ভুলতে পারেননি নিজের প্রথম প্রেমিকাকে, এই শহরের নামে তাকে অমর করে গেলেন বিধান চন্দ্র রায়

By: Sourish Das

November 18, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

বিধানচন্দ্র রায়, বাংলার সবথেকে সফল মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায় বিধান রায়ের নাম থাকবেনা এটা কার্যত হতেই পারেনা। বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তার অবদান এতটাই বেশি ছিল যে তাকে অনেকে বাংলার সবথেকে ভালো মুখ্যমন্ত্রীর তকমাও দিয়ে থাকেন। তবে শুধুই কি প্রশাসনিক কাজে, চিকিৎসক হিসাবেও তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। যেমন ছিল তার রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা, তেমনই ছিল রোগ নির্বাচন করার ক্ষমতাও। অনেকে তাকে স্বয়ং ধন্বন্তরির সঙ্গেও তুলনা করতেন। দুর্ধর্ষ ক্লিনিকাল আইয়ের জোরে তিনি বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন তার জীবদ্দশায়। বিলেত থেকে এফআরসিএস পাশ করার পরে তিনি বিলেতে গিয়ে কিন্তু প্র্যাকটিস করেন নি। বরং সেই সময় যখন সকলে ভারত থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় নিজেদের ডাক্তারি করা শুরু করেছিলেন, সেই সময় দেশের মানুষের চিকিৎসা করার জন্য বাংলায় ফিরে এসেছিলেন ডঃ বিধান চন্দ্র রায়।

সেখান থেকেই প্রথমে কলকাতার মহানাগরিক এবং পরবর্তীতে বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি তার কার্যকালে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের একাধিক উন্নয়ন করেছিলেন। সল্টলেক, লেকটাউনের মত বেশ কিছু এলাকার রূপকার ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু এসবকে ছাপিয়ে গিয়েও ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় এর আরো একটি গল্প কার্যত অমর হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রথিতযশা ডাক্তার নীলরতন সরকার এর কন্যার সাথে বিধানচন্দ্র রায়ের অপূর্ণ প্রেমের কাহিনী আজকেও বাঙালির অজানা। তার সাথে সাথেই অজানা ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের তার অপূর্ণ প্রেমের প্রতি আনুগত্যের কথাও। 

শাহরুখ খানের সিনেমা দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গেতে যেরকম রাগী বাবার ভূমিকায় ছিলেন অমরেশ পুরি, সেরকমই এই প্রেম কাহিনীতেও রাগী বাবার ভূমিকায় ডক্টর নীলরতন সরকার। কিন্তু সিনেমায় যেরকম ভাবে সিমরণকে ‘যা সিমরান যা জি লে আপনি জিন্দেগি’ বলেছিলেন, অমরিশ পুরি, এই গল্পে সেরকমটা হলনা। বরং অপূর্ণই থেকে গেলো তাদের দুজনের রোমান্টিক সম্পর্কটি। এরকম একটি গল্প সকলেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে দাড়ালো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে, আর কেনো হবে না, এরকম সরস গল্পের খোঁজই তো করে সকলে। সিনেমা থেকে শুরু করে খবরের কাগজ সব জায়গায় একাধিক লেখাও হলো এই গল্পটা নিয়ে। বিগত কয়েক দশকে অনেকেই এই গল্প নিয়ে একাধিক লেখালেখি করে ফেলেছেন। 

কিন্তু বিধানচন্দ্র রায় নিজের পুরনো প্রেমকে নিজে থেকে কখনো আলাদা করেননি। বরং তার নামেই তিনি একটি আস্ত শহরের নামকরণ করেছিলেন যা আজকে পরিচিত কল্যাণী নগরী হিসেবে। নদীয়া জেলার এই ছোট্ট শহরটি কলকাতা থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এই শহরটি কলকাতা থেকে অনেক বেশি নবীন। ডঃ বিধান চন্দ্র রায় এই শহরটি তৈরি করেছিলেন নিজের কার্যকালের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই শহরটি রুজভেল্ট টাউন হিসেবে খ্যাত ছিল। পরবর্তীতে এই শহরটিকে নিজের প্রেমিকার নামে নামাঙ্কিত করেছিলেন ডঃ বিধান চন্দ্র রায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে জাপানি আক্রমণে রীতিমতো বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু জায়গায় জাপানি আধিপত্য শুরু হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল শুরু হয়েছিল জাপানি উপনিবেশ তৈরি করার কাজ। সেই সময়ে ভারতের দিকে হাত বাড়াতে শুরু করেছিল জাপান। পাশাপাশি, জাপানি আধিপত্যে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল ভারতের ব্রিটিশ শাসন। তার উপরে যখন বার্মা অঞ্চলে জাপানি উপনিবেশ তৈরি করার কাজ শুরু হচ্ছে সেই সময় আরো বেশি চাপে পড়ে গেল ব্রিটিশরা। তার সঙ্গে জাপানের সহায়তায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ধীরে ধীরে মনিপুর এবং কোহিমার বেশ কিছু জায়গায় আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করেছিলেন। সালটা তখন ১৯৪৪, ভারতীয়দের মনে স্বাধীনতার আগুন তখন দাবানলের মত জ্বলতে শুরু করেছে। 

