নগরপথের উজ্জ্বলতম পথিক ভাস্কর চক্রবর্তী

Poet Bhaskar Chakraborty: আমাদের অকালপ্রয়াত বন্ধু কবি প্রবীর দাশগুপ্ত একবার বলেছিল, ‘বাংলা কবিতায় ভাস্কর চক্রবর্তীর অনশ্বর অবদান হল, একটা রঙ, একটা সিপিয়া টোন। ...’

AM

চিড়িয়াখানা আর জীবনানন্দকে নিয়ে এত কথা বললাম কিন্তু মাল্যবানের কথা বাদ রইল। সেজন্য এবার গোড়াতেই মনে করাব ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের কথা। সে উপন্যাসে দীর্ঘ বর্ণনা আছে, মাল্যবান, উৎপলা আর মনু চিড়িয়াখানায় অনেকখানি সময় কাটিয়েছিল। যদিও সেই ভ্রমণ-দর্শন মোটেই সুখপ্রদ ছিল না। অনেক টানাপড়েনে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল সেই সফর। বাঘ, সিংহ, বাঁদর, সিন্ধুঘোটক- এইসব প্রাণীদের নিয়ে কথা হয়েছিল। মতান্তর আর মনান্তর হয়েছিল। মাল্যবান আর উৎপলার। যাবার পথে রূঢ়, নোংরা বাস্তবের ছবি ফুটে উঠেছিল খিদিরপুর বাজারের পথবর্ণনায়। রামছাগলের বোঁটকা গন্ধ, পেচ্ছাপের গন্ধ আর খাসি কাটার বীভৎস দৃশ্যে ছটফট করে উঠেছিল মনু।

সে বোঝেনি, শহর এরকমই। বিশেষত শহর যেখানে জনসংখ্যার চাপে ঘিঞ্জি, শহর যেখানে পেট চালাবার দায়ে মরিয়া। এসব লক্ষ্য করার সেরা জায়গা হলো বাজার। বিশেষত যাকে চলতি ভাষায় বলে আঁশবাজার। অর্থাৎ যেখানে মাছ-মাংস ইত্যাদি নিত্য কাটা, সাজানো এবং বিক্রি চলে। অনেক সংখ্যক দোকান, অনেক সংখ্যক ক্রেতা। এমনিতেই মাছের নিজস্ব একটা গন্ধ আছে। পাঁঠা এবং মুরগিরও আছে। বাজারের অপরিচ্ছন্নতা। আর দুর্গন্ধের সেটাই একটা কারণ। কাটা ছাগল, কাটা মোরগের পা এবং পালক, মাছের রক্তমাখা গাদা পেটি দৃশ্যতও খুব মনোরম নয়। এর মধ্যে একটা হিংস্রতা আছে। এমনকী আনাজ কিংবা তরিতরকারির ক্ষেত্রেও বঁটি, ছুরি, ছাল ছাড়ানো বা কাটারির ঘা দেওয়া আছে। বিভিন্ন শাকপাতা ডাঁই হয়ে পচে তার গন্ধও বেরোয়। তার সঙ্গে মেশে ধোঁয়া, নর্দমা আর ঘামের গন্ধ। হিংস্রতা আর রুক্ষতাও মেশে। স্নিগ্ধ আমেজের চটকা ভেঙে যায়। শহর যবে থেকে শুরু হয়েছিল, তবে থেকেই তার জেদ হলো ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ ছোট ছোট গ্রামগুলির বিপরীতে একটা জনপদ গড়ে তোলা। প্রকৃতির উল্টো কিছু। দশাসই পেশিবহুল ক্ষমতার দর্পে ডগমগ কিছু। কৃত্রিম এক এলাকা। ময়দানব বা আধুনিক নগরস্থপতিদের মস্তিষ্কপ্রসূত অতিকায় এক জানোয়ার যেন। কলের ধোঁয়া, মিলের ধোঁয়া, কারখানার ভোঁ, গাড়ির হর্ন, অ্যাসফল্টের রাস্তা, আকাশচুম্বী বহুতল, ঘিঞ্জি বস্তি, নর্দমা, নিষ্প্রাণ ব্রিজ, ওভারব্রিজ আর ট্রাম। ট্রামের তার। তার পাশেই এখন শপিং মল আর গণিকালয় আর রেস্টুরেন্ট আর স্টেডিয়াম আর স্কুল-কলেজ আর মাটির তলায় দ্রুতগামী মেট্রো। গ্রামের সঙ্গে প্রথমে ছিল দূরত্ব, তারপর ভিন্নতার সমান্তরাল রেখা, শেষে বিচ্ছেদ। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার এক নাছোড় স্বপ্ন দেখেছিল ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’ বলা এক তরুণ প্রজন্ম। ইতিহাসের পরিহাসে আজ বিশ্বজুড়ে, দেশজুড়ে শহর দিয়ে গ্রাম ঘেরার সমস্ত পরিকল্পনাটাই বাস্তবায়িত। শহর এবং গ্রামের মধ্যে কোনও দ্বৈরথ নেই। শহরের শ্রেষ্ঠত্ব যেন সম্পূর্ণ স্বীকৃত হয়ে গেছে। শহরের ভাষা, সংস্কৃতি, আদবকায়দা অনুকরণ করছে গ্রামদেশ।

