বাবার মন ও কয়েকটি প্রশ্ন

মেয়ের বাবা হলেও আমি তো পুরুষই। তাই নারী হিসেবে সে কী ভাববে তা নিয়ে মত প্রকাশের অধিকার ও যোগ্যতা আমার নেই

Susnato Chowdhury
৩ মিনিট
বাবার মন ও কয়েকটি প্রশ্ন

বাড়িতে মা-বোন নেই?’ পথে-ঘাটে উত্ত্যক্ত অনেক মহিলার মুখে শোনা যায় রিফ্লেক্স-জাত এই বচন। চড়-থাপ্পড় না কষিয়ে এক স্বতঃস্ফূর্ত ও ক্রুদ্ধ উচ্চারণেই বেশিরভাগ সময় ভরসা রাখেন তাঁরা। ভিড় বাসে, ভরা ট্রেনে পুনঃপুন ঘুরে-ফিরে আসে ওই একই প্রশ্নবোধক বাক্য—‘বাড়িতে মা-বোন নেই?’ ঘটনা বদলায়, পরিস্থিতি বদলায় না। উদ্দিষ্ট পুরুষ বদলায়, প্রশ্ন বদলায় না। শুনে মনে হয়, ব্যাপার খানিক এমন যে বাড়িতে মা-বোন থাকলে যেন উক্ত পুরুষটির ওই কৃতকর্ম করার কথা নয়। এইখানে এসে প্রশ্নবোধক বাক্যটি সমাজের মনে মনে কোমল বিস্ময়বোধকে পরিণত হয়—আহা গো, ওঁর ঘরে মা-বোন নেই নিশ্চয়, থাকলে কি আর এমন অশালীন কীর্তিকলাপ করে বেড়াতেন তিনি! বস্তুত এই চিরচেনা বাক্যবন্ধ বিন্দুমাত্র বিস্ময়ের উদ্রেক না করেও প্রমাণ করে দিয়ে যায়, বাড়িতে মা-বোন থাকার উপরে একটি বৃহৎ অংশের পুরুষের কোনো কাজ আদতে নির্ভর করে না।

এরকমই আরেক ধরনের উক্তিতে সমাজ টেনে আনে কন্যাসন্তানকে। কেউ তর্জনী সামনে তাক করে বলেন—‘আপনারও তো মেয়ে আছে, তার কথাটা একবার ভাবুন, তার সঙ্গেও যদি কখনো এমন হয়…।’ কেউ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেন তর্জনী—‘মেয়ের বাবা হিসেবে আমি আতঙ্কিত, লজ্জিত।’ আপাতবিচারে এই ভাবনা অস্বাভাবিক নয়। কখনো অপরকে, কখনো-বা নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া যে আসলে সচেতন করারই প্রয়াস, তা বুঝতে সমস্যা হয় না। কিন্তু এর মধ্যে কি থেকে যায় না স্বার্থপরতার আদিম বীজ? আমরাই কি অজান্তে নিজেদের অন্তরে রোপন করতে চাই না সুবিধাবাদের চারা?

আমার ঘরে যদি মেয়ে না থাকত, যদি আমি কন্যাসন্তানের পিতা না হয়ে পুত্রসন্তানের পিতা হতাম, তাহলে কি দু-এক পরত কম আতঙ্কিত বা কম লজ্জিত হওয়াও জায়েজ হত? না কি এসব নিয়ে না ভাবলেও চলত? কেউ মেয়ের বাবা হয়েছে বলেই এই ভাবনা আর এই আতঙ্ক তার একক বাধ্যবাধকতা হতে পারে না। অথচ আমাদের প্রতিবাদী ভাষ্যেও সেই ইঙ্গিত পূর্ণমাত্রায় উপস্থিত। সযত্ন লালিত এসব সামাজিক নির্মাণ তাই আজও পক্ষপাতদুষ্ট রয়ে গিয়েছে বলেই বোধ হয়। দিনান্তে আমরা যতই আয়নার সামনে দাঁড়াই, সব প্রতিবিম্ব সমান স্পষ্ট দেখি না।

