COP26: আশার আলো না প্রহশন?

Satyaki Tat
৫ মিনিট
COP26: আশার আলো না প্রহশন?

ছোটবেলায় রূপ কথার গল্প নিশ্চয়ই পড়েছেন? বা পুরাণ? Mythology? পড়েছেন নিশ্চয়ই। ওখানে আমরা পড়তাম, দেবতারা স্বর্গে সম্মিলিত হচ্ছেন, মর্তলোকের আসন্ন বিপদকে ঠেকাতে। তার পর তারা এক হতেন, কিছু একটা করতেন, সব ঠিক হয়ে যেতো। এক এক সময়ে আপনাদের মনে হয়না যে কেউ যদি সব ঠিক করে দিত? ভগবান, দেবতা বা কোনো সুপার হিরো? আমার তো মনে হয় খুব, যখন রিপোর্টে পড়ি আমাদের হাতে আর খুব কম সময় পরে আছে বিশ্ব উষ্ণায়ন নামক ভয়ানক অসুরের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্যে, তখন সত্যিই মনে হয়।

তারপর সংবাদে দেখি বিশ্ব নেতারা সব একত্রিত হচ্ছেন, পৃথিবীকে বাঁচাতে, তারাই আমাদের ভাগ্য বিধাতা, দেবতা, যারা একসাথে বসে ওই দানবকে হারানোর পরিকল্পনা করবেন। সম্মেলনের নাম COP26। আপাত দৃষ্টিতে খুব আশাবাদী হওয়ার কথা, কারণ এই "দেবতারা" অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাতে পৃথিবী বাঁচে। কিন্তু এরা কি সত্যিই কোনো দেবতা? সত্যিই কি কোনো ক্ষমতা বা সদিচ্ছা আছে এদের? এর আগে 25 টি সম্মেলন হয়েছে, মানুষ নির্বাচিত এই ভাগ্য বিধাতারা অনেক কথাই তো বলেছেন, কিন্তু কার্যকারিতা?

যাই, গ্লাসগোতে হওয়া 26 তম COP সম্মেলনে একটু উঁকি মেরে আসি।

তার আগে ছোট্ট করে এর ব্যাপারে জানাই।COP, যার পুরো নাম হল Conference Of The Parties, এটি একটি রাষ্ট্রপুজ্ঞের সংস্থা, যারা রাষ্ট্রপুজ্ঞের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেম ওয়ার্ক সংক্রান্ত কাজ ঠিক ভাবে হচ্ছে কিনা তার তদারকি করে। Parties মানে রাষ্ট্রপুজ্ঞের 197 টি সদস্য দেশ যারা এই ফ্রেম ওয়ার্কে সই করেছে। এই সম্মেলনটি 1995 থেকে প্রতি বছর হয় এবং এই বছর তার 26 তম সম্মেলন হল স্কটল্যান্ডের রাজধানী গ্লাসগো তে।

এই লেখায় আমি COP 26 এর ধারা বিবরণী দেবোনা। একটু এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করব, এবং বোঝার চেষ্টা করব যে রাষ্ট্রনেতারা সেই উদ্দেশ্য সফল করার তাগিদে কাজ করেছেন নাকি শুধু ভাষণ দিয়ে এবং নিজেদের কার্যসিদ্ধি করে এসেছেন।

এই বছরের COP 26 সম্মেলন আক্ষরিক অর্থেই খুব তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কিছুদিন আগেই আমরা পড়েছি আইপিসিসির রিপোর্ট, যেখানে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন যে বিপদ একেবারে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। ঘোষণা করেছেন "Climate Emergency", অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানবজাতির ভবিষ্যত প্রবল ভাবে অনিশ্চিত। আমাদের এই গ্রহের সবকটি দেশকে হাতে হাত মিলিয়ে লড়তে হবে, গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ অন্তত অর্ধেক কমাতেই হবে, তাও 2030 সালের মধ্যেই। নাহলে বাড়বে সমুদ্রের জলস্তর, বাড়বে বন্যা, দাবানল, ঘূর্ণিঝড়ের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়, এবং সেই সাথে আসবে মানবজাতির প্রবলতম কষ্টের দিন।

তা ঠিক কী হয়েছেএত গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে? আমরা কি কোনো দিশা পেলাম? রাষ্ট্রগুলি কি কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নিলো পৃথিবীকে বাঁচাতে? কি বললেন রাষ্ট্রনেতারা?

গত দু সপ্তাহ গ্লাসগোতে চলেছে প্রতিশ্রুতির আসর, না, ব্যঙ্গ করছিনা, সত্যি সত্যিই সব শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রনেতারা, বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্যে দায়ী দেশের প্রধানরা গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। সেই সাথে জীবাস্ব জ্বালানিতে ভর্তুকি না দেওয়া এবং বনভুমি উচ্ছেদ আটকাতে তারা যা যা করা দরকার সবই করবেন বলেছেন।

যেমন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথাই যদি বলি, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যে, 2070 সালের মধ্যে, অর্থাৎ আজ থেকে 50 বছরের মধ্যে ভারত "Net Zero" তে পৌঁছবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি। যারা জানেননা, তাদের জন্যে বলি, Net Zero কথার অর্থ হল, যতো পরিমাণ কার্বন বাতাসে বা পরিবেশে নির্গত হবে, তার অনুপাতে ঠিক তত পরিমাণ কার্বনই বাতাস থেকে বা পরিবেশ থেকে শুষে নেওয়া।