সেই সময় ব্রিটিশ রাজ কে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশাল সংখ্যায় আমেরিকান সৈন্য পাঠানো হলো ভারতে। বাংলার কিছু জায়গায় তারা নিজেদের ঘাঁটি গেড়ে নিল জাপানি আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য। এমনিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জাপান। তাই জাপানের বিরুদ্ধে আক্রমণের গড়ে তোলার জন্য ব্রিটিশকে পর্যন্ত সাহায্য করতে রাজি ছিল আমেরিকানরা। কিন্তু এই আমেরিকান সৈন্যদের থাকার জায়গা লাগবে। তাদের থাকার জন্যই গঙ্গা নদীর ধারে নদীয়া জেলার একটি বিশেষ জায়গা চিহ্নিত করা হলো এবং সেখানে একটি বিশাল বড় এয়ারবেস তৈরি করা হলো। সেই অঞ্চলের ৪৫টি গ্রামের সাধারণ বাসিন্দাদের সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল আমেরিকানরা। তৈরি হলো একটি নতুন এয়ারবেস এবং একটি নতুন গ্যারিসন টাউন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এর নাম অনুসারে ওই জায়গাটির নাম দেওয়া হল রুজভেল্ট টাউন ওরফে রুজভেল্ট নগর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরেও ওই জায়গাটিতে তেমন লোক থাকতেন না। ধীরে ধীরে রুজভেল্ট টাউন পুরো সবুজে ভরে গেল। ওই শহরের আশেপাশে তৈরি করা হলো একটি নতুন রেল স্টেশন, যার নাম দেওয়া হল চাঁদমারি হল্ট স্টেশন। অত্যন্ত দূরদর্শী একজন মুখ্যমন্ত্রী এবং একজন দুর্ধর্ষ ডাক্তার ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতের স্বাধীনতার পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু রিফিউজি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসলেন। কিন্তু তাদের থাকার জায়গা দেওয়া একটা বিশাল বড় সমস্যার কাজ হয়ে দাঁড়ালো। প্রয়োজন হয়ে পড়ল নগর তৈরি করার। বেশকিছু স্যাটেলাইট টাউনশিপ তৈরি করা হলো কলকাতার আশেপাশে। জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করলো। তাই আরো বেশি শহর তৈরি করার প্রয়োজন পড়ল। ঠিক সেই সময় শহরের সমস্যাকে দূর করার জন্য টাউন তৈরি করা শুরু করলেন বিধানচন্দ্র রায়।

দুর্গাপুর, সল্টলেক, শকুন্তলা পার্ক এর মত একাধিক টাউন তৈরি করা হলো কলকাতার আশেপাশে বেশ কিছু জায়গায়। সেরকম ভাবেই নদীয়ার রুজভেল্ট টাউন নতুন করে তৈরি করলেন ডঃ বিধান চন্দ্র রায়। ট্রেন স্টেশন থেকে শুরু করে বাজার, সুন্দর ঘর বাড়ি, জলের ব্যবস্থা, সবকিছুই করলেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। সবশেষে রুজভেল্ট টাউন এর নতুন নামকরণ করলেন বিধানচন্দ্র রায় নিজেই। আর এই নামটি তিনি রাখলেন তার অপূর্ণ ভালোবাসা কল্যাণীর নামে। তবে এখানে কল্যাণী নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন চিহ্ন রয়ে গিয়েছে। মনে করা হয়, ডাক্তার নীলরতন সরকার এর কন্যা কল্যাণীর সঙ্গে নাকি প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল বিধানচন্দ্র রায়ের।

একদিন ডঃ বিধান চন্দ্র রায় ডক্টর সরকারের কাছে তার মেয়ের হাত চাইতে গেলে তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন ডঃ নীলরতন সরকার। তিনি ডঃ বিধান চন্দ্র রায়কে অপমান করে বলেন, তার মেয়ের প্রত্যেক দিনের মেকআপ এর খরচ নাকি ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মাসিক আয় দ্বিগুণ। এই কথাটা শুনে অত্যন্ত অপমানিত হয়ে সেখান থেকে চলে যান ডঃ বিধান চন্দ্র রায়। কিন্তু কখনোই তিনি তার প্রথম ভালোবাসাকে ভুলতে পারেননি। তাই, কল্যাণী শহরের নামেই তার ভালোবাসাকে অমর করে রেখে যান ডঃ বিধান চন্দ্র রায়।

যদিও কল্যাণী এবং ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের এই সম্পর্ক নিয়ে আরো অনেক ধরনের ধারণা রয়েছে। অনেকে আবার বলেন, কল্যাণী নাকি রক্ত নীলরতন সরকার এর মেয়েই নন। এটা শুধুমাত্র একটি নাম, এবং এর সঙ্গে কোনো রকম কোনো ভালোবাসার সম্পর্কের কোনো ব্যাপার নেই। বিধানচন্দ্র রায় এ শহরটি নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন বলেই নাকি তার সঙ্গে কল্যাণীর নামটি জুড়ে দেওয়া হয় অত্যন্ত ইচ্ছাকৃত ভাবেই। পুরনো কিছু নথিপত্র ঘাটলে এখনো দেখা যায় বিধানচন্দ্র রায় নিজেই বলেছিলেন, কল্যাণী নামটির সঙ্গে তার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু, যদি তার কোন সম্পর্ক নাই থাকে, তাহলে তিনি চিরকুমার কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে বিধানচন্দ্র রায় নিজেই একবার বলেছিলেন, তার বিবাহ হয়েছে এবং তার স্ত্রী একমাত্র তার কাজ।

তথ্যসূত্র –

  • https://www.getbengal.com/details/kalyani-the-town-that-carries-bidhan-roys-scars-of-unrequited-love

More Articles

error: Content is protected !!