গুলি খেয়েও বলতেন খচ্চরে লাথি মেরেছে! শ্যাম বাহাদুরের মতো যোদ্ধা আর পায়নি ভারত...

Sam Bahadur: শ্যাম এককালে বলেছিলেন, “যদি কোনও সেনা কখনও বলে থাকে যে সে মরতে ভয় পায় না, তাহলে হয় সে মিথ্যে কথা বলছে অথবা সে গোর্খা”।

Shibani
৪ মিনিট
গুলি খেয়েও বলতেন খচ্চরে লাথি মেরেছে! শ্যাম বাহাদুরের মতো যোদ্ধা আর পায়নি ভারত...

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে কোনও সৈনিকের নাম সারা দেশজুড়ে এতটা জনপ্রিয় হয়নি যতটা হয়েছে শ্যাম মানেকশর ক্ষেত্রে। শুধুমাত্র ভারতবাসী নয় বরং সারা বিশ্বই তাঁকে আজীবন মনে রাখবে, আর সবটাই তাঁর বিবিধ কাজে ভূমিকার জন্য। ১৯৭১ সালে ইন্দো–পাক যুদ্ধের আগে তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে মানেকশ স্পষ্টই জানিয়েছিলেন, এই যুদ্ধের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী একেবারেই প্রস্তুত নয়। অথচ ১৯৭১-এর এই যুদ্ধে সমস্ত অসম্ভবকে পেছনে ফেলে রেখে তাঁরই নেতৃত্বে ভারতবর্ষ শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে ইতিহাস তৈরি করেছিল। সেই কারণেই প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর এই দিনটিকে বিজয় দিবস হিসেবে পালন করা হয় ভারতবর্ষে।

১৯৪২ সালে বার্মায় জাপানিদের বিরুদ্ধে সিটাং ব্রিজের যে যুদ্ধ হয়েছিল সেই যুদ্ধে মানেকশকে পরপর নয় বার গুলি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রায় মরণাপন্ন শ্যামকে তাঁর বিশ্বস্ত সিপাহী শের সিং উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন চিকিৎসকের কাছে। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ান এক সার্জেন এই মানেকশর মৃত্যুর আশঙ্কা দেখে অপারেশন করতে অস্বীকার করলেও হাল ছাড়েননি সহযোদ্ধা ও বন্ধু শের সিং। জ্ঞান ফিরলে চিকিৎসক যখন জানতে চান কী ঘটেছিল, তার উত্তরে শ্যাম মানেকশ জানিয়েছিলেন, “একটি খচ্চর আমাকে লাথি মেরেছে তাই আজ এই অবস্থা”। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তাঁর এমন ধারা উত্তর শুনে বোঝাই যাচ্ছে কতটা সাহসী এবং মজার মানুষ ছিলেন তিনি। উজ্জ্বল এবং রঙিন ব্যক্তিত্বের ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ শ্যাম বাহাদুর নামেও পরিচিত। তার ৪০ বছরের কাছাকাছি কর্মজীবনে মোট পাঁচটি যুদ্ধ দেখেছেন তিনি। যার মধ্যে সব থেকে ভয়ানক ছিল ১৯৭১-এর ইন্দো-পাক যুদ্ধ। যা শুধুমাত্র ভারতকে জিতিয়েই দেয়নি বরং নতুন দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকেও প্রশস্ত করেছিল অনেকটাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'বাংলাদেশি বাবু' ও ইন্দিরা গান্ধীর কণ্ঠস্বর! দেশের সবচেয়ে বড় রহস্য আজও অধরা

Nagarwala Scam: রুস্তম সোহরাব নাগারওয়ালা আসলে কে ছিলেন? সেই ‘বড় খবর’, যা তিনি ফাঁস করতে চেয়েছিলেন, সেটাই বা কী?

৩ এপ্রিল, ১৯১৪। অমৃতসরের এক চিকিৎসক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যাম মানেকশ। ছোটোবেলা থেকে বরাবরই মেধাবী ছিলেন তিনি। কলেজ এবং স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন নৈনিতালে। ১৫ বছর বয়সেই ডাক্তারি পড়তে তাঁকে লন্ডনে পাঠানোর চেষ্টা করেন তাঁর বাবা। তবে তিনি রাজি হননি। বরং বাবার সঙ্গে দীর্ঘ মতবিরোধের পর তিনি দেরাদুনে ইন্ডিয়ান মিলিটারি আকাডেমির (আইএমএ) প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথমবারেই পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন এই কৃতী ছাত্র। ব্যাস তারপরে আর কখনই পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শ্যাম মানেকশই সম্ভবত একমাত্র ব্যাক্তি যিনি ইন্দিরা গান্ধিকে ‘প্রধানমন্ত্রী' বলে সম্বোধন করেছিলেন।

