চোরাচালানের নতুন পথ ………. ‌পণ্যবিনিময়

By: Anasuya Sen

September 20, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

“ধরা যাক কিছু নেশা করার ট্যাবলেট আর সর্দি-কাশির সিরাপের একটা বড় মোড়ক বা প্যাকেট (Consignment) আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এর বিনিময়ে যিনি ঐ প্যাকেট (Consignment পাঠিয়েছেন (সরবরাহকারী বা Supplier) তিনি পাচ্ছেন একটি মাদক-দ্রব্যের Consignment | সেই সরবরাহকারী এবার সেই মাদক – দ্রব্য বা ড্রাগস্ নিজের চেনা জানা নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত কলকাতা, বিহার এবং এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বিক্রীর জন্য | এই বিক্রীর বিনিময়ে বিক্রেতা কিন্তু ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ না করে, গ্রহণ করছেন অন্য কোনও বিশেষ দ্রব্য যা আবার বাংলাদেশে চোরাচালান করা হচ্ছে | এইভাবেই চোরাচালান ব্যবস্থা কাজ করছে | তার মানে এই নয় যে কখনও কোনও অবস্থাতেই বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে দেশি বা বিদেশি মুদ্রা বা অর্থ গ্রহণ করছেন না | কিন্তু সেই অর্থের লেনদেনের পরিমান অনেক কম | কারণ অর্থের লেনদেনের পরিমান যত কম হবে, তত পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মীদের হাতে পাকড়াও হবার সম্ভবনা কম হবে”। মালদা শহরে বসে অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণারত কয়েকজন তরুনের তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে এইসব ফন্দি ফিকিরের কথা। কিভাবে চোরা চালানকারীরা এক সুচতুর ও নতুন উপায়ে সীমান্তরক্ষীদের চোখে ঠুলি পরিয়ে অবাধে আন্তর্জাতিক স্তরে চোরাচালান কারবার চালিয়ে যাচ্ছে,তার কথা।

আমাদের উত্তরবঙ্গ এবং আমাদের উত্তরপূর্বাঞ্চল জুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা রয়েছে যেগুলি বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, মায়ানমার এবং চীনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমানা ভাগ করে নেয়। এইসব অঞ্চলে সংঘবদ্ধভাবে অর্থাৎ পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রেখে চলে এমন চোরাচালানকারীরা বিভিন্ন দ্রব্যের চোরাচালান ব্যবসা বেআইনীভাবে রমরমিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে।‌ এই ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা অধিক থেকে অধিকতর মাত্রায় পণ্য-দ্রব্য বিনিময় প্রথার আশ্রয় নিয়েছে | কারণ Consignment হাতে পাওয়ার পর টাকাপয়সার লেনদেন দিনে দিনে অত্যন্ত কঠিন ও বিপদজনক হয়ে উঠেছে বহু কারণে।

পণ্য-দ্রব্য বিনিময় প্রথা বহু প্রাচীন এবং আইনসঙ্গত। পুরাকালে কালে যখন বিভিন্ন দেশে মুদ্রা ব্যবস্থা চালু ছিল না, তখন এই পণ্য-দ্রব্য বিনিময় প্রথাই চালু ছিল। আমাদের দেশেও কিছু বছর আগে পর্য্যন্ত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পণ্য-দ্রব্য বিনিময় প্রথাই চালু ছিল | অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা তাদের উৎপাদিত শষ্যের বিনিময় সংসারের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করত। যেমন ধান, গম, যব ইত্যাদির বিনিময়ে ডাল, তেল, নুন, মশলাপাতি, বস্ত্র ইত্যাদি প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করত।এই ব্যাবস্থার নাম Bater System | এই ব্যবস্থার সুবিধেও যত ছিল, অসুবিধেও তত | এই ব্যবস্থা ব্যক্তি মানুষের এবং সমাজের সব প্রয়োজন মেটাতে অসমর্থ ছিল। তাই দেশে দেশে মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন হলো ; এবং মুদ্রা দেশে দেশে আইনগত স্বীকৃতি লাভ করল এবং সেই সব দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের অর্থকরী (সরকারের) সমর্থন ও সুরক্ষা লাভ করল | সেই মুদ্রার নাম হলো Legal Tender Money .

