‘গানের ওপারে’: বিশ্বসঙ্গীত এবং কিছু ট্র্যাজিক ইতিহাস

By: Anirban Bhattacharyya

October 28, 2021

Share

চিত্রঋণ: গুগল

‘Time can bring you down, time can bend your knees …’ সময়। অসুখ। ওষুধ। মনে পড়ছে উইম ওয়েন্ডার্সের ‘Wings of Desire’ ছবিটির কথা। ‘Time can heal disease, but what if time itself a disease?’। একেবারেই অন্য একটি বিষয়ের প্রসঙ্গে সময়কে নিয়ে এক ধরনের টানাটানি করছি, প্রিয় পাঠক। সময়কে ধরতে চাইছি। বিশ্বসঙ্গীত। লিরিকে, সুর-প্রস্তুতিতে সময়ের বিনির্মাণ। ব্যক্তিগত ট্রাজেডি। মৃত্যু। ঘর থেকে, মনন থেকে সময়কে, ঘটনাকে, স্মৃতিকে কলমে, সিন্থেসাইজারে তুলে আনা। গানের মাদকতায় স্টেজের পর স্টেজ মাতাল হচ্ছেন শ্রোতা, বিভৎস এক ইউফোরিয়ায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গান- অথচ ভেতরে ডুকরে কাঁদছেন সিঙ্গার-সংরাইটাররা। কে জানে, ক’জন জানে সেই সব গল্প?

ওই যে বললাম, টাইম ক্যান বেন্ড ইওর নিস। ‘Tears in Heaven’। এরিক ক্ল্যাপটন। যাঁরা বিশ্বসঙ্গীতের সিলেবাসে ততটা ঠোঁটস্থ নন, তাঁদের দিকে তাকিয়েই একটু লিরিকের দিকে চোখ বোলানো যাক।

‘Would you know my name?
If I saw you in heaven
Would it be the same?
If I saw you in heaven
I must be strong
And carry on
‘Cause I know I don’t belong
Here in heaven’

১৯৯১ সালের ‘Rush’ ছবির সাউন্ডট্র্যাকে গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। কো-রাইটার উইল জেনিংসের সঙ্গে কিংবদন্তির পর্যায়ে চলে যাওয়া এই গানটির রচনার ইতিহাসে পরে আসছি। তার আগে বলে নেওয়া ভালো, ফিজিকালি এবং ডিজিটালি আঠাশ লক্ষ কপি বিক্রি হওয়া গানটি টানা ছাব্বিশ সপ্তাহ জুড়ে Billboards Hot 100 তালিকায় ছিল। বার্কশায়ারের এম টিভি আনপ্লাগড অনুষ্ঠানে ক্ল্যাপটনের কন্ঠে প্রথম শোনা গিয়েছিল টিয়ার্স ইন হেভেন‌। কিন্তু ইতিহাস? কান্না? স্বর্গ? আর এখানেই ট্র্যাজেডি।

নব্বইয়ের অগস্টে এরিকের প্রিয় বন্ধু এবং সহগায়ক স্টিভি রে ভনের আকস্মিক মারণ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা। তবু ক্ল্যাপটন সামলে ছিলেন। গানের ভেতর ছিলেন। একানব্বইয়ের মার্চের পর টানা ছ’মাস পুরোপুরি সঙ্গীতহীন এক জীবন। কারণ, সেই বীভৎস এক মার্চ! ২০ মার্চ, ১৯৯১। নিউইয়র্কে মায়ের বান্ধবীর ফ্ল্যাটের তিপ্পান্ন তলার জানলা থেকে নিচে পড়ে থেঁতলে গেল সাড়ে চার বছরের ছোট্ট এক বালকের শরীর। কোনর। কোনর ক্ল্যাপটন। বাবা এরিক পাগল হয়ে গেলেন। টানা ছ’মাস ধরে গানের পৃথিবীর বাইরে থাকলেন। সুর, শব্দ, আলো সহ্য হত না। স্টিভির ধাক্কার পর আবার এতটা বিষাদ, বিভীষিকা শিল্পীর প্রাপ্য ছিল না। সাত মাসের শুরুতেই ফিরে এসে লিখলেন সেইসব মুহূর্তকথা। উড ইউ নো মাই নেম? স্বর্গে যদি দেখা হয় দুজনের, কোনর চিনতে পারবে বাবাকে? জড়িয়ে ধরবে? কিন্তু কতক্ষণ? এরিক জানেন তাঁকে এগোতে হবে‌, বেঁচে থাকতে হবে। শিল্পের জন্য। তবু, একটা অপরাধবোধ। দ্বন্দ্ব। বিকজ আই ক্যান্ট স্টে ইন হেভেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় রোলিং স্টোনস পত্রিকার বিচারে স্থান ৩৬২। পাগল শ্রোতাকূল। অথচ অনেক দূরে গিটারের স্ট্রিমিং-এ অশান্ত এক পিতার কান্না। সলিলোকি। ‘I want to write a song about my boy …’