চিনের রাষ্ট্রপতি যদিও এই সম্মেলনে আসেননি, তবে তারা এই Net Zero সময় সীমা নির্ধারণ করেছে 2060 এর মধ্যে। আমেরিকার লক্ষ্য 2050। Net Zero হওয়ার প্রতিশ্রুতি ছাড়াও রয়েছে অনুন্নত দেশ গুলির জন্যে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি।

এত গেলো প্রতিশ্রুতির কথা। খুব সুন্দর ভাষণ, আশাব্যাজ্ঞক পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার 1.5 ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেঁধে রাখার অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবে এই এত কথা, এত গালভরা প্রতিশ্রুতি, এইসব বাস্তবে রূপায়ণ করানোর দায়িত্ব কে নিচ্ছে?? কারোর কি সেই কর্তৃত্ব আছে এই দেশ গুলির ওপর? 2009 সালে বিশ্বের ধনী দেশগুলি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো একশো বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল তৈরি করার, যা অনুন্নত দেশগুলির জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইতে প্রয়োজন হবে। সেই তহবিল তৈরি ইতিমধ্যেই পিছিয়ে গিয়ে 2023 সালে চলে গেছে।

আগামী এক দশকে এই কার্বন নিঃসরণ অর্ধেক করার কথা বারবার বলছেন বিজ্ঞানীরা, নাহলে 1.5 ডিগ্রিতে কোনোমতেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি আটকে রাখা যাবেনা, কিন্তু কোনো শক্তিশালী দেশই আগামী এক দশকে সেটা করে উঠতে পারবেনা, এবং তারা যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে নিজেদের জন্যে, তাতে আর যাই হোক, সেই দেশগুলির বর্তমান প্রধানদের খুব বেশি পরিশ্রম করতে হবেনা।

নরেন্দ্র মোদীই যেমন 2070 সালের সময়সীমা বেঁধেছেন, তার আর বিশেষ মাথাব্যথা থাকার দরকারই নেই। এখনই তাঁর বয়স 70। আগামী 50 বছরে প্রধানমন্ত্রী থাকা, বা তাঁর জীবিত থাকা, কোনোটাই সম্ভব নয়। তাছাড়া কে দেখতে যাচ্ছে যে ওঁর দেশে একটা গোটা জঙ্গল কেটে হিরের খনন হওয়ার কথা চলছে? বা 23 লক্ষ গাছ কেটে দুটি নদীকে জুড়ে দেওয়ার কাজ চলছে? বা রোজ তিলে তিলে ভারতের হিমালয় অঞ্চলকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে? না, তিনি যখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বনভূমি বাঁচানোর, নিশ্চয়ই তার উত্তরসুরিদের বলে যাবেন যাতে তারা ওঁর গ্লাসগোতে দেওয়া কথা রাখে।

শুধু ভারতই বলছি কেনো, ব্রাজিলও এই সম্মেলনে অনেক গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে, কিন্তু অ্যামাজন যেভাবে দিনের পর দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সেই দেশেরই সরকারের মদতে, সেটা কে আটকাতে পারছে? আছে রাষ্ট্রপুজ্ঞের সেই ক্ষমতা?

চিন, আমেরিকা এখনও তাদের জীবাস্ব জ্বালানি উৎপাদনকারী কোম্পানিদের ভর্তুকি দিয়ে চলেছে এবং অদূর ভবিষ্যতেও যে সেটা বন্ধ হবেই তার কোনো গ্যারান্টি রাষ্ট্রপুজ্ঞ অন্তত দিতে পারবেনা।

"Net Zero blah blah blah, Carbon neutrality blah blah blah blah".. চমকে উঠবেননা, এটা আমি না, গ্রেটা থানবর্গ বলেছেন এই নেতাদের ব্যপারে, এবং এই সম্মেলন যে শুধুমাত্র লোক দেখানো Greenwashing, সেটাও বলেছেন।

সবথেকে অদ্ভূত বিষয় হল, পরমাণু শক্তি, যা এই লড়াইতে অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে পারে, তাকে বিশেষ গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। কেন হয়নি, তার উত্তর নেই!

বেশ, সম্মেলনের গতি প্রকৃতি দেখে গ্রেটার সাথে দ্বিমত হওয়ার বিশেষ কারণ এখনও পাইনি, তবে হ্যাঁ, আপনি বলতেই পারেন আমি খুব নেতিবাচক, ঠিকই। খালি মনে রাখবেন, নেতাদের এই ভাষণগুলি বাস্তবায়িত হল কিনা দেখার জন্যে আমরা কেউই বেঁচে নাও থাকতে পারি। আশা করি খবর দেখেন, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, তাপপ্রবাহ, অতি বৃষ্টি, বন্যা, খরা, মেঘ ভাঙা বৃষ্টি, ধস, এই সবের খবর একটু বেশিই দেখছেননা আগের থেকে? আর পৃথিবীর দুই মেরুতে রোজ বরফ গলে যাওয়ার খবর? যাকগে, বিশ্বের শান্তি হোক, এই বিশ্ব ঠান্ডা হোক, এই কামনাই রইলো। পারলে চলুন, নাগরিকরাই হাত মেলাই, লড়াই করি একসাথে, কিছুদিন পর প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবেনা আমাদের। কথায় আছেনা, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ!

তথ্যসূত্রঃ

  • https://www.forbes.com/sites/jamesconca/2021/11/12/cop26--another-failure-for-the-planet/?sh=77ebee0a86c8

  • https://www.dailysabah.com/life/environment/success-or-failure-cop26-climate-summit-draws-mixed-reactions

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।