রাজ কার্য্যের নেপথ্য নায়কেরা —— ভারতীয় সিভিল সার্ভিস

By: Anasuya Sen

September 20, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপ যখন রেনেসাঁ এসেছিল,তার চালিকাশক্তি ছিল যুক্তিবিচার।এই যুক্তিবিচারের হাত ধরেই মুক্তমনা মানবসমাজ সভ্যতার সূর্য্যোদয় দেখেছিল | দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন যে ন্যায়পরায়ণতা ও নীতিজ্ঞানের চূড়ান্ত আদর্শের ভিত্তি বলতে আমরা যা বুঝি, তা উন্নত মানের বলিষ্ট যুক্তিবিচার ভিন্ন আর কিছু নয়।
অতএব প্রতি পদক্ষেপে বিশ্বজনীন নৈতিক বিধি-বিধানকে মান্যতা দিয়ে প্রতিটি কর্তব্য যুক্তিবিচার সহকারে পালন করতে হবে।আর এক বিখ্যাত পন্ডিত রেনে ডেকার্তের মত অনুযায়ী একজন ব্যক্তির মৰ্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব নির্ভর করে — তিনি কতটা বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আবেগশূন্য ভাবে যুক্তিবিচার করতে পারেন তার উপর | তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজপটভূমিতে আমলাতন্ত্র (Bureaucracy)-এর গুরুত্বের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন এবং তার ব্যাখ্যা করলেন |

প্রাক আধুনিক যুগে,সপ্তদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত, একজন দলপতি অথবা কিঞ্চিৎ উন্নত অবস্থার একজন স্থানীয় নৃপতি এবং আরো উন্নত অবস্থার একজন বংশানুক্রমিক রাজা, একটি অঞ্চল বা একটি রাজ্য শাসন করতেন ও সেই শাসনব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে চলত | পরবর্তীকালে মানুষের মধ্যে শিক্ষা,দীক্ষা ও চেতনার বিকাশ যত ছড়াল,তত ধীরে ধীরে কালক্রমে আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব হলো | পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা শাসন কাৰ্য শুরু হলো। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপলব্ধি করলেন যে দৈনন্দিন শাসনকাৰ্য পক্ষপাত-দোষ থেকে মুক্ত থাকা দরকার।নাগরিকের বর্ণ,শ্রেণী,গোষ্ঠী,লিঙ্গ, ভাষা, জন্মস্থান ইত্যাদির বিচার করে কারো প্রতি যেন অনুগ্রহ বা নিগ্রহ করা না হয় |এই পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে ম্যাক্স ওয়েবার,কর্তৃত্ব এবং কর্তৃপক্ষের তিন ধরনের শ্রেণী – বিভাগ করলেন ——– রীতিনীতি অনুসারে ১)বংশানুক্রমিক কর্তৃত্ব,২)ঈশ্বর প্রদত্ত (অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী কোনো ব্যক্তির) কর্তৃত্ব এবং ৩)বলিষ্ঠ যুক্তিবিচারের শক্তিযুক্ত আইনসিদ্ধ কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব অর্থাৎ আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) |

ম্যাক্স ওয়েবার বললেন যে এই আমলাতন্ত্রই হলো একটি রীতিসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান (Formal Organisation ) যার অনেকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে | যেমন নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও গুণমানের পরিচয় দিতে পারলে তবেই একজন ‘আমলা’ (Bureaucrat ) হিসাবে নির্বাচিত হবেন বা তার পদোন্নতি হবে | লিখিত নিয়মকানুন,পদ্ধতি ইত্যাদি নিষ্ঠার সঙ্গে পক্ষপাতশূন্যভাবে মান্য করেই তাদের নিয়োগ করা হবে বা পদোন্নতি দেওয়া হবে।এই আমলাদের মধ্যে পদমর্যাদার স্তরবিন্যাস থাকবে,যাতে উচ্চ পদাধিকারীরা নবীন পদাধিকারীদের কাজের পর্যালোচনা করতে পারেন, তাদের পথনির্দেশ দিতে পারেন এবং একইসঙ্গে নবীনদের গঠনমূলক মতামতগুলিকে গুরুত্ব সহকারে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারেন।আমলাদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্মভারের সুষম বন্টন থাকবে এবং দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার দিতে হবে।সবসময় ব্যক্তিগত খেয়াল খুশিকে অবদমিত রাখতে হবে এবং কার্যক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। আমলাদেরকে কর্মজীবনে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরনের দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিযুক্ত হয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়,বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিণত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

