রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ || পারমাণিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা থাকছে?

Sindhu Som
৩ মিনিট
রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ ||  পারমাণিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা থাকছে?

যুদ্ধ এবং পারমাণবিক শক্তি–একত্রে এই দুইয়ের প্রতি মানুষের একটা বিতৃষ্ণা রয়েছে। গত শতাব্দীর হিরোসিমা নাগাসাকি সমস্ত বিশ্বের যৌথ স্মৃতিতে এখনও দগদগে। এরই মধ্যে নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। সবথেকে বড় প্রশ্ন পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার রাশিয়া করবে কিনা? আরো একবার কি এর ভয়াবহ ফল দেখবে মানব সভ্যতা? এই আশঙ্কা কুরে কুরে খাচ্ছে বিশ্বের মানুষকে। রাশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক কি আগেপিছু কিছু না ভেবেই এই অস্ত্র ব্যবহার করবেন? ইউক্রেন প্রসঙ্গে পুতিনের বক্তব্যে থাকা কিছু প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত এই আশঙ্কায় আরো ধুয়ো দিয়েছে।

ইউক্রেন আক্রমণের দিন কতক আগেই রাশিয়া এবং বেলারুশ কিছু পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিল। যুদ্ধ ঘোষণার সময়েও পুতিন রাশিয়াকে পৃথিবীর পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন দেশগুলির মধ্যে অন্যতম বলেছিলেন বেশ জোর দিয়েই। যদিও সে ভাষণে মনে হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র রাশিয়া কেবলমাত্র আত্মরক্ষার্থেই ব্যবহার করবে। সরাসরি ইউরোপীয় দেশগুলি বা আমেরিকা যদি রাশিয়া আক্রমণ করে, তবেই পারমাণবিক শক্তির পথ বেছে নেবে তারা। কিন্তু বর্তমানে পুতিন এও জানিয়েছেন ইউক্রেন হামলায় যে সব শক্তি সরাসরি বাধা সৃষ্টি করবে তাদের অবস্থা এমন করে ছাড়া হবে যার নজির ইতিহাসেও দুষ্প্রাপ্য। এছাড়াও ২১ ফেব্রুয়ারি সম্প্রচারে পুতিন অভিযোগ আনেন ইউক্রেনের বিরুদ্ধেও–ইউক্রেনের শীর্ষ নেতৃত্বও পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র নাকি তৈরি রেখেছে। যা সর্বৈব মিথ্যা। এ নিয়ে ফের উদ্বেগ বাড়ে ২৭ ফেব্রুয়ারির পর। সেদিন পুতিন ঘোষণা করেন রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারকারী সেনাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে তাদের প্রয়োজন হতে পারে।

