সে রান্না মানুষকে নিয়ে গিয়েছে জন্মান্তরের পারে...

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
সে রান্না মানুষকে নিয়ে গিয়েছে জন্মান্তরের পারে...

পৌষের রোদ্দুরে যারা গা ভাসিয়েছে তারা জানে, এ রোদেরও একখানা গন্ধ আছে। অন্তত কেক, রামবল আর ইহুদি বেকারির ওভেন ফেরতা গন্ধের পরেও খানিক খানিক গন্ধ উপচে যেতে চায়। যেতে পারেও। শহরতলি থেকে গাঁ-গঞ্জ পেরিয়ে সে গন্ধ মানুষকে নিয়ে যায় কোন সে দিকশূন্যপুরে। কমলালেবু আর বাঁধাকপির গন্ধে মোড়া চড়ুইভাতি খানিক খানিক জানে এসব। সেসব দিনে নদীর পাড়ে পাড়ে, কাঁদড়ের ধারে ইঁটপাতা উনোনে ধোঁয়া ওড়ানো রান্না চাপে। সে রান্নায় কেই বা তেল নুন লকড়ির হিসেব করেছে! সে রান্না তো কেবলই মানুষকে নিয়ে গিয়েছে জন্মান্তরের পারে, কোন সে ফেলে আসা সময়ের দরবারে। এমনটাই ঘটে চলেছে সময়ে সময়ে।

assdffgghh

পৌষের রোদে পিঠ পেতে দিয়ে মানুষ যখন আঙুল দিয়ে আলগোছে গরম খিচুড়ি নেড়ে চেড়ে মুখে তোলে তখন তার আপিস আদালতের জোব্বাখানা ওই দূর সর্ষেক্ষেতের ওপারে হাঁটা লাগায়। এসব নিয়েই একদিন পৌষালি রোদ আরও খানিক দক্ষিণে হেলে পড়বে এমনটাই ভাবা গেছিল। মানুষ যা ভাবে তার সবটা তো হয় না! হতেও নেই বোধহয়। এমন দিনে তাই মানুষের খামারবাড়ি শ্রম আর সময়ের হিসেবে ডুবে থাকে। তার যতই ইচ্ছে করুক ওই বাউণ্ডুলের জোব্বাখানা গায়ে চাপিয়ে সর্ষেক্ষেতের ওপারে হারিয়ে যেতে, সে তা পারে না। পারবেই বা কেমন করে! যার এখনও ধান ঝরানো শেষ হয়নি সে কেমন করে বেহিসেবির মতো কমলালেবু খেতে পারে! নবান্ন ফুরোনো মানুষের এখন বচ্ছরকার হিসেবখানা বুঝে নিতে হবে না! কেউ কেউ দুপুর থাকতে তাই ধান ভিজোতে লাগে।যখন জলে ডুবে এই ধান খানিক নরম হবে, তখন জল ঝরিয়ে মিলে দিয়ে আসার তোড়জোড় শুরু। কে আর ভেবেছিল টাইম কলের লাইন, কন্ট্রোলের লাইনের পরে চিঁড়ে মুড়ি করাতেও লাইন পড়বে এমন করে! চাল নুনিয়ে রেখেছে যারা তাদের তাই মুড়ি পেতে কর গুনে সময়ের হিসেব করতে হয় আকছার। ঘরে ঘরে ঢেঁকি আর কই!

এই সিরিজের প্রথম লেখা পড়ুন-মুগপুলি আর গোকুল পিঠে যেন সময়গাড়ি, কে বলে রান্নার ভূগোল নেই!

