সূর্যের গায়ে পৃথিবীর সমান বড় দাগ! ধ্বংস হতে পারে পৃথিবী?

Sunspot: এই দাগটি তাক করে রয়েছে সরাসরি পৃথিবীর দিকেই। যে সাম্ভাব্য ঘটনাগুলি ঘটতে পারে-

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
সূর্যের গায়ে পৃথিবীর সমান বড় দাগ! ধ্বংস হতে পারে পৃথিবী?

অশনিসংকেত পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বিপদের অ্যালার্ট দিচ্ছে সূর্যের গায়ে জন্ম নেওয়া সৌরকলঙ্ক। যে দাগে আকারে প্রায় পৃথিবীর সমান বড়। তথ্য বলছে জেটগতিতে বাড়ছে এই দাগ। এই প্রতিবেদন লেখার দিন তিনেক আগেও যা ছিলো ক্ষুদ্র একটি দাগ, তা

আটচল্লিশ ঘন্ট দশগুণ বড় একটি সৌরকলঙ্ক বা সানস্পটে পরিণত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, এই দাগটি তাক করে রয়েছে সরাসরি পৃথিবীর দিকেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর ফলে যে সাম্ভাব্য ঘটনাগুলি ঘটতে পারে, তার মধ্যে একটি হল সৌরঝড় ধেয়ে আসতে পারে পৃথিবীর দিকে।

"স্পেসওয়েদার ডট কমের" (SpaceWeather.com) তরফে জানা যাচ্ছে, এই সানস্পট বা সূর্যকলঙ্কটির নাম দেওয়া হয়েছে “AR3085”, যেটি কিছুদিন আগেও ক্ষুদ্র ছিলো আকারে। এখন সেটি আকারে কেবল বড়োই হয়নি, তার আকার পরিবর্তিত হয়ে

এখন সে দুটি সৌরকলঙ্কে পরিণত হয়েছে।

বিস্তারিত আলোচনার আগে জানা যাক সানস্পট বা সৌরকলঙ্ক কী। সৌরকলঙ্ক সূর্যের গায়ে তৈরি হওয়া বৃহৎ, কালো অঞ্চল; যে অঞ্চলে তৈরি হয় একটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র। নির্দিষ্ট এই অঞ্চলে সৌরপৃষ্ঠের বাকি অংশের তুলনায় তাপমাত্রা তুলনামূলক ভাবে কম থাকে বলে এই অঞ্চলকে দেখতে কালো লাগে। সৌরকলঙ্কের তাপমাত্রা এই কারণেই কম থাকে। সৌরকলঙ্ক কিন্তু সূর্যের গায়ে যে কোনো অঞ্চলে অংশে তৈরি হতে পারে না। সূর্যের যে অংশে উচ্চ এবং ঘন চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, সেই অংশে সূর্যের গর্ভ থেকে বাইরের দিকে (পৃষ্ঠ) উষ্ণ গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। উষ্ণ গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে, স্বাভাবিক নিয়মে সেই অঞ্চল ঠান্ডা হয়ে যায়।

সৌরকলঙ্ককে এই বিশাল পরিমাণ চৌম্বক ক্ষেত্র একত্রিত হওয়ার ফলে অধিকাংশ সময়েই তৈরি হয় "সোলার ফ্লেয়ার", যা পৃথিবীর বুকে ধেয়ে আসে সৌরঝড় রূপে। সোলার ফ্লেয়ার এবং সৌরঝড় আদতে ভীষণ শক্তিশালী চৌম্বকীয় তরঙ্গ।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ঠিক সেইরকমই কিছু হতে পারে এবার। যত বেশি সংখ্যায় এই এরকম সৌরকলঙ্ক দেখা যাবে, ততই বাড়বে "সোলার ফ্লেয়ার" এবং সৌরঝড় বা "সোলার স্টর্ম" তৈরি হওয়ার আশঙ্কা।

"স্পেসওয়েদার ডট কম" সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে, সূর্যে তৈরি হওয়া এই বিশাল অঞ্চল থেকে ইতিমধ্যেই "সোলার ফ্লেয়ার" তৈরি হয়ে, মহাকাশের বিভিন্ন অংশে ধেয়ে যাচ্ছে। সাধারণত সোলার ফ্লেয়ার আলট্রা-ভায়োলেট রে এবং এক্স- রে হিসেবে ধেয়ে আসে। তবে আশার বিষয় হল, এখনও পর্যন্ত নতুন তৈরি হওয়া এই সৌরকলঙ্ক থেকে যত সোলার ফ্লেয়ার তৈরি হয়েছে সেগুলো

বেশিরভাগই দূর্বল প্রকৃতির; এবং সেই জন্যেই তাদের “C-class” সোলার ফ্লেয়ারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। “A”, “B” এবং “C-class” সোলার ফ্লেয়ারের তেজ অপেক্ষাকৃত কম; এবং সাধারণত পৃথিবীর উপর এদের প্রভাব ক্ষীণ।

সোলার স্টর্ম

ধেয়ে আসলে প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়ানো স্যাটেলাইট, যার ফলে ইন্টারনেট এবং মোবাইল পরিষেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ব্যহত হতে পারে বিদ্যুত পরিষেবা। কারণ সোলার স্টর্মের সাথে ধেয়ে আসা তীব্র শক্তিসম্পন্ন ম্যাগনেটিক ওয়েভ বিদ্যুত গ্রিডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

