কোথাও অস্ত যায় না সূর্য, কোথাও আকাশে রঙের খেলা || এই দেশগুলিতে দিন-রাত নিয়ম মেনে আসে না

Land of Midnight Sun: পৃথিবীতে এমনও কয়েকটি জায়গা আছে, যেখানে ছয় মাসেরও বেশি অস্ত যায় না সূর্য।

AR

২৪ ঘণ্টায় ১ দিন, তার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা রাত আর ১২ ঘণ্টা দিন- একথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু পৃথিবীতে এমনও কয়েকটি জায়গা আছে, যেখানে ছয় মাসেরও বেশি অস্ত যায় না সূর্য। অর্থাৎ, ছ'মাস এখানে কখনও রাত হয় না। আবার উল্টোটাও দেখা যায়। সেই অবিরত সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তর দেশগুলোর খোঁজ নেওয়া যাক।

হ্যামারফেস্ট (নরওয়ে)
পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে সূর্য রাত ১২-১টার মধ্যে অস্ত যায় এবং মাত্র ৪৫ মিনিট পরেই আবার উদিত হয়! এই অত্যাশ্চর্য দৃশ্য উত্তর নরওয়ের হ্যামারফেস্ট শহরে দেখা যায়। এখানে, মধ্যরাতে সূর্য অস্ত যাওয়ার মাত্র ৪০-৪৫ মিনিটের মধ্যেই পাখির ডাক শোনা যায়। এই ঘটনাপ্রবাহটি কেবল এক-দুই দিন নয়, প্রায় আড়াই মাস ধরে চলে। এই ৪০ মিনিটের রাতের পিছনে একটি সূক্ষ্ম গণিত লুকিয়ে আছে। আমরা ভূগোলে পড়েছিলাম, পৃথিবী প্রায় ৬৬ ডিগ্রি কোণে ঘোরে। এই কারণে দিন ও রাতের সময়ের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ফলত, ২১ জুন নরওয়েতে ৪০ মিনিটের রাতের পরিস্থিতি হয়। এই সময়ে, ৬৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৯০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত পৃথিবীর সমগ্র অংশ সূর্যালোকের অধীনে থাকে এবং এই কারণে সূর্য মাত্র ৪০ মিনিটের জন্য অস্ত যায়। এই সম্পূর্ণ ঘটনা প্রায় আড়াই মাস চলে। এমনিতে হ্যামারফেস্ট একটি খুব সুন্দর জায়গা। এখানকার মানুষ সহজ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এমনিতে নরওয়ে সৌন্দর্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এটি বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। শুধু তাই নয়, এখানকার মানুষ স্বাস্থ্য নিয়েও অনেক সচেতন। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নরওয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য বললে একটু ভুল হবে। জেনে রাখা দরকার যে, এই দেশটি আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে পড়ে। এখানে মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ৭৬ দিন সূর্য অস্তই যায় না। এই কারণেই নরওয়েকে কান্ট্রি অফ মিডনাইট সান বলা হয়।

আরও পড়ুন: সূর্যের গায়ে পৃথিবীর সমান বড় দাগ! ধ্বংস হতে পারে পৃথিবী?

নুনাভ্যাট (কানাডা)
রাতের আকাশ জুড়ে রঙিন ফিতেজাতীয় কিছু নাচছে, এমন দৃশ্য প্রথমবার দেখলে যে কেউ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবে। বরফের মধ্যে শুয়ে মাথার ওপরে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য লাইট শো দেখছেন, কী দারুণ ব্যাপার না! সৌভাগ্যক্রমে, আপনি নুনাভ্যাটে গিয়ে এই দৃশ্য দেখার সুযোগ পেতে পারেন। নুনাভ্যাটের বেশিরভাগ অঞ্চলেই অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে খুব ছোট দিন থাকে। কখনও কখনও তো মাত্র চার ঘণ্টা দিনের আলো পাওয়া যায়। যদি কেউ অন্ধকারকে ভয় পায়, তবে এই জায়গাটি তার জন্য নয়। তবে যারা অরোরা বোরিয়ালিস-কে কাছ থেকে উপভোগ করতে চায়, তাদের জন্য এই জায়গা উপযুক্ত। লাল, নীল এবং সবুজ রেখাগুলি শরৎ এবং শীতের মাসগুলিতে সমগ্র অঞ্চলজুড়ে দেখা যায়। আর রাতে নুনাভ্যাটের রাজধানী ইকালুইতে সবচেয়ে সুন্দরভাবে পরিলক্ষিত হয় অরোরা বোরিয়ালিস। রাতের বেলা শহরে থাকলে হোটেলের জানলা দিয়েই দেখতে পাবেন ওই মনোরম সুন্দর দৃশ্য।

