শেখ শাহজাহান, জেসিবি, জয়ন্ত: পাড়ায় পাড়ায় বাহুবলী এটাই তৃণমূলের সংস্কৃতি?

Sheikh Shahjahan, JCB, Jayant Singh: সরকার পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা যদি তৈরি না হতো কেউ কি কোনওদিনও শেখ শাহজাহানের দাপটের আঁচ পেত?

inscript
৩ মিনিট
শেখ শাহজাহান, জেসিবি, জয়ন্ত: পাড়ায় পাড়ায় বাহুবলী এটাই তৃণমূলের সংস্কৃতি?

সন্দেশখালি থেকে চোপড়া হয়ে আড়িয়াদহ। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে শাসকের ছায়াতে বেড়ে ওঠা স্থানীয় গুন্ডা কাম নেতাদের বাড়বাড়ন্ত চোখে পড়ার মতো। শাসকের ছায়াতে দুষ্কৃতীর বৃদ্ধি, স্থানীয় স্তরে ক্ষমতা ধরে রাখতে উঠতি মস্তানদের মাথায় রাজনীতির হাত রাখা নয়া ঘটনা নয়। বামেদের জমানাতেও 'গুন্ডা' পোষার অভিযোগ ছিল, গুন্ডা পুষতেন কংগ্রেসিরাও, পোষেন তৃণমূল-বিজেপির নেতারাও। কিন্তু আগে কখনই স্থানীয় গুন্ডাদের অগাধ শক্তি পেতে দিতেন না নেতারা। বুঝিয়ে দেওয়া হতো ক্ষমতার দরবারে 'বাবা' কে। এখন, বেশ কিছুকাল ধরেই, পাড়ায় পাড়ায় 'দাদা' তৈরির পরিমাণ বাড়ছে, আর ক্ষমতায় ঘ্রাণ এমন যে অজান্তেই নিয়ন্ত্রণ বেরিয়ে যাচ্ছে শাসকের হাত থেকেও। বাংলার রাজনীতিতে শাসকের মদতপুষ্ট গুন্ডাদের অপরাধের কি নিজস্ব জগত তৈরি হয়ে যাচ্ছে তবে?

সন্দেশখালির বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছিলেন শেখ শাহজাহান শেখ। দাপট এমনই বাড়ে যে লোকসভা নির্বাচনের আগে সন্দেশখালিতে মহিলাদের উপর অত্যাচার ও স্থানীয়দের নিগ্রহ জাতীয় রাজনীতির ইস্যু হয়ে ওঠে। চোপড়ায় তাজিমুল ইসলাম ওরফে জেসিবির বাড়বাড়ন্ত এমনই যে স্থানীয় তৃণমূল নেতারা সব জানলেও গণপিটুনির ঘটনা নিয়ে রাজ্যস্তরে কোনও জলঘোলা হয় না। জয়ন্ত সিংয়ের মতো দুষ্কৃতী আড়িয়াদহ ব্যারাকপুরের বাহুবলী হয়ে ওঠেন। ছেলে ও মাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করার ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। তার বহু আগের বহু বহু ভিডিও রয়েছে যা দেখে শিউরে উঠতে হয়। বাংলার রাজনীতি এমন উত্তরপ্রদেশের ছাঁচে ঢালা হলো কীভাবে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আড়িয়াদহে মা-ছেলেকে পিটুনি! মদন মিত্রের ছায়ায় যেভাবে বেড়ে উঠল গুন্ডা জয়ন্ত সিং

Ariadaha Lynching Incident: যার হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ জয়ন্তর সেই মদন মিত্র স্পষ্ট বলেছেন, ‘‘কে, কার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, তা বোঝা সম্ভব নয়।"

এই স্থানীয় গুন্ডাদের বাড়বাড়ন্ত যে হঠাৎ করে হয়নি তা বলাই বাহুল্য। এদের অনেকের শিকড় লুকিয়ে বাম যুগেই। উত্তর ২৪ পরগণার শাসনের মজিদ মাস্টার, তপন, মেদিনীপুরের সুকুর – সবাই বামপন্থী নেতাদের ছায়াতে বেড়ে উঠেছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন এলাকার মাথা। রাজ্যে সিপিআইএমের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে ২০১১ সালে। তখন বামেদের 'পোষা' গুন্ডারাও 'বাবা' বদলে নেন। কেউ কেউ জেলে যান, কেউ কেউ দল পাল্টে নিয়ে বেঁচে যান। শাহজাহান শেখ তো তেমনই একজন। স্থানীয়রা বলছেন, চোপড়ার জেসিবিও আগে বামেদের হয়েই কাজ করত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক নেতাদের হাতের মুঠোয় থাকা এই বাহুবলীরা তৃণমূল কংগ্রেসের যুগে আরও বড় নেতা হয়ে যান। মুশকিল হলো, বামেদের বেলায় যদিও বা সামান্য নিয়ন্ত্রণ ছিল ঘাসফুলের গালিচায় সেসব হারিয়ে গেল। কতটা করতে হবে, কোথায় থামতে হবে নিয়ন্ত্রণ রইল না। ফলে অবস্থা এমন দাঁড়াল, মন্ত্রীদের থেকেও কোনও কোনও বাহুবলীর প্রতিপত্তি, সম্পত্তি আকাশ ছুঁতে শুরু করল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অপহরণ থেকে শুরু করে সিপিএম নেতা খুন! পুলিশের খাতায় ‘অপরাধে’র লম্বা তালিকা চোপড়ার জেসিবি-র

