বোদাগঞ্জ থেকে মেটেলি, ডুয়ার্স ভ্রমণে যে ঐতিহাসিক মন্দিরগুলি দেখতেই হবে

Historical Temples of Dooars: বিগ্রহের নাম পেটকাটি মাতা। বিগ্রহটি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর। কালো পাথরে তৈরি মূর্তিটি আসলে বজ্রযানী বৌদ্ধ দেবী 'চচিকা'।

Sindhu Som
৩ মিনিট
বোদাগঞ্জ থেকে মেটেলি, ডুয়ার্স ভ্রমণে যে ঐতিহাসিক মন্দিরগুলি দেখতেই হবে

জলপাইগুড়ি-ডুয়ার্সের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিছু পরিচিত, কিছু অতি স্বল্প পরিচিত। আসুন, এক ঝলক চোখ বোলানো যাক ডুয়ার্সের কিছু ঐতিহাসিক মন্দিরে─

ভ্রামরী দেবীর মন্দির

বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চলের মধ্যে তৈরি ভ্রামরী দেবীর মন্দির উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের কাছে পবিত্র স্থান। প্রতিদিনই এ'খানে ভক্তরা ভিড় করেন। কালী পুজো কিংবা অন্যান্য পার্বনের দিনে ভিড় উপচে পড়ে। মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি বাজারও তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই সতীপীঠ খুব জাগ্রত। মূল মন্দিরে প্রবেশ পথে সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তি আছে। মূলমন্দিরে দেবীমূর্তি রয়েছে । দেবী অলঙ্কারে ভূষিত ও অষ্টভূজা । দেবীর সামনে বড় বড় কলস আছে। কলসের উপরে পুষ্পপত্র আছে । এর পাশে আছে পিতলের দেবী চরণযুগল। দেবীর ডানদিকে মহাদেবের মূর্তি আছে । এই কক্ষের নীচে কয়েক সিঁড়ি পরে মন্দিরের গর্ভগৃহ। দেবী সিংহবাহনী ও কৃষ্ণবর্না। সামনের বেদীতে রয়েছে দেবীর প্রস্তরীভূত বামপদ। শরত্‍কালে নবরাত্রির পূজা হয় মন্দিরে । দেবীর আরাধনা করতে প্রচুর ভক্ত আসে। এ'ছাড়াও এ'খানে বিভিন্ন পুজো হয়। মন্দিরে দূর্গা পূজা ও মাঘি পূর্নিমায় বিশেষ পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

জল্পেশ মন্দির

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কুখ্যাত মিহির সর্দারের ডেরা থেকে 'দুর্গেশনন্দিনী'র মন্দির, কেন এত জাগ্রত হুগলির সিদ্ধেশ্বরী কালী?

Siddheswari Temple, Hooghly: কালক্রমে সিদ্ধেশ্বরী কালী হয়ে উঠেছিল ডাকাতদের আরাধ্য দেবী। সেই মন্দিরবক্ষেই আশ্রয় পেত ডাকাতদল। যেমন হুগলির গোঘাটের এই সিদ্ধেশ্বরী মন্দির ছিল মিহির সর্দারের ডেরা।

পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে দেবী সতীর বাম চরণ ত্রিস্রোতায় পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম ভ্রামরী, ভৈরবের নাম ঈশ্বর বা জল্পেশ। ভ্রামরীর মন্দিরের কথা আপনাদের জানিয়েছি। এইবারে জল্পেশ মন্দির। তিস্তা ব্রিজ পার করে ময়নাগুড়ি এলাকার দুর্গাবাড়ি মোড় থেকে ডানদিকে এগোলে জল্পেশ মন্দির। জরদা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা অসমরাজ জল্প। পরে, কোচবিহারের মহারাজা প্রাণ নারায়ণ ও মোদনারায়ণ মন্দিরটি দিল্লি থেকে শিল্পী এনে মন্দিরটির পুনঃনির্মাণ করেন। জুলাই-অগাস্ট মাসে ভগবান শিবের কাছে বিশেষ পূজা করার জন্য, ফেব্রুয়ারি-আগস্ট মাসে শ্রাবণী মেলায় তীর্থযাত্রীরা আসে। সপ্তদশ শতকে মন্দির পুনঃনির্মাণের পর থেকেই এখানে ফাল্গুন শিব রাত্রিতে বিখ্যাত মেলার সূচনা। সেই দিক থেকে মেলাটি গোটা রাজ্যেরই প্রাচীন মেলাগুলির অন্যতম। মেলাতে কয়েক লক্ষ লোকের সমাগম হয়।