অবশ্য গ্রীষ্মের মাসগুলিতে আবার, ঘটনা পুরো উল্টো। গ্রীষ্মে এই রাজধানী শহর ইকালুই-তেই ২১ ঘণ্টা দিন থাকে। এরপর নুনাভ্যাটের যত উত্তরের দিকে যাবেন দেখবেন সেখানে প্রায় সারাদিনই সূর্য আপনার মাথার ওপর গমগম করছে। এখানে মাছ ধরা সম্ভব, বন্যপ্রাণী দেখতে পাওয়া যাবে, করা যাবে হাইকিংও। এমনকী, মধ্যরাতে ম্যারাথনে অংশ নিতেও পারেন! অরোরা-কে পিছনে রেখে সুন্দর সুন্দর ছবিও তুলতে পারেন, যা স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে।

ব্যারো (আলাস্কা)
আপনি যত উত্তর মেরুর দিকে অগ্রসর হবেন, লক্ষ্য করবেন যে, গ্রীষ্মকালে দিন দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং শীতকালে রাত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গ্রীষ্মের মাসগুলিতে, আলাস্কার সমস্ত অংশে দিনের আলো বেশিক্ষণ থাকে।আর্কটিক সার্কেলের ওপরে আলাস্কার উত্তর ভাগের একটি গ্রাম ব্যারো। এখানে সূর্য ৮৪ দিন ধরে অস্তই যায় না। গ্রীষ্মকালে আলাস্কার মধ্যভাগ অর্থাৎ, অ্যাঙ্কোরেজে সূর্য রাত পৌনে এগারোটা নাগাদ অস্ত যায়। এমনকী, দক্ষিণ-পূর্ব আলাস্কায়, গ্রীষ্মে রাতের অন্ধকারতম সময়গুলিকে দেখলেও মনে হবে কলকাতার বিকেলবেলা। এই ঘটনাটি সাধারণত মিডনাইট সান নামে পরিচিত। এই অঞ্চলে মে মাসের শেষ  থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত এখানে সূর্য অস্ত যায় না। কিন্তু নভেম্বরের শুরু থেকে পরবর্তী ৩০ দিন আবার এখানে সূর্য ওঠে না। যার অর্থ হলো, শীতের মাসগুলিতে সমগ্র দেশ অন্ধকারে থাকে। এই ঘটনাটি পোলার নাইট নামে পরিচিত।

ফিনল্যান্ড
ফিনল্যান্ডকে হ্রদ এবং দ্বীপপুঞ্জের দেশ বলা হয়। ফিনল্যান্ডের বেশিরভাগ অংশে গ্রীষ্মকালে টানা ৭৩ দিন ধরে সূর্য আকাশে থাকে। তবে গোটা শীতকালে যেখানে শীতকালে এখানে সূর্যের আলো দেখা যায় না। তাই এখানকার মানুষ গ্রীষ্মে কম এবং শীতকালে বেশি ঘুমোয়। ফিনল্যান্ডে গ্রীষ্মকাল বছরের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় সময়। আর্কটিক সার্কেলের উত্তরে মে থেকে অগাস্ট পর্যন্ত সূর্য একেবারেই অস্ত যায় না। তখন রাতগুলিতে দিনের মতো আলো থাকে। পার্থক্যের মধ্যে শুধু আলোর অবিশ্বাস্য পরিবর্তন দেখা যায়। এই সময় ফিনল্যান্ডের আকাশে সূর্য একটি লালচে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। দেখলে মনে হবে, ঠিক যেন সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময়। এমন মধ্যরাতের সূর্যের নিচে সময় কাটাতে সকলেরই লোভ লাগা স্বাভাবিক। আবার শীতকালে এখানে সূর্য দেখাই যায় না। আপনি এই সময় এখানেও অরোরা বোরিয়ালিস দেখতে পাবেন। ঘুরতে গেলে এই দৃশ্য মিস করবেন না যেন!

আইসল্যান্ড
গ্রেট ব্রিটেনের পরে আইসল্যান্ড হলো ইউরোপের বৃহত্তম দ্বীপ। এটিই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে একটাও মশা নেই। উত্তর গোলার্ধের উত্তর দিকে অবস্থানের জন্য আইসল্যান্ডে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময়গুলি একেবারেই অন্যরকম। আইসল্যান্ড আর্কটিক সার্কেলের একদম নিচে অবস্থিত হওয়ায় গ্রীষ্মের মাসগুলিতে প্রায় মিডনাইট সান ঘটনাটি লক্ষ করা যায়। গ্রীষ্মকালে আইসল্যান্ডে রাত থাকে কিন্তু জুন মাসে থেকে আইসল্যান্ডে সূর্য কখনও অস্ত যায় না। শুধু আইসল্যান্ডই নয়, ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কম-বেশি সব দেশেই গ্রীষ্মকালে দিনগুলি দীর্ঘ এবং শীতকালে রাতগুলি দীর্ঘ হয়।

More Articles