‘ব্রিফকেস’ অথবা ‘বহিখাতা’ পেরিয়ে অতঃপর ট্যাবলেট, যেভাবে ‘ডিজিটাল’ হয়ে উঠল ভারতীয় বাজেট

Budget 2023 : ডিজিটাল দুনিয়ার তালে তাল মিলিয়ে ভারতীয় বাজেটেও এখন ইলেকট্রনিক্সই দস্তুর। ভারতীয় বাজেটের সব নথি এখন থাকছে একটি ট্যাবলেটে

Kankana Mukherjee
৪ মিনিট
‘ব্রিফকেস’ অথবা ‘বহিখাতা’ পেরিয়ে অতঃপর ট্যাবলেট, যেভাবে ‘ডিজিটাল’ হয়ে উঠল ভারতীয় বাজেট

ব্রিফকেসের ছুটি হয়েছে আগেই, এমনকী লাল বহিখাতার ব্যবহারও বছর দুই হল অতীত, ডিজিটাল দুনিয়ার তালে তাল মিলিয়ে ভারতীয় বাজেটেও এখন ইলেকট্রনিক্সই দস্তুর। ভারতীয় বাজেটের সব নথি এখন থাকছে একটি ট্যাবলেটে। আধুনিকতা এসেছে ঠিকই তবে বাইরের মোড়কে বজায় আছে অতীতের অস্তিত্ব। লাল বহিখাতার ছুটি হয়েছে, তবে আধুনিক ট্যাবলেটটিও মুড়ে আনা হয় লাল শালুতে। জানা গিয়েছে, সেই শালু আবার সিদ্ধি বিনায়ক এবং মহালক্ষ্মী মন্দিরে নিয়ে গিয়ে পুজো দিয়ে এসেছেন খোদ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। এ যেন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই কেন্দ্র সরকারের আধ্যাত্মিক তোষণের নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া। অতীতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়াস বললেও ভুল হয় না।

ঔপনিবেশিক ভারত থেকে স্বাধীন ভারত হয়ে আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায়, এই যে এতদিনের পথ চলা তাতে পরিবর্তন এসেছে অনেক। ভারতীয় বাজেটেও সেই বদলের ধারা চুঁইয়ে পড়েছে। এই বাজেট পেশের পরম্পরা চালু হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। সে সময় ব্রিফকেস বন্দী বাজেটের নথি নিয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করতেন ব্রিটিশ সরকার। ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ঔপনিবেশিক ভারতে প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন। তাঁর হাতে ছিল একটি গ্ল্যাডস্টোন বক্স। সাহেবরা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও এদেশে সাহেবদের লেজ ধরে থাকার অভ্যাস চিরন্তন। তার ব্যতিক্রম নয় বাজেট পেশের নিয়মও। ইংরেজদের হাত ধরে ব্রিফকেস সঙ্গে করে বাজেট পেশের রীতি ঢুকে পড়ে ভারতীয় অর্থনীতিতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিরাট ঘোষণা নির্মলার! এবার থেকে আর কোনও আয়কর দিতে হবে না মধ্যবিত্তদের!

Budget 2023: নতুন ট্যাক্স ব্যবস্থায় বছরে ৭ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ের উপর কোনও কর দিতে হবে না সাধারণ মানুষকে!

ঔপনিবেশিক ভারত হয়ে স্বাধীন ভারত, রীতিতে বদল আসেনি। ১৯৪৭ সালের ২৬ নভেম্বর স্বাধীন ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আর.কে. শনমুখম চেট্টি৷ তাঁর হাতে তখন ছিল চামড়ার পোর্টফোলিও ব্যাগ। এরপর ইন্দিরা গান্ধির আমল থেকে মোদি আমলের অরুণ জেটলি পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল সেই ধারা। অতঃপর নির্মলা সীতারমন-এর হতে এসে বদল এল সেই ধারায়। ২০১৯ সালের বাজেটে প্রথম মুক্তি পড়ল ব্রিফকেস প্রথা। সেই জায়গায় এল লাল রঙের বহিখাতা।

প্রথমদিকে ছবি অথবা মিডিয়ার চল না থাকলেও আজকের দিনে যেকোনও বিষয় ছবি তোলাই দস্তুর। ২০১৯ সালে প্রথমবার এই দায়িত্ব হতে পেয়ে ছবি তোলার সময় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ব্রিফকেসের বদলে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরলেন বহিখাতা। বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা ব্যবসার হিসেব নিকেশ করার খেরোর খাতার মতোই। যদিও এ হিসেব কোনও মামুলি হিসেব নয়, এর মধ্যেই রয়েছে একটা গোটা দেশের আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত। এর আগে যখন ব্রিফকেস ব্যবহার করা হতো তখন তার অবয়বে বিশেষ বদল হয়নি কোনও দিনই, তবে রঙে বদল হয়েছে। কখনও লাল, কখনও কালো, কখনও আবার খয়েরী রঙের ব্রিফকেস ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতীয় বাজেটে কেন ব্যবহার করা হতো লাল বহিখাতা?