আরও পড়ুন- জীবনানন্দ তৃতীয় নয়নে দেখেন বিশ্বযুদ্ধোত্তর কলকাতা

শহরে জন্মানোর সুবাদে আমি কলকাতার নানা প্রান্তের বাজার দেখেছি। আবার একথাও সত্যি, সেসব বাজারের বিবর্তনও দেখেছি। ক্রমশ লক্ষ্য করি, স্থানাভাবে এবং পাশ্চাত্যের প্রভাবে বাজারের অবয়বটাই পাল্টে গেছে। আগে বাজার ছিল বহুলাংশে অনুভূমিক বা হরাইজেন্টাল, এখন বাজারের নতুন আকৃতি হলো উলম্ব বা ভার্টিকাল। ‘বাজার’ শব্দটাও অবশ্য ক্রমে বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। ‘বাজার’ নামের সংযোগে গড়ে উঠছে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। ‘মেট্রো’ ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি – আরও হরেক কিসিমের বিকিকিনির পসরা সাজানো দোকান। বস্তুত, দোকান শব্দটার দৃশ্যরূপই ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। আমার বাড়ির পাশে ছাতুবাবু বাজার (প্রতিষ্ঠা ১৮৮১) কিংবা একটু দূরে মানিকতলা বাজার অথবা হাতিবাগান বাজার যে আকার-প্রকারে তৈরি, এমনকী দক্ষিণ প্রান্তের গড়িয়াহাট বাজারও, তার পাশাপাশি তুলনা করুন সাউথ সিটি মল বা কোয়েস্ট মল-এর বিপণি পরিকল্পনা। দিল্লিতে দেখেছি বেশ কিছুকাল আগে থেকেই বহুতল অত্যাধুনিক বাজারে এমনকী মাছ-মাংসও বিক্রি হয় নয়া কায়দায়। কাঁচা মাছ-মাংস বিকিকিনির চেনা ছবি সেখানে একেবারেই নেই। মণিপুরের ইম্ফলে পনেরো বছর আগে দেখেছি খাঁচায় ভরা খরগোশ এবং হাঁসও ! কথাটা হলো বদলে যাচ্ছে শহর। বিবৃতি হিসেবে এ খুব নতুন কথাও নয়।
জীবনের অন্তিম পর্বে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘ছেলেবেলা’ (১৯৪০), সেখানে লেখেন

‘আমরা যখন ছোটো ছিলুম তখন সন্ধ্যাবেলার কলকাতা শহর এখনকার মতো এত বেশি সজাগ ছিল না’।

কত রকম স্মৃতিচিত্র সেখানে, পশ্চিম কলকাতা আর প্রদীপের আলোয় নিঝুম কলকাতা শেষ বয়সে তার চোখেই এক অবাস্তব কাল যেন! লিখতে লিখতে মনে পড়ল সত্যজিৎ রায়ের ‘যখন ছোটো ছিলাম’ বইয়ের একটা অংশের কথা, যেখানে তিনি বালিগঞ্জের সুইনহো স্ট্রিটের বর্ণনা দিচ্ছেন। সত্যজিৎ সেখানে জুডো শিখতে যেতেন তাকাগাকি নামের এক প্রশিক্ষকের আখড়ায়। সত্যজিতের কলমে –

‘আমাদের বালিগঞ্জে আর ১৯৩৪ এর বালিগঞ্জে যে কত তফাৎ সেটা যে না দেখেছে তার পক্ষে কল্পনা করা কঠিন। রাসবিহারি এভিনিউ দিয়ে কিছুদূর গিয়ে মহানির্বাণ মঠ ছাড়াবার পর পাকা বাড়ি প্রায় চোখেই পড়ে না, আর রাস্তার দু' পাশে আম জাম কাঁঠাল আর ঝোপঝাড় মিলিয়ে প্রায় পাড়াগাঁয়ের চেহারা!’

আরও আগের কলকাতার বিবরণ আছে রাজনারায়ণ বসুর ‘সেকাল আর একাল’ কিংবা ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কলিকাতায় চলাফেরা’ বইয়ে। উদ্ধৃতি বাড়াচ্ছি না। কলকাতা শহর প্রত্যেক দশকে একটু একটু করে পাল্টাচ্ছে। আমার আশ্চর্য লাগে গত বিশ-পঁচিশ বছরে কলকাতা পাল্টাল  প্রায় হুড়মুড় করে, একশো বছরে যেমন বদল এসেছিল অতীত সময়ে।

