মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি...

Buddhadeb Bhattacharjee: আসলে নিজস্ব আদর্শ, নিজস্ব জীবনধর্মে আজীবন অটল ছিলেন বুদ্ধবাবু। সেখান থেকে নড়ানো গেল না তাঁকে আজও।

Sohini Das
৩ মিনিট
মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি...

ক্ষমতা মানুষকে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, বিলাসবহুল যাপনের দিকে ঠেলে দেয়। সুবিধা নিতে শেখায়। অন্তত আজকের দিনের রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে এমনটা তো আখছারই ঘটে। ক্ষমতাসীন শাসকদলের মন্ত্রীর বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় কোটি কোটি টাকা। সামান্য ক্ষমতা স্থানীয় নেতাকে ভাবতে শেখায় সর্বেসর্বা, প্রভাব খাটিয়ে এলাকার জমিজমা লুঠ থেকে নারীদের অমর্যাদা, সবটাই করে চলে সেই 'সামান্য' ক্ষমতার দাপটে। এ সমস্ত দেখতে দেখতে চোখ ঝলসে যাওয়া সমাজ যখন পিছনে ফিরে তাকায়, চোখ যায় পাম অ্যাভিনিউয়ের একরত্তি ফ্ল্যাটে সারাটা জীবন কাটিয়ে যাওয়া এক নেতার দিকে। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, সাদামাটা পোশাক, সাদামাটা জীবন তাঁকে ছেড়ে যায়নি এমনকী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও।

পাম অ্যাভিনিউয়ের সেই বাড়ির চারপাশে ভিড়। বৃহস্পতিবার সকালে প্রয়াত হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও বামপন্থী নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। মার্ক্সিও দর্শন শিখিয়েছিল সাম্যবাদের মন্ত্র, দেখিয়েছিল যৌথ খামারের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নে নিজে লুটেপুটে নেওয়ার, নিজের জন্য সঞ্চয়ের ধারণাটাই নেই। ফলে মৃত্যুর পরেও যা কিছু একান্ত ভাবে নিজের, তা-ও অন্যের জন্য দান করে গেলেন তিনি। বৃহস্পতিবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানিয়েছেন, মরনোত্তর দেহদান করে গিয়েছেন বুদ্ধদেব। দান করে গিয়েছেন নিজের চোখদু'টিও। যে চোখ দু'টি দেখেছে বিস্তর দুনিয়াদারি। ক্ষমতা দেখেছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়া দেখেছে, সাফল্য দেখেছে, ব্যর্থতাও দেখেছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ঘটনার পর যে দাগ তাঁর সাদা ধুতিতে লেগেছিল, সেই ব্যর্থতা, অভিমান বুকে নিয়ে একদিন রাজনীতি ছেড়েছিলেন বুদ্ধবাবু। পরে সময়ের কষ্টিপাথরে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, সেদিনও ভুল ছিলেন না বুদ্ধবাবু। রাজনীতিক হিসেবে, দেশের প্রশাসক হিসেবে তাঁর কর্মপদ্ধতি বা সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকতেই পারে, তবে মানুষ হিসেবে যে খুঁত ছিল না তাঁর, তা বরাবার নিজের জীবনধর্মে প্রমাণ করে দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা বেজে ২০ মিনিটে তাঁর পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতেই প্রয়াত হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেই খবর পাওয়ার পরেই সেখানে পৌঁছন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিম। তিনি জানিয়েছেন, ‘‘সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বাড়িতেই রাখা থাকবে ওঁর দেহ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অনেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে আসবেন। তাই আজ শেষযাত্রা করা সম্ভব হবে না। দিল্লি এবং উত্তরবঙ্গ থেকে যাঁরা আসবেন তাঁরা রাতেই সফর করে পৌঁছবেন। তাঁদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে ওঁর দেহ। কাল (শুক্রবার) সকালে আলিমুদ্দিনে নিয়ে যাওয়া হবে।’’ বুদ্ধদেবের চক্ষুদান প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে পিস ওয়ার্ল্ডে। সংরক্ষণের জন্য। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, সিপিআই(এম) রাজ্য দফতর মুজফফর আহমদ ভবনে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য শায়িত থাকবে তাঁর মরদেহ। এর পর সেখান থেকেই বিকেল ৪টে নাগাদ বুদ্ধদেবের মরদেহ নিয়ে শোকমিছিল করা হবে। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে মরণোত্তর দেহদান করা হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নিঃশব্দে যে যায় লাল পতাকা মুড়ে... বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যা শিখিয়ে গেলেন বাংলাকে

