অভিমানে আজীবন বিয়েই করলেন না, লতার প্রেমকাহিনি আজও চোখে জল আনবে

Sindhu Som
৩ মিনিট
অভিমানে আজীবন বিয়েই করলেন না, লতার প্রেমকাহিনি আজও চোখে জল আনবে

একটা গোটা দেশ শোকস্তব্ধ। গান এমনই এক শিল্প, বহু কষ্টের মধ্যেও মানুষ গান শোনে, গায়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের নানা ভাষাভাষীর মানুষ, যাঁরা হয়তো একের ভাষা অপরে বোঝেন না, সবাই শোকস্তব্ধ। কারণ লতা মঙ্গেশকর এমনই একটি নাম, যাঁর গানের সঙ্গে প্রতিটি ভারতীয়র জীবন জড়িয়ে আছে। প্লাটফর্মের কাঠের বেঞ্চ থেকে সুউচ্চ ইমারত–যাবতীয় সীমা পেরিয়ে গিয়েছে তাঁর কণ্ঠ অনায়াসে।

সুরের জগতের সম্রাজ্ঞী বলা হয় যাঁকে, ভাগ্যচক্রে তিনি হয়তো বাস্তবেও সাম্রাজ্ঞী বলে পরিচিত হতে পারতেন। কিন্তু একটি ভাবের জগত অপরটি বস্তুর। একটির বাধা অতিক্রম যাও বা চেষ্টায় সম্ভব, অপরদিকে কঠিন বাস্তবের থাকে কিছু কঠিন হিসেব। ভাই হৃদয়নাথের প্রিয় বন্ধু তখন রাজ সিং। দুঙ্গারপুরের যুবরাজ। রাজস্থানের হয়ে ক্রিকেট খেলেন। মিডিয়াম পেস বোলার। গান ভালোবাসেন পাগলের মতো। অনেকেই হয়তো জানেন না, লতা অত্যন্ত ক্রিকেটভক্ত। এই ছিল ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত।

বিকানেরের রাজকন্যা রাজশ্রীর আরেকটি পরিচয় তিনি রাজ সিং-এর ভাইঝি। তাঁর আত্মজীবনী ‘প্যালেস অফ ক্লাউডস্‌—আ মেমোয়ার’-এ এই সম্পর্কের কথা লিখেছেন রাজশ্রী। রাজস্থানের দুঙ্গরপুর রাজবাড়ির ছোট ছেলে রাজ সিং ১৯৫৯ সালে আইন পড়তে গিয়েছিলেন মুম্বই। ক্রিকেটে অত্যন্ত চৌখশ। সেই ক্রিকেটের মাঠেই হৃদয়নাথের সঙ্গে আলাপ। হৃদয়নাথও ক্রিকেট খেলতে ভালোবাসতেন পাগলের মতো। ধীরে ধীরে হৃদয়নাথের বাড়িতেও যাতায়াত বাড়তে লাগল রাজ সিং-এর। একদিন ক্রিকেটের পরে বন্ধুর বাড়িতে বসে চা খাচ্ছেন, তখনই প্রথম আলাপ লতার সঙ্গে। রাজশ্রী লিখছেন এই আলাপই ক্রমে বন্ধুত্বের পথ ঘুরে প্রেমে পরিণত হয়েছিল।

আদর করে লতাকে ‘মিঠু’ বলে ডাকতেন রাজ। পকেটে সবসময় একটা টেপ রেকর্ডার থাকত। তাতে ভর্তি সব লতার গান। “ইয়ে মেরে আন্ধেরে উজালে না হোতে আগর তুম না আতে মেরে জিন্দেগি মেঁ” থেকে “জো ওয়াদা কিয়া ও নিভানা পড়েগা”, “নয়না বরসে রিমঝিম রিমঝিম” থেকে “রাত অউর দিন দিয়া জলে” — পূর্বরাগ, অনুরাগ, বিরহ — কখনও সলিল, কখনও মদন মোহন, কখনও হাসরত জয়পুরি কখনও রাজা মেহদি আলি খান—কথায় সুরে কেটে যাচ্ছে অবিরত। জীবন, গান, পড়াশোনা প্রেম। সবকিছুর মাঝে একটি টেপ রেকর্ডার, তাতে মিঠুর আওয়াজ।

