ড্রোন নয়, সমুদ্রে বেপথুকে খুঁজতে একসময় ব্যবহার হত কবুতর-বাহিনী

Pigeons, Sea Rescuers: সবচেয়ে বড় কথা অনেক সহজে অতিবেগুনি রশ্মি বা ইউভি লাইট চোখে দেখতে পায় পায়রারা। আর সেই গুণটাই কাজে লাগাতে চেয়েছিল মার্কিন উপকূলরক্ষা বাহিনী।

Sohini Das
৩ মিনিট
ড্রোন নয়, সমুদ্রে বেপথুকে খুঁজতে একসময় ব্যবহার হত কবুতর-বাহিনী

সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া নাবিককে দিশা দেখাত লাইট হাউজেরা। সেই বাতিঘরের আলো বন্দরে ফিরিয়ে আনত বেপথু নাবিক, সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া মানুষকে। কিন্তু বাতিস্তম্ভের আলো দেখে যে ফিরে আসতে পারবে না নিজে নিজে, তাঁকে কীভাবে খুঁজে বের করা হবে।

এখন তার জন্য উপকূলরক্ষা বাহিনীর কাছে নানা কৌশল, নানা ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে টহলদার হেলিকপ্টার, ড্রোন দিয়ে নজরদারির ব্যবস্থা। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন এত সব প্রযুক্তিগত সাহায্য থাকত না উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাছে। ফলে সে সময় ভরসা করতে হত এমন কিছুর উপরে যা আসলে ভীষণ রকম প্রাকৃতিক।

এখনকার মতো আধুনিক ড্রোন তাদের হাতে না থাকলেও তাদের হাতে এক প্রাকৃতির ড্রোন তুলে দিয়েছিল প্রকৃতি। প্রয়োজন ছিল শুধু প্রশিক্ষণের। কবুতরের পায়ে বেঁধে চিঠি আদানপ্রদানের গল্প তো আমরা অনেক শুনেছি। এমনকী নব্বই দশকের একটি হিন্দি ছবিতে দুর্দান্ত ভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল পায়রার এই দুর্দান্ত ক্ষমতা। এমনকী তা নিয়ে একটি জনপ্রিয়তম গানও রয়েছে লতা মঙ্গেশকর ও বালা সুব্রহ্মন্যমের গলায়। কিন্তু সেই পায়রাই যে এনে দিতে পারে অতল সমুদ্রের মাঝখানে হারিয়ে যায় বিপন্ন মানুষের খোঁজ, তা ভাবা কঠিন। কিন্তু একটা সময় এমন কাজই করেছিল মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টয়লেট পেপার নয়, এক সময়ে ভুট্টাই ছিল মানুষের শৌচাগারের অন্যতম সঙ্গী

Before Toilet Paper: মার্কিনরা নাকি নিজেকে পরিষ্কার রাখার অন্যতর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করত শুকনো ভুট্টার কাণ্ডকে।

তা সেনাবাহিনীর কাজে এমন প্রাণীদের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। পুলিশ কুকুর বা সেনাকুকুরের ব্যবহার তো আমরা প্রায়শই দেখি বিভিন্ন অভিযানে। বহু সময়েই জলের নিচে নজরদারির জন্য ডলফিনদের ব্যবহার করার নজির ছিল, এমনকী কাজে লাগানো হত উটকেও। আর এমন সব নজিরই বোধহয় মার্কিন সেনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল পায়রাকে ড্রোন হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

সেটা ১৯৭০ সালের ঘটনা। একবার মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী ঠিক করেন, তারা এবার থেকে সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খোঁজা ও উদ্ধারের কাজে ব্যবহার করবেন পায়রাকে। ওই প্রকল্পের নাম রাখা হল প্রজেক্ট সি হান্টস গোল। যন্ত্রের বদলে রিয়েল টাইম স্পটার দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো আরও বেশি সহজ হবে। এমন একটা বিশ্বাস থেকেই শুরু হল পায়রাদের প্রশিক্ষণ। যদিও উপদ্রবকারী পাখি হিসেবে বেশ নামডাক ছিল পায়রার, তা সত্ত্বেও দু'টো গুণের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল পায়রাকেই। কী কী গুণ! প্রথমত, খুব তাড়াতাড়ি প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় পায়রাকে, দ্বিতীয়ত পায়রার চোখের দৃষ্টি মারাত্মক। অন্যান্য বহু পাখির মতোই পায়রাও বহু দূরের জিনিস চোখে স্পষ্ট দেখতে পায়। সবচেয়ে বড় কথা অনেক সহজে অতিবেগুনি রশ্মি বা ইউভি লাইট চোখে দেখতে পায় পায়রারা। আর সেই গুণটাই কাজে লাগাতে চেয়েছিল মার্কিন উপকূলরক্ষা বাহিনী।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গাছ চেরাই নয়! জানেন, চেনের করাত প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল সন্তানের জন্ম দিতে!