এই Legal Tender Money —-কে (আমাদের দেশে রুপিয়া বা টাকা) এড়িয়ে যেখানে ব্যাপক ভাবে মূল্যবান দ্রব্যের এবং বিশেষ ভাবে আপত্তিকর দ্রব্যের বেআইনি কারবার চলছে, সেখানে দেশের প্রশাসনের নজরদারি যে শুরু হবে, সে তো স্বাভাবিক | কিছুদিন আগে মালদা জেলায় কর্মরত বর্ডার সিকিওরিটি ফোর্স (BSF ) -এর অফিসারদের হাতে ড্রাগস চোরাচালানের একটি Consignment আটক হয় এবং গ্রেফতার হয় ঐ চোরাচালানে যুক্ত কয়েকটি লোক | তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে BSF আরেকটি কুখ্যাত দলের সন্ধান পায়, যারা বেআইনি ভাবে বাংলাদেশে আগ্নেয়াস্ত্র এবং কাশির সিরাপ (নেশার দ্রব্য) চালানের কাজ করত | BSF এই দলটিকেও গ্রেফতার করে | এইসব কুকর্মে জড়িত লোকদের জেরা করতে করতে BSF জানতে পারে যে তারা এখন নতুন কায়দায় চোরাচালান করছে | আগেকার মতো মাল ডেলিভারি করার বিনিময় টাকার বান্ডিলের লেনদেন হচ্ছে না | মালের বদলে মাল নেওয়া হচ্ছে | এমনটাই জানা গেল BSF -এর এক সিনিয়ার অফিসারের কাছ থেকে |

যে সমস্ত মালের চোরাচালান হয় তারমধ্যে অন্যতম হলো মাদকদ্রব্য (Narcotics) , আগ্নেয়াস্ত্র,গবাদিপশু,পশুদেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ, সোনা(সোনারবার ও বিস্কুট),জাল টাকা,নেশা করার ট্যাবলেট ও কাশির সিরাপ | ঐ মালদা জেলাতেই কর্মরত একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাবাহিনীর এক অফিসার বললেন —– “চোরাচালানকারীদের জেরা – জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে এটা প্রকাশ্যে এসেছে যে তারা এক-একটি Consignment -এর দাম মেটাতে টাকা পয়সার লেনদেনের পরিবর্তে এখন পণ্য-দ্রব্য বিনিময়ের পথ ধরেছে | এরফলে এসবের ওপর নজরদারি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে” |

উত্তরবঙ্গ থেকে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে পর্য্যন্ত ২৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা পাহারা দেয় BSF | এছাড়াও যে সকল দেশের সঙ্গে ভারতকে সীমান্তরেখা ভাগ করে নিতে হয় সেগুলি হলো বাংলাদেশ, নেপাল, মায়ানমার এবং ভূটান | এই সুদীর্ঘ সীমান্তরেখা বরাবর অসংখ্য জায়গায় ফাঁক-ফোকর ও চোরাপথ আছে | তার ওপর সীমান্ত সন্নিহিত অঞ্চলগুলি ঘনবসতিপূর্ণ | জনতার ভিড়ে মিশে গিয়ে নিত্য নতুন ফন্দি এঁটে এখানে সুরক্ষা বানিহীর চোখে ধূলো দেওয়া খুব সহজ। এ সমস্ত কারণে এসব অঞ্চল চোরাচালানকারীদের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে আর রাজ্য ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাবাহিনীর কর্মীদের কাছে চ্যালেঞ্জের জায়গা হয়ে উঠেছে |
উত্তরবঙ্গ এবং দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সন্নিহিত প্রতিবেশী দেশগুলির চোরাচালানকারীদের মধ্যে কারবার এখন এতটাই সুসংগঠিত যে সেটি পুরোসস্তুর Network -এর চেহারা নিয়েছে | চোরাচালানের মালপত্রের পরিধি যত বাড়ছে তত বাড়ছে Network -এর কলেবর |

