ব্রিটেন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বড় মাথাদের ‘স্নেহে’ হিরো জেলনস্কি

ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ব্রিটেনের কাছে সরাসরি সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। বর্তমানে রাশিয়ার আক্রমণে দিনের পর দিন ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে ইউক্রেন। ভয়ে আশঙ্কায় দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। নাগরিকদের উপরেও হামলা চলছে। ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন বহু মানুষ। এইসব যাবতীয় ঘটনা মাথায় রেখে জেলেনস্কির অপরিকল্পিত আবেগে পরিপূর্ণ একটি বক্তৃতার লাইভ ব্রডকাস্ট করা করা হয় ইউরোপের হাউজ অব কমনস্‌-এ। এ জিনিস ইতিহাসে প্রথম। চার্চিলকে উদ্ধৃত করে জেলেনস্কি বলেন, “যে কোনও মূল্যে আমরা আমাদের দেশের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। লড়াই চালিয়ে যাব জঙ্গল থেকে মাঠে, সমুদ্রতীরে, রাস্তায়।” রাশিয়ার কাছে মাথা নত করবেন না বলে শপথ নেন তিনি। বক্তৃতার আগে এবং পরে বিপুল হাততালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান ব্রিটেনের সাংসদেরা। সাধারণত এ ধরনের আচরণের অনুমতি থাকে না হাউজ অব কমন্স্‌-এ। কিন্তু এইবার তারও ব্যতিক্রম ঘটল। গোটা বক্তব্যটি সাংসদদের সুবিধার্থে তাৎক্ষণিক ইংরেজিতে অনূদিত হয়েই সম্প্রচারিত হয়।

শেক্সপিয়রকে উদ্ধৃত করে জেলেনস্কি বলেন, “বাঁচব নাকি শেষ হয়ে যাব সেটাই এখন একমাত্র প্রশ্ন। সেই শেক্সপীয়রীয় প্রশ্নটি! গত তেরোদিন এই দোদুল্যমানতার অবকাশ ছিল। কিন্তু আজ আমি দৃঢ়কণ্ঠে বলছি আমরা বাঁচব, অবশ্যই বাঁচব। আজ কটা কথা আমি আপনাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই। এই কথা ব্রিটেন আগেও শুনেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কথাগুলিই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। চেষ্টা আমরা ক্রমাগত চালিয়ে যাব। আমাদের হারানো যাবে না।” গালে কয়েকদিনের না কামানো খোঁচাখোঁচা দাড়ি, গায়ে চাপা টিশার্ট, জেলেনস্কি বক্তৃতা দিলেন টেবিলের পাশে একটি ইউক্রেনীয় জাতীয় পতাকা রেখে। বরিস জনসন চার্চিলের উপর একটি বই লিখেছেন। তাই জেলেনস্কির বক্তব্যে বারবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চার্চিলের উল্লেখ এক্ষেত্রে সরাসরি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের প্রতি সাহায্যের আবেদনই বলা যেতে পারে।

সমগ্র বক্তব্য একাগ্র মনোযোগ দিয়ে নিঃশব্দে শোনেন সাংসদেরা। প্রাক্তন স্বাস্থ্যসচিব জেরেমি হান্টার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পর্যন্ত জেলেনস্কির সাহসিকতার জন্য তাঁকে সম্মান জানান। প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে যতরকম ভাবে পারা যায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাদি জারি করে রাশিয়াকে ক্রমাগত এ যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য চাপ দিতে থাকবেন। ব্রিটেন ইউক্রেনকে নানা অস্ত্র সরবারাহ বরকরার রাখবে বলেই জানান তিনি। বরিসের বয়ানে, “ইউক্রেনের সাধারণ নাগরিকদেরও এই মুহূর্তে নিজেদের ঘরবারি পরিবার রক্ষার্থে লড়তে হচ্ছে, এই হিংস্র আক্রমণের বিরুদ্ধে তারা অসীম সাহসে লড়ছেন। গোটা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ তাঁদের সাহস ও নিষ্ঠা দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।” ইউক্রেনকে সাহায্য করার বিষয়ে একমত হয়েছে লেবার পার্টিও।