Chainsaw for Child Birth: খানিকটা পেনসিল ছোলার মতো করেই, করাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শ্রোণী অঞ্চল কেটে ফেলতেন ডাক্তাররা।

প্রায় ৬ মাস ধরে লাগাতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল একদল পায়রাকে। হলুদ, কমলা ও লাল রঙের যে কোনও বস্তু যাতে সমুদ্রের মধ্যে থেকে চিহ্নিত করতে পারে তারা। কেন এই তিনটি রং! কারণ যে কোনও ভাসমান ডিভাইস বা রাফ্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত রং নাকি এই তিনটেই। প্রশিক্ষণের পর হেলিকপ্টারের নিচে পায়রাদের জন্য তৈরি হয় একটি বিশেষ চেম্বার, যেখান থেকে নীচেটা স্পষ্ট দেখা যায়। এমনভাবেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যাতে উজ্জ্বল কোনও রং দেখতে পেলেই তারা সেই কক্ষে রাখা বিশেষ প্যাডেলে চাপ দেয়, এবং সেই সংকেত চলে যায় সোজা উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাছে। পরীক্ষায় দেখা যায়, ৯০ শতাংশ সময়েই ওই উজ্জ্বল জিনিসগুলি চিহ্নিত করতে সফল হয়েছে পাখিগুলি। যেখানে মানুষের সাফল্য়ের হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। ফলে এই প্রকল্প যে সুপারডুপার হিট হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এই প্রকল্পের খরচ ছিল বেশ বেশি। আগামী দু'বছরে এই প্রকল্প বাবদ যে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল উপকূলরক্ষী বাহিনী, তা ছিল চমকে ওঠার মতোই। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ১২ কোটি টাকারও বেশি অর্থমূল্যের লক্ষ্য রেখেছিল তারা। ১৯৮০ সাল নাগাদ ফেডারেল বাজেট কমানোর প্রশ্ন উঠতেই প্রথম কোপ পড়ে প্রজেক্ট সি হান্ট-এ। বন্ধ হয়ে যায় পায়রাদের প্রশিক্ষণ ও তাদের দিয়ে উদ্ধারের কাজও।

এর মধ্যে আরও একটু দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। গোটা প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রথম যে তিনটি পায়রা উপকূলরক্ষী বাহিনীর স্কুল থেকে স্নাতক হয়ে ফিরেছিল, একটি দুর্ঘটনায় তাদের হারায় আমেরিকা। এরবার একটি অভিযানে গিয়ে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে সমুদ্রে ভেঙে পড়ে একটি কপ্টার। পাইলট-সহ অন্যান্যরা বেরিয়ে আসতে পারলেও সলিল সমাধি হয় তিনটি পায়রার। ওই প্রজেক্ট সি হান্টের আওতায় প্রায় ১০টি পায়রাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল নৌবাহিনী। তার জন্য ভালোই খরচা করতে হয়েছিল উপকূলরক্ষা বাহিনীকে।

যাই হোক, খরচ, পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ ও লক্ষ্যবস্তু খুঁজে আনতে প্রায় ৯০ শতাংশ সাফল্যের পরেও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি পায়রার ব্যবহার। তার জায়গা পরবর্তীকালে নেয় ড্রোন। আরও তীক্ষ্ণ, আরও নির্ভুল দৃষ্টিতে সমুদ্রে বেপথু মানুষকে, জাহাজ কিংবা নৌকাকে খুঁজে আনছে তারা। ব্যবহার চলছে কপ্টারেরও। তবে যে ভাবে পায়রাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের অভিনব ভাবে কাজে লাগিয়েছিল সে সময় মার্কিন উপকূলরক্ষা বাহিনী, তা কিন্তু জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।