ভারতবর্ষে এখনও পর্যন্ত দু’জন সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শালের পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। একজন ছিলেন কে এম কারিয়াপ্পা এবং দ্বিতীয়জন শ্যাম মানেকশ। ফিল্ড মার্শাল ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ পদ। একজন ফিল্ড মার্শাল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত নিজের পদে বহাল থাকেন, তিনি কোনও ভাবেই তাঁর দায়িত্ব থেকে অবসর নিতে পারেন না।

জেআরএফ জ্যাকব তাঁর লেখায় শ্যাম মানেকশর বিষয়ে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, এমন দায়িত্ববান নেতা ভারত কেন যে কোনও দেশের ইতিহাসে খুব কমই দেখতে পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র ভারতীর সেনাবাহিনীর সম্মান এবং মর্যাদাই শ্যাম বজায় রাখেননি, প্রয়োজনে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখেও দাঁড়িয়ে ছিলেন। সততার কারণে প্রায়শই মতের পার্থক্য হয়ে যেত বিভিন্ন আমলাদের সঙ্গে। সিভিল সার্ভেন্ট পিআর চারি জানাচ্ছেন, ১৯৪৭ সালে এমন এক পরিস্থিতি হয়েছিল যখন শ্যাম মানেকশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সহজেই যোগদান করতে পারতেন। যদি সত্যিই তেমনটা হতো তবে ১৯৭১-এর ইন্দো-পাক যুদ্ধের ইতিহাস অন্য কথা বলত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মগজাস্ত্র ক্ষুরধার, ফোনে বানচাল করেন আক্রমণ! ভারতের প্রকৃত জেমস বন্ড অজিত ডোভাল

Ajit Doval: ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভারতের আইসি-৮১৪ হাইজ্যাক করে নেয় আইএসআইএস জঙ্গিরা। বিমানে উপস্থিত ১৭০ জন ভারতীয়কে সম্পূর্ণ সুস্থ ভাবে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পড়ল অজিত ডোভালের উপর।

গোর্খা রেজিমেন্টের সঙ্গেও শ্যাম বাহাদুরের সম্পর্ক মন্দ ছিল না। তিনি এককালে বলেছিলেন, “যদি কোনও সেনা কখনও বলে থাকে যে সে মরতে ভয় পায় না, তাহলে হয় সে মিথ্যে কথা বলছে অথবা সে গোর্খা”। গোর্খা সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর এই গভীর মনোভাবের কারণে আজও তাঁর নাম গোর্খা রেজিমেন্টের কাছে খুবই সম্মানের।

অনেকেরই জানা নেই, দেশ ভাগের সময় মানেকশ এবং পাকিস্তানের মহাম্মদ ইয়াহা খান একইসঙ্গে দেশভাগ সংক্রান্ত নানা কাজ করতেন। দেশভাগের পর দুই মিলিটারি অফিসার নিজের দেশে ফিরে গেলেও বন্ধুত্ত কিন্তু একটুও তিক্ত হয়েনি। বরং ইয়াহা মানেকশকে তাঁর লাল মোটর সাইকেলটি ১০০০ টাকার বিনিময়ে দিয়ে দিতে বললে তিনি রাজিও হয়ে যান। অথচ দুঃখের বিষয় সেই টাকা মানেকশকে পাঠানোর আগেই শুরু হয়ে যায় ১৯৭১-এর যুদ্ধ। এই ঘটনা প্রকাশ্যে এলে মানেকশ বলেছিলেন, “ইয়াহা কখনই আমাকে মোটরবাইকের ১০০০ টাকা দেয়নি, কিন্তু আজ ওর দেশের অর্ধেক দিয়ে আমার ঋণ শোধ করেছে”।

নিজের কাজের প্রতি যেমন দায়িত্ববান ছিলেন তেমনই মানবিকতার দিক থেকেও কখনই পিছপা হননি শ্যাম। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করার পরমুহূর্তেই পাক সেনার ঘাঁটিতে গিয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে। এমনকী যে সকল সৈনিকরা মারা গিয়েছেন তাঁদের স্ত্রী এবং পরিবারের সঙ্গে গিয়েও দেখা করেছিলেন তিনি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর খাবার থেকে শুরু করে রাতে শোয়ার জায়গার ঠিকঠাক ব্যবস্থা রয়েছে কিনা নিজে গিয়ে দেখে এসেছিলেন। এই ঘটনায় অবাক হয়েছিলেন পাক যোদ্ধারাও। তাদের একজন মানেকশকে বলেছিলেন, “আপনার নেতৃত্বে ভারতের কেন জয়ী হয়েছে এবার তা বুঝতে পেরেছি। আসলে আপনি আপনার সহযোদ্ধাদের জন্য ভাবেন। আমাদের নিজেদের সেনা প্রধান এসেও আমাদের জন্য এভাবে খোঁজ নেয়নি যেভাবে আপনি নিয়েছেন।”

২০০৮ সালের ২৭ জুন মৃত্যুর দিন পর্যন্ত নিজের সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে গেছন এই যোদ্ধা । তবে ভারতবর্ষ কি সুদূর ভবিষ্যতে এমন আরেকজনকে পাবে? সংশয় অমূলক নয়।

লিখেছেন
Shibani
Shibani
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।