“M-class” সোলার

ফ্লেয়ার তুলনামূলক ভাবে বেশি শক্তিশালী। পৃথিবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনাও তাদের বেশি।“M-class” সোলার ফ্লেয়ারের জন্যে পৃথিবীর উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলিতে রেডিও ব্ল্যাকআউট হওয়া এবং স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায়শই থেকে থাকে।

“X-class”

সবথেকে বেশি শক্তিশালী হল সোলার ফ্লেয়ার। যার ফলে অনায়াসেই পৃথিবীর কক্ষপথচ্যুত হতে পারে স্যাটেলাইট এবং পৃথিবীর উচ্চ অক্ষাংশ ছাড়াও অন্যান্য অংশেও রেডিও ব্ল্যাকআউট হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুতগ্রিডও সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যেতে পারে “X-class” মতো শক্তিশালী সোলার ফ্লেয়ারের প্রভাবে, জানা যাচ্ছে নাসার তরফে।

যদি আরও বাড়তে থাকে সৌরকলঙ্কের আকৃতি, সেই অঞ্চল থেকে ছিটকে বেরোনো ম্যাগনেটিক ক্ষেত্রের শক্তিও বাড়বে

পাল্লা দিয়ে। সে ক্ষেত্রে সোলার ফ্লেয়ারের তীব্রতা এবং শক্তি বাড়বে। এবং তা যদি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে তাহলে স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট পরিষেবা থেকে শুরু করে, বিদ্যুত এবং রেডিও পরিষেবা বিপর্যস্ত হবে। ২০২২ সালেই বেশ কয়েকবার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এসেছে একাধিক “X-class” সোলার ফ্লেয়ার।

সোলার স্টর্ম

বা সৌরঝড় ঘটার ঘটনা ২০২১ সাল থেকে চলতি বছর অবধি ক্রমেই বাড়ছে। সৌরঝড় এবং সৌরকলঙ্ক তৈরি হওয়ার প্রবণতা, এই দুইয়ের সাথেই যুক্ত আছে সৌরবছরের সম্পূর্ণ করার ঘটনা।

সূর্যের গায়ে সবচেয়ে বেশি সোলার স্পট বা সৌরকলঙ্ক তৈরি হয় যখন "সোলার ম্যাক্সিমাম" দশা (Phase) চলে সূর্যের। এই সময়ে সূর্যের সক্রিয়তা সবথেকে বেশি হয়। পরবর্তী "সোলার ম্যাক্সিমাম" ঘটতে চলেছে ২০২৫ সালে। আশঙ্কা করা হচ্ছে সূর্যের সক্রিয়তা চরমে পৌঁছলে একশো পনেরোটির কাছাকাছি সৌরকলঙ্ক তৈরি হবে সূর্যের গায়ে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই বৃহৎ সৌরকলঙ্ক পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারে কি-না। আসা যাক সেই প্রসঙ্গে।

"ন্যাশানাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনস স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন"-এ গবেষণারত ডগ বিসেকারের মতে, "আর যাই হোক সোলার ফ্লেয়ার আজ অবধি পৃথিবীকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ক্ষতি করেনি। আমি জানি না সোলার ফ্লেয়ার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে । এখনও অবধি এত ভয়ংকর সোলার ফ্লেয়ার এবং সৌরঝড় আমরা দেখিনি, যার জন্যে আমাদের গ্রহ বা আমাদের ক্ষতি হতে পারে" (সূত্র: লাইভ সায়েন্স)।

২০১১ সালে যখন সারা পৃথিবী আতঙ্কে ভুগছে ২০১২ সালে ধেয়ে আসা সোলার ফ্লেয়ারে ধ্বংস হবে পৃথিবী তখন একটি ভিডিওতে নাসার গোদার স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের হেলিওফিজি়ক্স সায়েন্স বিভাগের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর অ্যালেক্স ইয়াং জানিয়েছিলেন, "বিগত দশ হাজার বছরে প্রবল শক্তিশালী যত সোলার ফ্লেয়ার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এসেছে, তাদের কারোর প্রভাবেই পৃথিবীর চরম কোনো ক্ষতি হয়নি। এমনকি পৃথিবীকে আবৃত করে রাখা চৌম্বক-বলয় বা ম্যাগনেটো-স্ফিয়ারকেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি"।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে যে ভুলগুলি এড়ানো জরুরি

Stock Market Psychology: শেয়ারবাজারে একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় সে নিজেই। আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক বাজারে এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ।

মহাবিশ্বকে বুঝতে গিয়ে সমাজকে ভুলে যাননি অশোক সেন

পিএইচডির প্রথম প্রায় তিন বছর তাঁর গবেষণায় কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিই হয়নি। চারদিকে শুধু স্থবিরতা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন বা হতাশ হয়ে পড়েন, অশোক সেন তা করেননি।

মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?

The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।

ডার্কওয়েবে SBI-র তথ্য ফাঁস, কতটা সুরক্ষিত আপনার সঞ্চয়? যা জানাচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ

সন্দীপ সেনগুপ্তের পরামর্শ, যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তিনি এমনকি ব্যাঙ্কে রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর পরিবর্তন এবং নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার কথাও বলেছেন।

আইনস্টাইনের কাল্পনিক পরীক্ষা এবার বাস্তবে, কোয়ান্টাম জগতের কণা-তরঙ্গ রহস্যের কী হলো?

Einstein Bohr quantum debate: সম্প্রতি ১০০ বছর আগের আইনস্টাইনের সেই কাল্পনিক পরীক্ষাটি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়না (USTC)-এর বিখ্যাত কোয়ান্টামবিজ্ঞানী জিয়ান-উই প্যান (Jian-Wei Pan) এবং তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবরেটরিতে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?