এপ্রসঙ্গে BSF- এর এক কর্মী বললেন —– “আগে ভারত – বাংলাদেশ সীমান্তে কেবলমাত্র গবাদিপশু আর জাল নোটের চোরাচালান হতো | সম্প্রতি চালানদ্রব্যের ঝুড়ি মস্ত বড় হয়ে গেছে আর তারমধ্যে এসে ঢুকেছে সোনা থেকে শুরু করে ইয়াবা ট্যাবলেট, কাশির সিরাপ, আগ্নেয়াস্ত্র এবং অবশই মাদক দ্রব্য | করোনা রোগের প্রাদুর্ভাবে যবে থেকে লকডাউন হলো,তবে থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। সীমান্তপথে দেশগুলির মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে যে বৈধ বাণিজ্য চলত তা ক্ষতিগ্রস্থ হলো।সেকারণেই বোধয় চোরাচালানের Network দেশে-দেশে গজিয়ে উঠল আর চালান দ্রব্যের ঝুড়ি ফুলে – ফেঁপে উঠল “|

পারস্পরিক আলোচলার সময় রাজ্য ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর প্রতিনিধিরা স্বীকার করেছেন যে চোরা চালানকারীরা টাকার লেনদেন এড়িয়ে পণ্য – দ্রব্য বিনিময়ের যে নতুন পথ ধরেছে তা তাদের মতো গোয়েন্দাদের বিস্মিত করেছে। শুধু তাই নয়, এরফলে বিভিন্ন সীমান্তপথে অবৈধ কারবার হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেয়েছে |

আমাদের দেশের সব ব্যাঙ্ক এখন কম্পিউটার চালিত,তারা যবে থেকে Core Banking Solution (CBS) Platform …..এ এসেছে তবে থেকে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্ত থেকে যে কোনও ব্যাঙ্কে টাকা পাঠানো খুব সহজ হয়ে গেছে | প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য ব্যাঙ্কগুলিতে নথিভুক্ত (Recorded) হয়ে যায় তাই National Electronic Fund Transfer (NEFT) বা Real Time Gross Settlement (RTGS)…এর মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন করলে যে কোনও সময় ধরা পরে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা, সেকথা অবৈধ ব্যাবসায়ীরা ভাল রকম জানে | এখনকার দিনে হাওয়ালা পথেও মোটা অঙ্কের টাকা পাঠানো রীতিমতো মুশকিলের ব্যাপার। আর সে সব কারণেই গা বাঁচিয়ে চলার তাগিদে চোরাচালানকারীরা পণ্য – দ্রব্য বিনিময় প্রথাকে বেঁচে নিয়েছে | বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কারবারিদের কাছে এই নতুন প্রথাই নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে, কারণ তাতে কারেন্সি লেনদেনের সঙ্গে জড়িত কোনও উদ্বেগ নেই | যেইমাত্র চূড়ান্ত গ্রহীতার কাছে consignment গিয়ে পৌঁছায়, সেই ব্যক্তি তখন স্থানীয় দেশের কারেন্সিতে মালটি বিক্রি করে লেভার টাকা তুলে নিতে পারেন।এমনটাই বক্তব্য অর্থনীতির গবেষকদের |

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাবাহিনীর এক অফিসার জানালেন…….. “এই পণ্য – দ্রব্য বিনিময় প্রথারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যেমন মালের সঠিক দাম নির্ধারণ করা বেশ অসুবিধার ব্যাপার | চোরা চালানকারীরা সেই অসুবিধাও কাটিয়ে ওঠার একটা উপায় উদ্ভাবন করে ফেলেছে | সীমান্ত পথে অবৈধ ভাবে চালান হওয়া প্রতিটি মালের জন্য একটি নির্দিষ্ট দাম ধার্য্য করা থাকে | এক একটি Consingment জায়গা মতো পৌঁছানো মাত্র, যে মাল পাঠিয়েছে আর যে মালটি পেল তাদের পরস্পরের মধ্যে মেসেজের আদান-প্রদান হয়ে যায় মোবাইল ফোনে | আর সঙ্গে সঙ্গে মালের পরিমান অনুযায়ী দাম নির্ধারণের কাজও সারা হয়ে যায় “|

তথ্য সূত্র : সংবাদপত্র

More Articles