Chopra Assault Case: এরপরেই একে একে সামনে আসতে থাকে তাজিমুল তথা জেসিবির অপরাধগাথা। অতীতেও নাকি একাধিক বার ভয়ঙ্কর সব অপরাধ করেছে সে।

গুন্ডাদের কথা হলে অবশ্যই আরাবুল ইসলামের নাম আসে। ভাঙর এলাকার 'ত্রাস'। এই তালিকার শীর্ষে রইবেন অনুব্রত মণ্ডল। জেলে শুকিয়ে গেছেন ঠিকই। কিন্তু বীরভূম জেলার তৃণমূলের সভাপতি এলাকার জনপ্রিয় নেতা এবং মস্তান ছিলেন একইসঙ্গে। বীরভূমের নির্বাচন সামলে দিতেন ঘরে বসেই। তবে অনুব্রত, আরাবুল, শাহজানরা শুধু 'গুন্ডা' ছিলেন না। এদের নামের সঙ্গে তৃণমূলের দলীয় পদও ছিল। জেসিবি এবং জয়ন্ত সিংরা দলীয় পদাশিকারী নন। তবে তারা ছায়া। কাদের? হামিদুল এবং মদন মিত্রের মতো শক্তিশালী স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের।

চোপড়া এবং সন্দেশখালির সাধারণ মানুষরা বলছেন, জেসিবি, শাহজাহানের মতো লোকেরা নির্বাচনের সময় মানুষকে ভয় দেখিয়েছে। দিনের পর দিন এমনভাবে কাজ করেছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যাতে শাসকদল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় এবং এই স্থানীয় নেতাদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। চোপড়ার জেসিবির বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১২টি মামলা রয়েছে। আড়িয়াদহের জয়ন্ত সিংয়ের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মামলা রয়েছে। কিছুদিন জেল খেটের জামিন পেয়ে যান তিনি। অনাদিকাল থেকেই এমনটা ঘটে। রাজনৈতিক দলের হাত মাথায় থাকলে জেল খাটাবে সাধ্য কার! শাস্তি হবে না এ বলাই বাহুল্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'গুন্ডাগিরি'-র বিরুদ্ধে কথা বলেন। শাহজাহানকে গ্রেফতার করাতে তৎপরতা না দেখালে সরকার পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা যদি তৈরি না হতো কেউ কি কোনওদিনও শেখ শাহজাহানের দাপটের আঁচ পেত? শেখ শাহজাহান একইভাবে সন্দেশখালিতে কাজ চালিয়ে যেতেন। আড়িয়াদহের গণপিটুনির ঘটনার আগে ক্লাবের মধ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, কিশোরের যৌনাঙ্গ সাঁড়াশি দিয়ে টানার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। কেই বা সে সবের খবর রেখেছে! এখন জয়ন্ত সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আগেও হয়েছে। খবরের আঁচ কমে যেতেই তারা মুক্তিও পেয়েছে। আসলে তৃণমূল হোক বা যে কোনও শাসক, এলাকায় ভয়ের রাজনীতিই যে ভোটবাক্স ভরায় এই কৌশল সকলের জানা। তাই শাসকের হাত মাথায় নিজে, জেসিবি বা জয়ন্ত সিংদের বাড়বাড়ন্ত চলবেই। প্রশ্ন একটাই, এই বাড়বাড়ন্ত শাসকের ছায়ার থেকেও বড় হয়ে যাবে না তো?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বাংলায় ভোটার যাচাইয়ের প্রভাব মুসলিম এলাকাগুলিতে ছ’গুণ বেশি, বলছে পরিসংখ্যান

Bengal Voter List Review: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা যাচাইয়ে বিচারাধীন ভোটারদের ক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতেই প্রভাব বেশি পড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই এলাকাগুলিতে ভোটার যাচাইয়ের প্রভাব অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় ছ’গুণ বেশি। এই পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো, কোন এলাকার ভোটাররা বেশি প্রভাবিত হলেন এবং এর পিছনে কী কারণ রয়েছে?

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।