জটিলেশ্বর মন্দির

জল্পেশের থেকে ৬ কিমি দূরত্বে চূড়াভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত এই জটিলেশ্বর মন্দির। সপ্তরথ নক্সার এই মন্দিরটির স্থাপত্যকলাও অনিন্দ্য। মন্দির মন্দির দেওয়ালের বাইরে অসংখ্য যক্ষিনী মূর্তি, গনেশ, বুদ্ধ, কুবেরের মূর্তি। এ'খানে শিবলিঙ্গ হল জল লিঙ্গ। অর্থাৎ শিবলিঙ্গ এখানে গর্তের মধ্যে থাকে। যাকে অনাদিও বলা হয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এখানকার বিষ্ণুপটটিকে 'অমূল্য সম্পদ' বলেছেন। সেটি রাজ্য সরকারের প্রত্নবিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত। মন্দিরের প্রবেশপথে দ্বারপাল মূর্তি দুটিও দর্শনীয়। মন্দিরের পুবদিকে ১৫ বিঘার এক বিরাট পুকুর রয়েছে। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসবেও জল্পের নাম উঠে আসে।

পেটকাটি মন্দির

ময়নাগুড়ি হাসপাতালের কাছেই মরাখাওয়া নদীর তীরে একটি প্রাচীন কালীমূর্তি উদ্ধার করেছিলেন বেঙ্‌কান্দি গ্রামের লোকেরা। সেখানে এখন টিনে ছাওয়া পাকা দেওয়ালের মন্দির। মন্দিরটির চারপাশে প্রাচীর রয়েছে। বিগ্রহের নাম পেটকাটি মাতা। বিগ্রহটি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর। কালো পাথরে তৈরি মূর্তিটি আসলে বজ্রযানী বৌদ্ধ দেবী 'চচিকা'। দশভূজা বিগ্রহের ডান দিকের ও বাম দিকের দুটি করে হাত ভাঙা। ডান দিকের হাতে হাতি, কঙ্কাল, বাদ্যযন্ত্র, বাম দিকের হাতে ঘণ্টা, ছিন্নমুণ্ড ও শবদেহ। দেবীর গলায় সাপ, কর্ণাভরণ এবং মুকুটেও জড়িয়ে রয়েছে সাপের অবয়ব। পদপ্রান্তে বসে আছেন যক্ষিনী। একদিকে শেয়াল, অন্যদিকে ময়ূর। পদ্মাসনা দেবীর নাকটি ভাঙা। বক্ষদেশের নিচে পাঁজরে বৃশ্চিকমূর্তি। দেবীর উদর কঙ্কালসার। সম্ভত তার থেকেই নাম হয়েছে পেটকাটি।

মন্দির প্রাঙ্গণে প্রচুর পাথর ইতস্তত ছড়ানো। জটিলেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে এগুলির সাযুজ্য রয়েছে। মন্দিরটিকে চালু বিভিন্ন ধরনের কাহিনিও।

মেটেলি কালীবাড়ি

চালসা থেকে পাহাড়ি চড়াই পথে সামসিং। মেটেলিকে বলা হয় ডুয়ার্সের রানি। চারিদিকে শুধুই সবুজ আর সবুজ। দিগ্নত পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চা-বাগানের মাঝখান দিয়ে একফালি রাস্তা। মেটেলি চৌপথিতে থানার পাশেই রয়েছে ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি কালীবাড়ি। একশ বছর পরে ১৯৭২ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কালিকানন্দ অবধূতের 'বশীকরণ' বইটিতে এই কালীবাড়ির মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। মেটেলি কালীবাড়ি গড়ে তোলা হয়েছিল চা-বাগানের ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার একটি কেন্দ্র হিসেবে। সংলগ্ন ১২টি চা-বাগানের কর্মীরা বিভিন্ন পূজা-পার্বণে, বিশেষত দুর্গাপুজোর সময়ে মন্দির প্রাঙ্গণে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেই দিক থেকে মন্দিরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।