তবে সমস্ত স্বপ্ন একসময় শেষ হয়। পড়াশোনা শেষ করে দুঙ্গরপুর ফিরে গেলেন রাজ সিং। বিয়ের কথা ভাবছেন ততদিনে দুইজনই। মনে একরাশ ইচ্ছে নিয়ে পরিবারের কাছে কথাটা পাড়লেন রাজ। কিন্তু না। স্বপ্ন আর সত্য–সুইয়ের মধ্যে বহু অনুভবের পার্থক্য, ব্যক্তি থেকে সমষ্টির পার্থক্য। যদিও লতা সে সময় খ্যাতির শীর্ষে তবু তিনি তো আর রাজবংশজাত নন। তাঁকে বিয়ে করলে নাকি রাজ সিং-এর পরিবারের সম্মানে চোট লাগবে। রাজি হল না দুঙ্গরপুরের রাজপরিবার। সম্মানের বোঝা ঠেলতে গিয়ে একটা সম্পর্কের সম্ভাবনাগুলো নষ্ট হয়ে গেল। পরিবারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে লতাকে বিয়ে করার সাহস ছিল না রাজ সিং-এর। কাজেই বিয়ে হল না। কিন্তু এই স্বৈরাচারের প্রতিবাদ দুজনেই করলেন নিজস্ব পদ্ধতিতে। সারাজীবন বিয়ে করলেন না কেউই। লতাকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, পরিবারের বড় সন্তান, পরিবারটাকে তো দেখতে হবে। দায়িত্ব অনেক। তাই আর বিয়েটা করে ওঠা হল না। এই লুকোচুরির ছায়ায় কাটতে লাগল বাকি বছরগুলো।

সম্পর্ক পরিণতি পেল না তবে বন্ধুত্ব অটুট থাকল। এই পরিসরে কোনও বাধানিষেধ তাঁদের ঠেকাতে পারেনি। একে অন্যের সান্নিধ্য উপভোগ করেছেন। ইতিমধ্যে ১৯৮৩-তে ভারত বিশ্বকাপ জিতল। রাজ তখন ভারতীয় ক্রিকেট টিমের ম্যানেজার। ক্রিকেট ক্লাব অফ ইণ্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ১৩ বছর। ক্রমে বি সি সি আই-এর প্রেসিডেন্ট হলেন, পরপর দুইবার। ক্রিকেটপ্রেম লতার অক্ষুণ্ণ রইল। একের পর এক পুরস্কারে তখন সম্মানিত হচ্ছেন লতা। নিজেদের জীবনে দুইজনেই সম্মৃদ্ধ। দুজনেই স্মরণীয় হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছেন। তুল্যমূল্য ভাবে লতাই যে বেশি তা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই অর্জনের কাছে কোনো এক রাজপরিবারের ‘বংশজাত’ সম্মান কোথায় মিলিয়ে গিয়েছে। তাদের মনে রাখেনি দেশ, দেশের সাধারণ মানুষ। তারা শুধুমাত্র এখন এই গল্পের সাক্ষ্য দিতে আসে। মানুষ তাঁদের মনে রাখবে যারা সুরের সম্রাজ্ঞীকে চিনতে অস্বীকার করেছিল –শুধুমাত্র এই বলেই।

রাজ চলে গিয়েছিলেন আগেই। ২০০৯ নাগাদ। শোনা যায়, সে সময় লতা গিয়েছিলেন দুঙ্গরপুর। নিঃশব্দে প্রিয়তমকে বিদায় জানাতে। শেষ দেখা দেখে আসা। আজ ভারতকে কাঁদিয়ে চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন সুরের সম্রাজ্ঞীও। হয়তো এতদিনের পরিণতি না পাওয়া জাগতিক প্রেম এবার ঐশ্বরিক হওয়ার সময় এল। জীবনের দূরত্ব মুছে দিয়ে গেল মৃত্যুর ঢেউ–মহামানবের সাগরতীরে।

তথ্যঋণ–

1.Lata Mangeshkar passes away: Know her love story with former BCCI president Raj Singh Dungarpur and why they never got married, 2022. . APN News.

2.Raj Singh Dungarpur, 2021. . Wikipedia.

The immortal love story of Lata Mangeshkar and Raj Singh Dungarpur [WWW Document], n.d. . DNA India.

3.Untold love story of veteran singer Lata Mangeshkar, reason why she is still unmarried, 2019. . Odisha News, Odisha Latest news, Odisha Daily - OrissaPOST.

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।