ্রামকে একত্রিত করার পরে ইংরেজরা পুরো এলাকাটিকে কলকাতা বলে সম্বোধন করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাতিবাগানে কার হাতি ছিল, উল্টোডাঙা কেন উল্টো? কলকাতার এইসব অঞ্চলের নাম যেভাবে এসেছে

Hatibagan Ultodanga: কলকাতার এই পরিচিত জায়গাগুলোর নাম বহু মানুষের জানা থাকলেও সেগুলোর নামের সঙ্গে জড়িত অনেক গল্প আমাদের অজানা।

তাহলে কলকাতা নামের উৎস কী? কথিত আছে যে কলকাতার চারিদিকে বিভিন্ন খাল কাটা ছিল। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এলাকা দিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মানুষ জলপথে চলাচল করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতো। সেই খাল কাটা এলাকার নাম পরে হয়ে যায় কলকাতা। অপর এক কাহিনি অনুসারে, কলকাতার নাম আসলে কালীঘাট থেকে এসেছে। কালীর এলাকার আশেপাশের এলাকার নাম হয় কালীক্ষেত্র যা পরবর্তীকালে মানুষের কাছে কলকাতা নামে পরিচিতি পায়। এছাড়া বিভিন্ন কাহিনি অনুযায়ী কখনও বলা হয়, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর মাঝের কিলকিলা বলে এলাকা পরবর্তীকালে কলকাতা নাম পেয়েছে। আবার কখনও বলা হয় যে, দক্ষিণ ভারতীয় উপজাতি এখানে ঘাঁটি গেড়ে থাকার কারণে তাদের নাম থেকেই কলকাতা নিজের নাম পেয়েছে। যদিও এই উপজাতির বসবাসের এলাকা চিহ্নিত করা অথবা আদৌ তারা এখানে বসবাস করতো কিনা সেই বিষয়ে সংশয় রয়েছে। বাঙালি শহরের নাম কলকাতা নিয়েই খুশি, গর্বিত। বেশিরভাগেরই খুব একটা মাথাব্যাথা না থাকার কারণেই কলকাতার নামের সঠিক উৎসের এখনও খোঁজ চলছে।

বহু ক্ষেত্রে বইতে কোনও প্রশ্নের উত্তর পড়লেও পরীক্ষার পরে মানুষ নিজের জীবনের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর ভুলে যায়। দক্ষিণ কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোড অথবা হরিশ মুখার্জি পার্ক যার নামে সেই হরিশ মুখার্জি কে? শহরের নামের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস অথবা পরিচয় জুড়ে থাকতে পারে কিন্তু হরিশ মুখার্জির সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র কী? কে এই মানুষটি? হিন্দু প্যাট্রিয়ট নামে একটি খবরের কাগজ বের করতেন তিনি, আবার নিজেই সেই কাগজে লিখতেনও। লেখার বিষয় কি ছিল? নীল চাষিদের উপর ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লিখতেন হরিশ। ইংরেজরা তো সবার উপরেই অত্যাচার করত। এই ভদ্রলোক হঠাৎ নীল চাষিদের নিয়েই বা লিখতে গেলেন কেন? চাষিদের দিয়ে ধান, আখের বদলে জোর করে নীল চাষ করানো, চাষিরা চাষ করতে না চাইলে তাদের ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, বাড়ি ভাঙচুর করা, বাড়ির লোককে বন্দি করা এবং বহু ক্ষেত্রে প্রাণে মেরে ফেলা এবং কোনও সহৃদয় ইংরেজ অফিসার চাষিদের পক্ষে কথা বললে তার বদলি করে দেওয়া বিষয়ে কেনই বা লিখবেন না একজন সাংবাদিক?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তোপসে, ট্যাংরা, চিংড়ি অথবা বেলে, মাছ-ভাতের রসায়ন মিশে কলকাতার রাস্তাতেও

Old Kolkata Places Names: কলকাতার কিছু জায়গার নামের আড়ালে রয়েছে মাছের অনুষঙ্গ

নীল চাষিদের উপর অত্যাচার নিয়ে দীনবন্ধু মিত্র নীলদর্পণ নামে নাটক লিখেছিলেন, এই তথ্য মোটামুটি সকলেরই জানা সিলেবাসের সৌজন্যে। যেটা জানা নয় তা হলো, নীলদর্পণ প্রকাশের সময় নীল কমিশন চলছিল যেখানে হরিশ মুখার্জি সাক্ষী দিতে গিয়েছিলেন। মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা এই সাংবাদিক নিজের ক্ষমতায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন আর এই নীল চাষের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়ে প্রচুর টাকা অভাবী মানুষদের মধ্যে দানও করেছিলেন। আয়ের থেকে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি, ফলে সঞ্চয় ছিল না। পরিবারের জন্য অর্থ রেখে না যেতে পারলেও নীল চাষিদের অবস্থার ব্যাপারে তার চিন্তা ছিল বেশিই। ৩৭ বছর বয়সে বেদনাদায়ক মৃত্যুর আগে অবধি তিনি নীল চাষিদের উপর নেমে আসা ইংরেজ চাবুকের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। খুব স্বল্প পরিসরে হলেও ইংরেজ বিরোধিতা করে চাষিদের বিচার পাইয়ে দেওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তবে হয়তো শেষ অবধি লড়াই চালিয়ে না যেতে পারার দুঃখও ছিল কোথাও। এই মানুষটির কথা সিলেবাসে নেই, নেই চর্চাতেও। এই শহরে থাকা এবং আগত বহু মানুষ শুধু একটা রাস্তার নামে চেনেন এই বিখ্যাত মানুষকে। অস্তিত্ব বলতে আর আছেই বা কী, রাজধানীর একটা রাস্তা এবং একটা পার্ক ছাড়া।

তথ্য ঋণ : ডিসকভারিং কলকাতা, সেই সময় (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় )

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।