তবু যাদের আছে, ওই সংক্রান্তির আগে আগে লেপেপুঁছে ঢেকিশালের কলি ফেরায় তারা। চিঁড়ে হয়, চাল গুড়ি হয়, ঢেঁকিছাটা চালও হয় খানিক খানিক। সেসব চালে অল্প অল্প আঁশ লেগে থাকে। ঝেড়েঝুড়ে নেওয়া খুদ কুড়ো দিয়ে জাউ ভাত রানতে জানে যারা, তারা যত্ন করে তুলে রাখে সেসব। সকাল সকাল শিম, বেগুন, পালঙের ডগা, কুমড়োর জালি সব দিয়ে খুদের ভাত রেঁধে দেয় মা-ঠাকুমা। একেকদিন ভাত ফুটে উঠলে খোকন এসে মায়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়ায়। মায়ে কয়, 'কী হইসে রে! পোলায় কয়, মা, আসের ডিম আছেনি! আছেই তো নীল গলা হাঁসডায় তো ডিম দিতাসে ক'দিন ভর।' খোকনের মায় এবারে পাশের চুলায় হাঁসের ডিম সেদ্ধ করতে দেন। কানা উঁচু থালায় ফ্যানাভাত ঢেলে দিতে দিতে ডাবু হাতা দিয়েই নেড়ে চেড়ে দেন খোকনের মা। খোকন কয়, 'মা? ডিম দিবা না?' মায়ে হাসে। মায়ের হাসিখান তখন কমলা কুসুমের মতো আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে চায়। গাঢ় রঙের কুসুম আর সর্ষের তেলের গন্ধে খোকন তখন ভাত মুখে তোলে মাথা নীচু করে। ওই দূরে বিনয়কাকাদের উঠোনে খেঁজুর রস জ্বাল দিচ্ছে ভ্যাদন। সেসব লীনতাপের গন্ধে ভরে উঠেছে এই পাড়া । উবু হয়ে বসে দু-একজন খরিদ্দার বিড়ি টানতে টানতে গল্প জুড়েছে দেদার। খোকনের অবশ্যি এসব দেখার সময় নেই। সে কেবল কমলা কুসুমের ডিমখানায় মন ডুবিয়ে পৌষালি রোদের উত্তাপ জড়িয়ে নিতে চাইছে গায়ে মাথায়, আপাদমস্তক দিয়ে। একখানা মেটে উঠোনে ঠিক যখন এসব ঘটে চলেছে নিরন্তর! খোকনের দিদি তখন দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছে এক মনে। ওর কেঁপে কেঁপে ওঠা কেশচূর্ণকে উত্তুরে হাওয়া ছুঁয়ে যেতে চাইছে বার বার। কিন্তু তা বললে কি চলে! খোকনের দিদি দুলে দুলে পড়ছে, ‘ভারতের কটি উচ্চ ফলনশীল ধানের নাম হল – জয়া, রত্না, পঙ্কজ বিজয়া’…।

এসব শুনতে শুনতে খোকনের মা ভাবছেন, আহা লাল আউষের ফ্যানা ভাতে কী সোয়াদ! ছেলেবেলার ওম তখন ওর মন গড়িয়ে কমলা কুসুমের আস্ত একখানা রোদ্দুর হয়ে উঠতে চাইছে। এই নিত্যদিনের সংসার ফেলে ওর মনখানা তখন কেবলই চলে যেতে চাইছে কীর্তনখোলার পাড়ে। কে বলে, অপিস পালানো মানুষেরই কেবল নিরুদ্দেশ হতে ইচ্ছে করে! খোকনের মায়ে তাই মনে মনে চুপটি করে মাটির উঠোনে পাটি পেতে বসে। ওই এক ধারে রাঙা মামীমা শীতের বেগুন দিয়ে খয়রা মাছের মেথি পোড়া ঝোল রাঁনছেন ভারী যত্ন করে। সব রান্নায় কি আর তেল মশল্লা লাগে! ওই যতন খানিই সব। রূপশাল চালের ভাত দিয়ে এমন মাছের ঝোল মরিচ ডলে মেখে নিতে যে সুখ, সে – যে খায় সেই জানে। খোকনের মায়ের আর সে জীবন থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না। তবু কী আর করবে বলো খোকনের মা! তার এখন গুষ্টির কাজ পড়ে আছে এদিক সেদিকে। একবার উঠে গিয়ে আতপ চাল করার ধানকটা পা দিয়ে নেড়ে দিয়ে আসেন তিনি। বাকি ধান এবারে দুসেদ্ধ করবেন কিনা সে নিয়ে কেবলই ভাবছেন আর ভাবছেন। খোকনের বাপে সকাল সকাল চাট্টি ভাত খেয়ে মাঠে গেছেন পেঁয়াজ বসাতে। আর কদিন পরে কেমন গোছা ভরে পেঁয়াজ শাক হবে! খোকন পেঁয়াজ শাক দিয়ে নিহাড়ি মাছের ভাপা খেতে ভারী ভালোবাসে। এসব ভাবতে ভাবতে খোকনের মা হাতের কাজ সারেন। তার হাতের কাজ সারতে সারতে রোদ্দুর আরও খানিক নরম হয়ে আসে। সেই বেলা গড়ালে হেঁশেলের কাজ মিটিয়ে তখন মাদুর পেতে বসবে খোকনের মা। খোকন আর খোকনের দিদি তখন পা মেলে বসে কমলালেবু খাবে আর টুল টুল করে বীচি ফেলবে এদিক সেদিকে। এমন হতে হতে হঠাৎ খোকন দৌড়ে এসে মায়ের গলাখানা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়বে। বলবে, 'মা! কমলার বীচি খাইলে কী হয়?' পৌষের নরম রোদের মতো আদরে ভরে উঠতে উঠতে মা তখন হাসবেন। বলবেন, 'ঠিক কইতে পারি না। তর মাথা দিয়া বোদয় আস্ত একখান গাছ অইব। আসের ডিমের মতো কমলা কমলা লেবুর গাছ। বুজছস!'

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।