ম্যাক্স ওয়েবারের উল্লিখিত সিদ্ধান্তগুলির আলোকে দেখা প্রয়োজন আমাদের দেশ ভারতে আমলাতন্ত্র কতটা সাবলীলভাবে কাজ করতে পারে | আমাদের দেশে আমলাদের চাকরিতে নিয়োগের আগে ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (UPSC)প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্রীয় পরীক্ষা অথবা রাজ্যভিত্তিক পাবলিক সার্ভিস কমিশনের(PSC) প্রতিযোগিতামূলক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। Indian Administrative Service (IAS ) অফিসার বা রাজ্যস্তরের সিভিল সার্ভিস অফিসার (যেমন WBCS ) পদপ্রাপ্তির জন্য,কম করে চোদ্দ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরে একজন আমলা ডিরেক্টর পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পান।কম করে আঠারো বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরে তিনি ভারত সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারি (যুগ্ম সচিব ) পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পান | আর ভারত সরকারের সচিব পদে উন্নীত হওয়ার জন্য কমপক্ষে ৩২ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়।

ভারতের সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ১৯৪৯ সালের ১০ ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত Constituent Assembly-র সভায় সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সমর্থনে জোরালো বক্তব্য পেশ করেছিলেন।তিনি বলেছিলেন যে……..”দেশপ্রেম, বিশ্বস্ততা,যোগ্যতা, রাজানুগত্য,নিষ্ঠা ইত্যাদির মানদন্ডে বিচার করলে আমাদের দেশের সিভিল সার্ভেন্টদের কোনো বিকল্প নেই।তাঁরা এই গুণগুলির পরিচয় না দিলে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ত | তাঁরা আমাদের দেশের শাসনযন্ত্রের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে মর্যাদার দাবি রাখেন এবং তাঁরা বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে না কাজ করলে সমগ্র দেশে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো।যদি আপনারা চান যে সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস দক্ষতার সঙ্গে কাজ করুক,তাহলে তাঁদেরকে নির্ভয়ে মন খুলে মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ দিন।”

আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৭৪ বছর পূর্ণ হলো | আমাদের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য যে সমস্ত আমলা শাসনযন্ত্র পরিচালনা করছেন, তাঁদের সুষ্ঠ কার্যনির্বাহের স্বার্থে একাধারে দায়িত্ব এবং অন্যধারে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে দিতে হবে | নচেৎ দায়িত্ব বিহীন ক্ষমতা স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করবে | লর্ড একটন যথাযত ভাবেই বলেছেন —— ” Power corrupts and absolute power corrupts absolutely.” ঠিক একইভাবে ক্ষমতাবিহীন দায়িত্ব আমলাদের ওপর অর্পণ করলে দেশের উন্নতি ও প্রগতির কোনো লক্ষ্যই পূর্ণ হবে না,কোনো কর্মকাণ্ডই ফলপ্রসূ হবেনা।

সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া জনাদেশের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবেন ও দেশ শাসন করবেন, এটাই স্বাভাবিক আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোয়।জনপ্রতিনিধিরা সুচিন্তিত ভাবে আমলাদের যখন স্বাধীনভাবে ভিন্নমত ব্যক্ত করবেন তখন দেশের স্বার্থে তার প্রাপ্য মর্য্যাদা ও গুরুত্ব দিতে হবে | ভিন্নমত পোষণকারী আমলাকে কখনও বাধা-সৃষ্টিকারী হিসাবে দেখলে চলবে না |

আমরা যদি আমাদের আমলাতন্ত্রের Strength Weakness Opportunity Threat (SWOT ) Analysis করি তাহলে দেখব যে আমাদের সিভিল সার্ভিসের Strength (শক্তি) হলো উচ্চমানের যোগ্যতা ও গুণমানের ভিত্তিতে আমলাদের নিয়োগব্যাবস্থা, বিধিবদ্ধ নিয়মনীতির প্রতি নিষ্ঠা এবং আমলাতন্ত্রের স্থায়িত্ব।এর Weakness (দুর্বলতা)হলো লাল ফিতার ফাঁস এবং সেই কারণেই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে, সময়ের অপচয়।এর Opportunity (সুযোগ) হলো দেশকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সেবাদানের বিপুল অবকাশ।এর Threat (বিপদ) হলো দেশ পরিচালনায় অব্যবস্থা ও সমন্বয়ের অভাব।

বিগত ৭৪ বছর ধরে দেশের রাজকার্যের এই নেপথ্য-নায়কেরা যে দক্ষতা ও গুণমানের পরিচয় দিয়েছেন তার ভিত্তিতে আমাদের এই বিশ্বাস জন্মেছে যে………আমাদের সিভিল সার্ভিসের শক্তি যাবতীয় দুর্বলতাকে পরাস্ত করে সর্বাঙ্গীন উন্নতির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং সকল বিপদকে দূরীভূত করবে |

তথ্য সূত্র : সংবাদপত্র

More Articles

error: Content is protected !!