সন্তানশোক থেকে নিখাদ এক প্রেমের মুহূর্ত। সাঙ্গীতিক ইতিহাস যার সাক্ষ্য। বিশ্বখ্যাত ফোক গায়ক জেমস টেলর এবং তাঁর ‘Fire and Rain’। Billboards Hot 100 তালিকায় সেবছরে তৃতীয় স্থান। সর্বকালের‌ শ্রেষ্ঠ ৫০০টি গানের তালিকায় রোলিং স্টোনস পত্রিকার বিচারে স্থান ২২৭। শতকের শ্রেষ্ঠ ১০০টি গানের ভেতর ব্রডকাস্ট মিউজিকের বিচারে স্থান ৮২। এই ‘ফায়ার অ্যান্ড রেইন’ লেখার পেছনে ড্রাগ, ডিপ্রেশন এবং প্রিয়জনের মৃত্যু। টেলর লিখছেন –

‘Just yesterday mornin’, they let me know you were gone
Suzanne, the plans they made put an end to you
I walked out this morning and I wrote down this song
I just can’t remember who to send it to
I’ve seen fire and I’ve seen rain
I’ve seen sunny days that I thought would never end
I’ve seen lonely times when I could not find a friend
But I always thought that I’d see you again’

লন্ডনে রেকর্ডিং-এর সময়ে ছোটবেলার বান্ধবী, প্রেমিকা সুজান স্নের-এর আত্মহত্যা। জেমসের বন্ধু রিচার্ড কোরে প্রথম বড় ব্রেকের আগে বন্ধুর মন ভাঙতে চাইলেন না‌। খবর দেওয়া হল ছ’মাস পর। স্বভাবতই ভাঙন। ড্রাগ। ডিপ্রেশন। পাশাপাশি প্রথম ব্যান্ড ‘ফ্লাইং মেশিন’ তৈরির আগেই ভেঙে যাওয়ার তীব্র অবসাদ। এবং সুজানের না থাকা। ১৯৬৮ সালে স্টকব্রিজ শহরের এক রিহ্যাব থেকেই ফিরে আসার রাস্তায় হাঁটলেন শিল্পী। তৈরি হল গান। স্মৃতিতে সুজান, ব্যান্ডের স্বপ্ন, সেইসব দিনগুলো। ‘সুজান দ্য প্ল্যানস দে মেড পুট অ্যান এন্ড টু ইউ’। অথবা, ‘সুইট ড্রিমস অ্যান্ড ফ্লাইং মেশিনস ইন পিসেস অন দ্য গ্রাউন্ড’। খ্যাতির বাইরে ছোট্ট একটা ঘরের ভেতর শিল্পীর মনন। দীর্ঘদিনের কথা বেরিয়ে আসা‌। কয়েক বছর পর জেমস একটি সাক্ষাৎকারে গানটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেষ করেন- ‘It was actually a relief, like a laugh or a sigh …’

দীর্ঘশ্বাসের আরেক গল্প। গায়ক নিল ইয়ং-এর ১৯৭২ সালের বিখ্যাত গান ‘The Needle and the Damage Done’। স্মৃতিতে বন্ধু ড্যানি হুইটেন এবং আরও অনেকে।