এ পর্যন্ত ইউক্রেনকে প্রায় ২২০ মিলিয়ন ইউরো সাহায্য করেছে ব্রিটেন। যার মধ্যে ১২০ মিলিয়ন মানবিক খাতে সাহায্য। পোল্যান্ড পরিভ্রমণে গিয়ে আরো কিছু নতুন পরিকল্পনার কথা জানান জনসন। রিফিউজিসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনিয়ানদের প্রাণরক্ষার্থে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সুবিধাদি সরবরাহের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে আরো ৮০ মিলিয়ন ইউরো। পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির জন্য আরো ৪০ মিলিয়ন ঘোষণা করা হলে মোট অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ মিলিয়ন ইউরোয়। এই সংস্থাগুলি ইউক্রেনিয়ানদের নূন্যতম ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নানাবিধ জিনিসপত্র সরবরাহের জন্য দিনরাত প্রাণপাত করে চেষ্টা চালাচ্ছে। ২২০ মিলিয়নের বাকি ১০০ মিলিয়ন অর্থনৈতিক খাতের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। জেলেনস্কির ভাষণের পরে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াবার কথা ভাবছে ব্রিটেন। অর্থাৎ ব্রিটেনের সহানুভূতি যে জেলেনস্কি আদায় করতে পেরেছেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এ বিষয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী জানান, “প্রতিটি মুহূর্ত ইউক্রেনিয়ানদের নিজের দেশ বাঁচানোর ইচ্ছাকে আরো বলিষ্ঠ করছে, স্বচ্ছ করে তুলছে। সমগ্র বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ আজ তাদের সাহসে চমকিত। এ যুদ্ধ আগামী কদিন বা কমাস চলবে বলা যাচ্ছে না। তবে আগামীতে যাই হোক না কেন, ইউক্রেনিয়ানরা দেখিয়ে দিয়েছেন তাদের হতোদ্যম করা যাবে না, কোনও অবস্থাতেই দমানো যাবে না ইউক্রেনকে। এটাই বাস্তব। এটাই সত্য। আন্তর্জাতিক কৌম হিসেবে আমাদেরও একটা দায়িত্ব রয়েছে যে ভাবে যতটা পারা যায় ইউক্রনকে সাহায্য করার।”

বিদেশমন্ত্রী লিজ টাস বলেছেন, “বিনা প্ররোচনায় পুতিনের এই আক্রমণের বিরুদ্ধে ইউক্রেনিয়ানদের পূর্ণ সমর্থন করার একটা দায়বদ্ধতা আমাদের রয়েই যায়। ব্রিটেন এ মুহূর্তে সাহায্যকারীদের মধ্যে সামনের সারিতে। আমরা মানবিক পরিষেবা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক–যাবতীয় সাহায্য করতে প্রস্তুত। ইউক্রেনিয়ানদের প্রতি আমাদের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। আপনাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে আমরা আপনাদের পাশে রয়েছি। যে অর্থনৈতিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তা উদ্দেশ্য মূলত রাশিয়ার গ্যাসের উপর ইউক্রেনের নির্ভরতা কমিয়ে ফেলা। সাম্প্রতিক সাহায্যগুলির পরিকল্পনা করার সময় মাথায় রাখা হয়েছে রেড ক্রস আন্দোলনটিকে। ইতিমধ্যে তারাও আন্তর্জাতিক সাহায্য চেয়েছে। ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার এই অনৈতিক আক্রমনে প্রায় সত্তর লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হতে পারে বলে আশঙ্কা। এই বিপদ রুখতেই পৃথিবীর কাছে আবেদন করেছেন আন্দোলনকারীরা। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জও এই আবেদনে সাড়া দিয়েছে।” এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য জেনিভায় ব্রিটেনের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবিক সহায়তা বিষয়ক বিভাগের আধিকারিক এবং জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী মার্টিন গ্রিফিথ একটি সভা করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন হাই কমিশনার অব রিফিউজিস ফিলিপো গ্রান্ডিও।

অন্য দিকে রাশিয়ায় নিজেদের সংস্থার ঝাঁপ বন্ধ করেছে ম্যাকডোলান্ড, স্টারবাক্স। বাইডেন প্রশাসন রাশিয়া থেকে জ্বালানি না নেওয়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে গাঁটের কড়ি বেশি দিয়েই হয়তো বাইডেন প্রশাসন। যুদ্ধ নয়, নিষেধাজ্ঞা দিয়েই আপাতত রাশিয়াকে বিঁধতে তরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও।

More Articles

;