লম্বায় আড়ে কলকাতার বহর চোখের সামনে বাড়তে থাকে। লাফিয়ে লাফিয়ে। এখন মেট্রোর দিকে তাকালেও সেকথা বোঝা যায়, নোয়াপাড়া থেকে কবি সুভাষ। আবার অন্যদিকে বাইপাসের মাথা বরাবর সে চলেছে আরও দক্ষিণে। নানা কাজের সূত্রে আমাকে যেতে হয়েছে নিউটাউন রাজারহাট, আবার অন্যদিকে গড়িয়া, নাকতলা, বেহালা, কখনও বজবজ, কখনও রাঘবপুর। কখনও বিরাটি। নতুন নতুন লোকালয় নতুন নতুন নগরায়ন, নতুন নতুন এলাকার বাস্তবতা। আমার ছেলেবেলার চেনা কলকাতার পরিসর এখন অতিকায় চেহারা নিয়েছে। বেড়েছে বহুতল। ৪২ তলা, ২২ তলা বা ১৮ তলা চতুর্দিকে। অপরিকল্পিত নগর, অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা। নিউটাউনের দিকে অনেক এলাকায় চাষ-আবাদ হতে দেখেছি কিছুদিন আগেও। নিষ্ঠুর শহর আর তার আগ্রাসনে সেসব টিকবে না।

আরও পড়ুন- আলিপুর চিড়িয়াখানায় দুপুর কাটাতেন জীবনানন্দ

পুরনো বাড়ি ভেঙে সাবেক বনেদি এলাকায় যথেচ্ছ উঠছে ফ্ল্যাটবাড়ি। যে কোনও রাস্তাকে আমরা প্রকৃতপক্ষে মনে রাখি তার ঘরবাড়ি দোকান বারান্দার পারম্পর্যে। সেই পারম্পর্য যখন মেলে না, তখনই অচেনা ঠেকে শহর। এই আলোচনার সময়, হে পাঠক, আবহসঙ্গীত হিসেবে চালাতে হবে, ‘শাপমোচন’ ছবির কালজয়ী গান ‘শোনো বন্ধু শোনো প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’ এবং ‘হংসরাজ’ ছবির ‘শহরটার এই গোলকধাঁধায় আঁধার হল মন’ গান দু'টি। বলতে বলতে আমার মনে পড়ল, ভাস্কর দা, কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার বরানগর বাজারে অথবা তাঁর বাড়ির চিলেকোঠায় দিনগুলি, রাতগুলি। অত্যন্ত সুপুরুষ, লম্বা সুগঠিত স্বাস্থ্যের ভাস্করদা ছিলেন আড্ডাবাজ আর সংবেদনশীল নরম মনের মানুষ। মেজাজে যেদিন তাঁকে পাওয়া যেত, রাস্তার ধারের সেই আড্ডার ঝাঁপিগুলো যেটাকে তিনি বলতেন ‘গ্যালারি’ – একেবারে জমজমাট হয়ে উঠত। অনেকসময় মন খারাপ থাকত তাঁর। চুপ করে যেতেন। বুঝতাম, মানুষটির বাঁচা, আদ্যন্ত স্নায়ুনির্ভর।

ভাস্কর চক্রবর্তীর কথা কলকাতা শহরের প্রসঙ্গে বারবার টেনে আনছি কেন? আমার মতে, তাঁর মতো শহরের, কলকাতার প্রেমিক এবং সম্পূর্ণ নাগরিক মনের কবি দ্বিতীয় কেউ নেই। একটা তীব্র চিহ্ন তৈরি করেছিলেন নগরানুষঙ্গের, নগরচর্যার দিক থেকে অবশ্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে – কিন্তু তার ধারাবাহিক অভিমুখ আমরা পরবর্তীকালে খুব বেশি দেখতে পাই না। আবছা পূর্বসূরি হয়তো তিনি কিন্তু নগরায়নের উজ্জ্বলতম পথিক, আমার চোখে, ভাস্কর চক্রবর্তী। আশ্চর্য তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল, বুক কাঁপিয়ে দেওয়া দৃশ্যরূপ অভিজ্ঞতা আর তিক্ততায় তিনি আঁকড়ে ধরেছেন আমাদের এই শহর কলকাতাকে। আমাদের অকালপ্রয়াত বন্ধু কবি প্রবীর দাশগুপ্ত একবার বলেছিল,

‘বাংলা কবিতায় ভাস্কর চক্রবর্তীর অনশ্বর অবদান হল, একটা রঙ, একটা সিপিয়া টোন। ...’

সেই কবে থেকে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি বিড়বিড় করতাম ভাস্করদার কাব্য পঙক্তি –

‘আকাশ সামান্য লালচে। কিছু নয়। কলকাতার কয়েক লক্ষের/ অতিরিক্ত একটা লোক/ হারালো, হারিয়ে গেল শুধু’। (একমিনিট নীরবতা)

কিংবা,

‘সেইটুকুই আমার কথা/ কুয়াশাভর্তি শহরে যা হারিয়ে গেছে’। (আত্মার রঙিন ছবি)

আর বুক মোচড় দেওয়া সেই আর্তনাদ –

‘এবার কলকাতা ছেড়ে চলে যাব অন্য এক শান্ত কলকাতায়/ মিসেস ভাণ্ডারকর, কী বলেন আপনি?’ (জিরাফের ভাষা/৪৩)

আরও কত আশ্চর্য ইশারা !

(চলবে)

More Articles