‘I caught you knockin’ at my cellar door
I love you, baby, can I have some more?
Ooh, ooh, the damage done
I hit the city and I lost my band
I watched the needle take another man
Gone, gone, the damage done …’

রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য ড্রাগের সাহায্য এবং তা থেকে একটা সময়ে বীভৎস নেশা। ব্যান্ড ‘ক্রেজি হর্স’ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল ড্যানিকে। সরালেন প্রিয় বন্ধু নিল নিজেই, কিছুটা বাধ্য হয়েই‌। কিছুদিনের ব্যবধান। পুরনো সম্পর্কের বরফ গলা। নিজের ‘Harvest’ অ্যালবামের জন্য ‘দ্য স্ট্রে গেটর্স’ দলকে সঙ্গ দিতে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে সান ফ্রান্সিসকোয় নিজের বাড়িতে ড্যানিকে ডেকে আনলেন নিল। আর চরমতম ট্র্যাজেডি সেখানেই। ড্যানির নেশার এতটা করুণ পরিণতি নিল জানতেন না। দীর্ঘদিনের চেষ্টার পরও রিহার্স করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হলেন ড্যানি। ২০ নভেম্বর, ১৯৭২।

দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ৫০ মার্কিন ডলারের অর্থ এবং লস অ্যাঞ্জেলসগামী প্লেনের টিকিট ধরিয়ে ড্যানিকে ছেড়ে দিলেন নিল। আর সেই রাতেই অতিরিক্ত ডায়াজেপাম সেবনে ড্যানির অকালমৃত্যু। অপরাধবোধ থেকে কোনওদিনই আর বেরোতে পারলেন না নিল। তৈরি হল ‘দ্য নিডল অ্যান্ড দ্য ড্যামেজ ডান’। লিরিকে ড্যানির মুখ। নিল লিখলেন – ‘I sing the song because I love that man’। পাশাপাশি এলো মাদকসেবনের বিভৎসতার কথাও। ‘I’ve seen the needle and the damage done/ A little part of it in everyone’। এবং যেকথা শুরুতেই বলেছিলাম, ড্যানি হুইটেন এবং আরও অনেকে। ‘ডিকেড’ পত্রিকায় গানটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এই আরও অনেকের কথা ভেবেই নিল লিখেছিলেন – ‘I am not a preacher, but drugs killed a lot of great man.’

বিয়োগব্যথার ভেতর জড়িয়ে থাকে বিশ্বাসভঙ্গের গল্পও। দ্য টেম্পটেশনস ব্যান্ডের বিখ্যাত সিঙ্গল ‘I Wish It Would Rain’ এবং তার ফলো-আপ ‘I Could Never Love Another (After Loving You)’। গীতিকার মোটাউন রেকর্ডসের স্বল্পখ্যাত স্টাফরাইটার রজার পেনজাবোন। স্ত্রী চলে গেলেন অন্য পুরুষের সঙ্গে। অবিশ্বাস্য এক কষ্টে রজার বৃষ্টি চাইলেন। কারণ তাঁর চোখের জল ঢাকতে হবে‌। কারণ, ‘a man ain’t supposed to cry’। ১৯৬৮-তে বিলবোর্ডসের সেরা একশোতে চতুর্থ স্থানে থাকা ‘আই উইশ …’ যখন উদ্দাম কন্ঠে গাইছেন টেম্পটেশন্সের ডেভিড রাফিন, তখন অনেকটা দূরে নিজের ঘরে স্ত্রী’র ছবির পাশে একা রজার। ‘Sunshine, blue skies, please go away/ My girl has found another, and gone away’। ‘আই উইশ …’ মুক্তি পেল সাতষট্টির জানুয়ারিতে‌। দিন সাতেক আগে নিউ ইয়র্স ইভের রাতে আত্মঘাতী হলেন রজার। কী ভাবছিলেন শেষ সময়ে? সেইসব লিরিক? ‘লেট ইট রেইন, রেইন, রেইন…’?