একদা আমাদের চালু লব্জ ছিল—‘কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা’। এখনও বোধ হয় তীব্র অপমানজনক এই কথাটি ‘বাজার’ থেকে উবে যায়নি। এই যে মেয়ের বাবার মন পড়তে চাওয়া, তার গভীরেও কি কতকটা সমগোত্রীয় ভাবনাই কাজ করছে না? যে অদৃশ্য ও দৃশ্যমান দুশ্চিন্তা নিয়ে আমরা ভাবিত, তা যদি সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে হয়, তাহলে তার শুরুয়াত মূল থেকেই হওয়া উচিত; যা অনেকাংশে ঘাপটি মেরে রয়েছে আমাদের ভাবনাচিন্তার রেফারেন্সগুলির মধ্যে। তাকে নড়ানো না গেলে কি সমূল উৎপাটন আদৌ সম্ভব?

মুখে যতই আমরা সমানাধিকারের কথা বলি, ‘অর্ধেক আকাশ’ বলে কাব্য আওড়াই; প্রতি পদক্ষেপে আজও আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মন-মানসিকতা বলতে চায়—নারীর পরিত্রাতা পুরুষই। একজন পিতা যদি তার পুত্রের জন্য দুশ্চিন্তা না করেন, তাহলে কন্যার জন্য দুশ্চিন্তা করার ‘মাথার দিব্যি’ তাঁকে সমাজ দেবে কেন? কেন আমরা আগাম এই স্বতঃসিদ্ধে পৌঁছে যাব যে একটি মেয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে না? বয়ফ্রেন্ড বা স্বামী তো বটেই, তাঁর বাবাই-বা কেন খামোখা সুপারম্যানের পোশাকে গা গলানোর জন্য প্রস্তুত হবেন? এই সমাজে ঘৃণ্য শ্বাপদের অভাব নেই ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে জুঝে ওঠার মনোবল কোনো একক মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলার পরিস্থিতি আমরা তৈরি করতে পেরেছি কি না, তা-ও ভেবে দেখা জরুরি বলেই মনে করি।

এক দশক আগে, একটি লেখার প্রয়োজনে রাত কাটিয়েছিলাম ক্যানিং স্টেশনে। খুব ভোরের যে দু-তিনটি ট্রেনে দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশের গৃহ-সহায়িকারা কাজে আসেন, তেমনই একটি ট্রেন ধরি। বাবু-বিবিদের ভাষায় এই ট্রেনগুলির ডাকনাম ‘ঝি লোকাল’। তথাকথিত ভদ্রবিত্তের পরিমণ্ডলে নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে যে নানাবিধ তাত্ত্বিক বুকনি ঘুরপাক খায়, তার সর্বোচ্চ প্রায়োগিক ছবিটি আমার চোখে সেইদিন ধরা পড়ে। সে-ট্রেনের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ যাত্রীই ছিলেন মহিলা। তাঁদের চাউনি, কথাবার্তা, বডি-ল্যাঙ্গুয়েজে ঝরে পড়া কনফিডেন্স সেই ভোরে হয়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব শিক্ষা। আমি শুধু চাই, এই আত্মবিশ্বাস আমার মেয়ের মধ্যেও জন্ম নিক।

ভুল বললাম, মার্জনা করবেন। মেয়ের বাবা হলেও আমি তো পুরুষই। কাজেই এক নারী হিসেবে সে কী ভাববে, কীভাবে গড়ে তুলতে চাইবে নিজেকে, তা নিয়ে মত প্রকাশের অধিকার ও যোগ্যতা আমার নেই। তার সিদ্ধান্ত, সে নিক। দূর থেকে আমার মন বড়োজোর এটুকু চাইতে পারে, এই সমাজে পুরুষের সচেতনতার জন্য নারীর অনুষঙ্গ নিয়ে আসার প্রবণতা বন্ধ হোক। বন্ধ হোক নারীর সুরক্ষার জন্য পুরুষের মুখাপেক্ষী হওয়া।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।