Buddhadeb Bhattacharjee Death: বুদ্ধদেব প্রকাশ্য সভায় নিজের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, গুলি চালানোর ওই ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী।

প্রেসিডেন্সি কলেজে সাহিত্য নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বাড়িতে একটা রাজনৈতিক পরিমণ্ডল তো ছিলই। কাকা সুকান্ত ভট্টাচার্যের যোগ্য় উত্তরসুরি বুদ্ধদেব বরাবরই ভালো লিখতেন। সারা জীবনে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন নাটক। অনুবাদেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ১৯৬৬ সালে সিপিএমের প্রাথমিক সদস্যপদ পান বুদ্ধবাবু। ১৯৯৭ সাল নাগাদ কাশিপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রথম নির্বাচন লড়া। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ক্রমে রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী থেকে জ্যোতি বসুর মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ভার। সেখান থেকে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী। জ্যোতি বসুর হাত থেকে পতাকা গেল ক্রমে তাঁর হাতে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বুদ্ধবাবু।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলার রাজনীতির শেষ 'ভদ্রলোক'! প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

Buddhadeb Bhattacharjee Death: বৃহস্পতিবার সকালেও প্রাণ ছিল তাঁর, প্রাতঃরাশও করেছিলেন। তারপরেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এই বাম নেতা।

দলের সঙ্গে মতপার্থক্য, কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত মনোমালিন্য, সব কিছুর পরেও বাংলার ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী নেতা হয়েই রয়ে গেলেন বুদ্ধদেববাবু। সংস্কৃতিমনষ্কতার জন্যেও একসময় বিদ্ধ হতে হয়েছে তাঁকে, এমনকী শিল্প আনতে গিয়েও গায়ে লেগেছে কলঙ্কের ছিটে। নিভৃতে গিয়েছেন, কিন্তু নিজস্ব আদর্শ, জীবনধর্ম থেকে সরে আসতে দেখা যায়নি কখনও তাঁকে। রাজনীতি থেকে সরে আসার পরেও আলিমুদ্দিনে গিয়ে বইপত্তরে ডুবে থাকতেন তিনি। শেষবার তাঁকে দেখা গিয়েছিল ব্রিগেডের অনুষ্ঠানে। তখন অশক্ত শরীর, ধুলোর মধ্যে নামতেও পারলেন না তিনি। গাড়িতে বসেই সঙ্গী হয়েছিলেন ব্রিগেডের। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো বটেই, পরবর্তী সরকারের নেতানেত্রীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। বুদ্ধবাবু অসুস্থ হতে বারবার তাঁকে দেখতে ছুটে গিয়েছেন মমতা। ২০২২ সালে পদ্মভূষণের সম্মান এসেছিল দরজায়, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আসলে নিজস্ব আদর্শ, নিজস্ব জীবনধর্মে আজীবন অটল ছিলেন বুদ্ধবাবু। সেখান থেকে নড়ানো গেল না তাঁকে মৃত্যুর পরেও।

রাজনীতির মঞ্চ ছেড়েছেন অনেক দিন। এক শ্রাবণ সকালে জীবনের নাটমঞ্চ ছাড়লেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সোশ্যাল মিডিয়া যখন তাঁকে নিয়ে নানা আলোচনা, স্মৃতিচারণে ব্যস্ত, তখন যেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই লাইনটিই মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন তিনি —

"দক্ষিণদুয়ারে এসে দাঁড়াবে নির্ঘাৎ

চতুর্দোলা নিয়ে যম—

অপমান লাগে ...

মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি।"

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।