যদিও রাশিয়া জানিয়েছে নেটোর পদস্থ আধিকারিকেরা রাশিয়ার দিকে যে বয়ান ছুঁড়ে দিচ্ছিল তার জবাবেই এই হুঁশিয়ারি। সন্দেহ করা হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শ্লথ গতি এবং বিভিন্ন দেশগুলির জারি করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় মানসিকভাবে খানিকটা বিপর্যস্ত রাশিয়া। ব্রিটেনের সুরক্ষাসচিব বেন ওয়ালেস পুতিনের আচরণকে ‘চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা' বলে আখ্যা দিয়েছেন। সত্যিই কি তাই? কেবল ফাঁপা হুমকি? নাকি এ নিয়ে সত্যি সত্যি আতঙ্কিত হওয়ার অবকাশ আছে? বিশেষত যুদ্ধে পরাজিত হলে রাশিয়া কি পারমাণবিক অস্ত্রকেই হাতের পাঁচ হিসেবে বেছে নেবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খানিক পাওয়া যাবে রাশিয়ার সামরিক কৌশলটিতেই। এ পর্যন্ত রাশিয়ার অবস্থান লক্ষ্য করে বিশেষজ্ঞরা কিছু আনুমানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সামরিক ক্ষেত্রটিতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কৌশল এবং উপকৌশলকে প্রাথমিকভাবে আলাদা করে দেখছেন। পারমাণবিক অস্ত্র কৌশলের দুটি প্রধান গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমত, হাতের পাঁচ হিসেবে। রাশিয়া অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়লে বাঁচার শেষ উপায় হিসাবে তারা এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। অথবা পারমাণবিক হামলা করে রাশিয়াকে শেষ করে দিতে পারে এমন দেশকে নিষ্ক্রিয় করার জন্যেও তারা হামলা চালাতে পারে। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক হামলার হুমকি রাশিয়াকে একটি নিরাপদ যুদ্ধের অবকাশ দেয়। যাতে বাইরের কোনও শক্তি যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়াকে বাধা না দিতে পারে–তা নিশ্চিত করে। অপরদিকে উপকৌশল পদ্ধতির অস্ত্র ব্যবহার রাশিয়ান সামরিক শক্তির আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রটিকে আরো মজবুত করে। বিশেষত ১৯৯০ থেকে ২০০০–এ পর্যায়ে এই বিশেষ পদ্ধতির সাহায্যেই মসকৌ সামরিক শক্তির পরিকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠে। কিছু রাশিয়ান কৌশলবিদের মতে সীমিত পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এর একচুল এদিক ওদিক হলেই নেটোর যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হত। এবং একত্রিত ভাবে এই দেশগুলির শক্তি অবশ্যই রাশিয়ার থেকে বেশি। তাতে ইউক্রেন জোটেরই সুবিধা হত আখেরে। বর্তমানে এই নিয়ে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদল মনে করছেন উপকৌশলগত পদ্ধতিতে রাশিয়া পারমাণবিক হামলা করতে পারে যুদ্ধে শীঘ্র জয়লাভের জন্য।

যদিও এই ধরনের চিন্তাভাবনা অত্যন্ত যুক্তিহীন। কারণ রাশিয়ার বক্তব্যে কোথাও সামরিক শক্তি এই কৌশলগত অবস্থানে যেতে পারে তার আভাস নেই। মূলত দুটি ভুল অনুমানের উপর এই জাতীয় সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে রয়েছে, যে রাশিয়ার মূল সামরিক শক্তি অত্যন্ত দুর্বল, তাই তাকে পারমাণবিক শক্তির সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এককালে সত্যিই বেশ দুর্বল থাকলেও বর্তমানে রাশিয়ার সামরিক শক্তি মোটেও দুর্বল নয়। এবং দ্বিতীয়ত সরাসরি বাকি দেশগুলির উপর পারমাণবিক আক্রমণের তেমন কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকেই, কিন্তু যদি বাঁচার আর পথ না থাকে তবে এই পারমাণবিক অস্ত্রে ভরপুর পৃথিবীতে সরাসরি পারমাণবিক আক্রমণ হবে না—এও আকাশ কুসুম চিন্তামাত্র।

পারমাণবিক হামলার জুজু দেখিয়ে পশ্চিমী দেশগুলিকে দূরে রাখতে চাইছে রাশিয়া যুদ্ধের শুরু দিন থেকেই। বর্তমানে পশ্চিমী দেশগুলির সবথেকে বড় হাতিয়ার হল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এরও কিছু বিপজ্জনক দিক রয়েছে। যাবতীয় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে যদি রাশিয়ার জাতীয় অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে রাশিয়ার অভিজাত বর্গ ইউক্রেনের দখল নিতে আরও মরিয়া হয়ে উঠবে। এই অবস্থায় ইউক্রেনের ওপর সীমিত পারমাণবিক আক্রমণের আশঙ্কাও আরো বাড়বে। এই জন্যই যাবতীয় রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের উপর হওয়াই বাঞ্ছনীয়, রাশিয়ার জাতীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে নয়। তবে পরিস্থিতি দিনদিন আরও ঘোরালো হয়ে চলেছে। আমেরিকার আধিকারিকেরা সতর্ক করেছেন, প্রয়োজন হলে রাশিয়া শুধু পারমাণবিক নয়, জৈবিক অস্ত্রও ব্যবহার করতে পারে। যুদ্ধজয়ের জন্য রাশিয়া যে কী পদক্ষেপ নেবে তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।