মার্কিন ব্যান্ড ইলস-এর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ইলেকট্রিক শক ব্লুজ’-এর গান ‘Elizabath on the Bathroom Floor’। সিঙ্গার সংরাইটার মার্ক এভারেটের স্মৃতিতে চলে এলো ১৯৯৬ সালে আত্মঘাতী বোন এলিজাবেথের ডায়েরির পাতা, লাং ক্যান্সারে মা’র মৃত্যু এবং কৈশোরে বাথরুমে হৃদরোগে প্রয়াত বাবার মৃতদেহ আবিষ্কার করা কিশোর মার্ক নিজে। কান্নার ভাষা। ‘ওয়েকিং আপ ইজ হার্ডার হোয়েন ইউ ওয়ানা ডাই…’

প্রিন্সের ১৯৯৬ সালের অ্যালবাম ‘Emancipation’-এর বিখ্যাত সিঙ্গল ‘Sex in the Summer’। গানটির রেকর্ডিংয়ের সময়ে প্রিন্সের স্ত্রী একটি শিশুর জন্ম দেন, নাম দেন বয় গ্রেগরি। আল্ট্রাসাউন্ডে গ্রেগরির হৃৎস্পন্দন রেকর্ড করে রেখেছিলেন প্রিন্স। মাত্র সাত দিন পৃথিবীর আলো দেখে রেয়ার জেনেটিক ডিজিজ Pfeiffer’s Syndrome-এ চলে যায় গ্রেগরি, আর তার সেই হার্টবিট ‘সেক্স ইন দ্য সামার’ গানের ব্যাকগ্রাউন্ডে রাখা হয়। খুবই হালকা একটা টোনে…

এবং, লেড জেপেলিন ব্যান্ড আর তাঁদের স্যাড টিউন ‘অল মাই লাভ’। ভোকালিস্ট রবার্ট প্ল্যান্ট ১৯৭৭-এ ট্যুরে থাকার সময়ে পাঁচ বছরের ছেলে কারাককে একটি মারণ স্টমাক ভাইরাস ফ্লুতে অকালে হারান। ব্যথা থেকে ফিরে এসে লেখেন – ‘Should I fall out of love, my fire in the light/ To chase a feather in the wind/ Within the glow that weaves a cloak of delight/ There moves a thread that has no end.’

শেষটুকুতে ক্ল্যাপটনেই ফিরে আসি‌। টিয়ার্স ইন হেভেনের সাত বছর পর ১৯৯৮-এ ক্ল্যাপটনের ‘Circus Left Town’ গানে কোনর আবার ফিরে এসেছিল। ছেলেকে হারানোর আগে ওর সঙ্গে সময় কাটানো শেষ রাতের কথা মনে করছিলেন ক্ল্যাপটন। একটি সার্কাসে কোনরকে নিয়ে যাওয়া। জোকারকে দেখে, ওর হাতে একটা ছুরি দেখে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে। এসব সাধারণ মুহূর্তই মৃত্যুর পর বড়ই দ্যোতক এবং প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল এরিকের। 

‘Little man with his eyes on fire and his smile so bright
In his hands are the toys you gave to fill his heart with delight
And in the ring stands a circus clown holding up a knife
What you see and what you will hear
Will last you for the rest of your life’

এবং, এই প্রাসঙ্গিকতার সূত্রেই অদ্ভুতরকমের দ্যোতক ‘সার্কাস’ শব্দটিও। যেন কোনর এবং তার সাড়ে চার বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনকাল এরিকের কাছেও এক সার্কাস। 

‘বাট দ্য সার্কাস লেফট দ্য টাউন…’

তথ্যসূত্রঃ

১. http://www.vh1.com/news/54922/classic-songs-with-tragic-backstories/
২.https://www.npr.org/2000/06/26/1075908/npr-100-fire-and-rain
৩. https://www.songfacts.com/facts/prince/sex-in-the-summer

More Articles

error: Content is protected !!