Budget 2023 : বাজেটে কীভাবে এল লাল বাহি খাতা? কেন বদলে গেল সেই রীতি

যাই হোক, আসা যাক লাল বহিখাতায়। লাল রঙের শালুতে মোড়া একটি হিসেবের খাতা। ওপরে একটি অশোক স্তম্ভের ছাপ। এখানেই শেষ নয়, ব্যবসার ধর্মীয় রীতি মেনে তার ওপর আঁকা হতো স্বস্তিক চিহ্ন। ১ টাকার কয়েনে লাল সিঁদুর মাখিয়ে দেওয়া হতো অশোক স্তম্ভের ছাপ। সেই ঐতিহ্যকেই যেন সরকারি সীলমোহর দিলেন নির্মলা। লাল শালুতে মুড়ে ২০১৯ সালে প্রথম বাজেটের নথি আনলেন তিনি। হঠাৎ করে এতদিনের ব্রিফকেস বদলে ফেলে নয়া ধারা আনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনকে। যদিও তিনি আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেন এই পরিস্থিতির জন্য। এই বদলের পিছনে তিনি যে কারণটা দেখিয়েছিলেন তা হল, “২০১৯ সালে বাজেটের জন্য স্যুটকেস আনিনি। আমরা স্যুটকেস বহনকারী সরকার নই। একটি স্যুটকেস অন্য কিছুকেও বোঝায়, 'স্যুটকেস নেওয়া, স্যুটকেস দেওয়া। মোদীজির সরকার স্যুটকেস সরকার না।” সূক্ষ হলেও একটা গভীর রাজনৈতিক খোঁচা ছিল এর মধ্যে।

মোট কথা পরিবর্তিত হল এতদিনের প্রথায়। যদিও সেই খাতাও বেশিদিন জায়গা বজায় রাখতে পারল না। বছর দুই পরেই ছুটি হল বহিখাতার। বর্তমান অর্থমন্ত্রী অবশ্য বারবার পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েই এগিয়ে নিয়ে গেছেন বাজেট পেশের প্রথাকে। সেই ধারাতেই এসেছে আজকের ট্যাবলেট। প্রযুক্তির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ডিজিটাল দুনিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ভারতীয় অর্থনীতি। তাই সেই ছাপ বজায় রাখতে বাজেট পেশ করা হয় ট্যাবলেটে। যদিও তার সঙ্গে রয়েছে অতীতের মেলবন্ধন। ট্যাবলেটটি লাল শালুতে মুড়ে আনা হয়। তাছাড়া পেপারলেস যুগে দাঁড়িয়ে এই অজস্র নথির আলাদা আলাদা কাগজের ব্যবহারকে বাদ দিতে চেয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। ট্যাবলেটে আঙুলের ডগায় সেভ করে রাখা যায় সমস্ত হিসেব। তার ওপর করোনা পরবর্তী নিউ নর্মাল, তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সে বার লোকসভায় ২০২১ সালে প্রথম ট্যাবলেট থেকে বাজেট পেশ করেন নির্মলা।

এখানেই শেষ নয়, ট্যাবলেট আনার পাশাপাশি ‘ইউনিয়ন বাজেট মোবাইল অ্যাপ’ চালু হয়েছিল সেই বারই। যাতে মন্ত্রী সাংসদদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও বাজেটের যাবতীয় নথি এক ক্লিকেই পেয়ে যেতেন ঘরে বসেই, সেই ভাবনা মাথায় রেখেই এই প্রয়াস। যদিও অনেকেই এই ডিজিটাল নথির পরিবর্তে কাগজের নথির দাবি তুলেছিলেন অনেকেই কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় সবসময় নিজেকে এগিয়ে রাখা মোদি সরকার অবশ্য ভ্রুক্ষেপ করেনি এতে। এমনকী বাজেটের আগে ‘বিজনেস অ্যাডভাইসরি কমিটি’-র বৈঠকেও প্রতিলিপির ‘হার্ড কপি’ সাংসদদের সরবরাহ করার দাবি উঠলে তা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্লোগানই যে মোদি সরকারের জন্য দস্তুর। তাই ব্রিফকেস কিংবা বহিখাতার পরিবর্তে ট্যাবলেটে বাজেট পেশ প্রকৃত অর্থেই ‘ডিজিটাল’। আবার সময়োপযোগীও বটে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।