সত্যিই অন্য গ্রহে যাওয়া যায় এই রহস্যময় আলো পেরিয়ে? মেরুপ্রভার আসল সত্যিটা কী?

Northern lights or Aurora Borealis: এর সৃষ্টির প্রকৃত কারণ ও কেন সময়ের সঙ্গে এরা বদলে যায়- সেসব কারণ খুঁজতে বছরের পর বছর ধরে গবেষণা চলেছে।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
সত্যিই অন্য গ্রহে যাওয়া যায় এই রহস্যময় আলো পেরিয়ে? মেরুপ্রভার আসল সত্যিটা কী?

The northern lights

Painted the sky

With stories we

Hadn’t hard of yet

We learned back

Letting the colors

Wash over us

And paint new dreams

for us to follow

……Robyn Patrick

মেরু প্রদেশে রাতের আকাশে এক মায়াবী অপার্থিব সুন্দর আলোর প্রদর্শনী দেখতে পাওয়া যায়। অনেক মানুষেরই ইচ্ছাও থাকে, জীবনের কোনও না কোনও এক সময় মেরুতে গিয়ে এই আলোর খেলা স্বচক্ষে দেখবেন। মেরুপ্রভার সৌন্দর্য আদিকাল থেকে মুগ্ধ করেছে মানুষকে। কবিদের কল্পনায় এই মেরুপ্রভা কখনও হয়ে উঠেছে না শোনা গল্পের আলোক প্রদর্শনী, কখনও বা অন্য এক পৃথিবীর প্রবেশদ্বার। রহস্যময় এই সবুজ ম্যাজেন্টা নীল আলোর সেতুকে আমরা ভূগোল বা বিজ্ঞান বইতে একে মেরুপ্রভা বা অরোরা নামে জেনে এসেছি।

মেরুপ্রভার কার্যকারণ ১৯ শতকের শেষ দশকে ক্রিস্টিয়ান বার্কেল্যান্ড আবিষ্কার করেছিলেন ঠিকই। তবে, অনেককাল আগে ইতালিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও মেরুপ্রভার নামকরণ করেন ‘অরোরা', ভোরের দেবীর নামে। অএনেক এই আলোকে ‘নর্দার্ন লাইটস’ নামেও চেনেন। আসলে নর্দার্ন লাইটস হচ্ছে মেরুপ্রভার কেবল একটা প্রকার মাত্র। মেরুপ্রভা দুই মেরুতেই দেখা যায়। যদিও দুই মেরুতেই লোকে চেনে আলাদা আলাদা নামে। সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চলের মেরুপ্রভাকে যথাক্রমে বলে ‘অরোরা বোরেয়ালিস’ বা ‘নর্দার্ন লাইটস’ এবং ‘অরোরা অস্ট্রালিস’ বা ‘সাউদার্ন লাইটস। প্রাচীনকালে এর প্রকৃত উৎসের কারণ জানা না থাকায়, নানান লোককথা তৈরি হয় এই আলোকমালাকে ঘিরে। অনেকে মনে করতেন, মৃত পূর্বপুুরুষদের আত্মারা আনন্দ উৎসবে নৃত্য করছে বলে এই আলোর সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেকে মনে করতেন, স্বয়ং ঈশ্বর নাকি এই আলোর সেতু তৈরি করেছেন, কোনও এক বিশেষ উদ্দেশ্যে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সময়ের উল্টোদিকেও রয়েছে 'পদার্থ'? যে খোঁজ বদলে দিতে পারে আমাদের সব বোঝাপড়া

Anti Matter: বিগ-ব্যাংয়ের সময় সম পরিমাণ 'পদার্থ' ও 'প্রতিপদার্থ' উৎপন্ন হওয়ার কথা যারা কিনা একে অপরকে বিনাশ করে কেবল শক্তির জন্ম দেবে অর্থাৎ জগতে শুধু শক্তি থাকার কথা।

রাতের আকাশে এই আলোকমালা একটি ক্ষেত্র তৈরি করে যার পোশাকি নাম 'অরোরাল জোন'। এটিকে একটি চৌম্বক ফ্লাক্স টিউব হিসেবেও ভাবা যেতে পারে যা অরোরাল আয়নস্ফিয়ার থেকে আরও উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। অপরদিকে, প্রস্থে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর ৭০ ডিগ্রি জিওম্যাগনেটিক অর্থাৎ ভূচুম্বক অক্ষাংশ জুড়ে এটি বিস্তৃত। এটি একটি তীব্র চুম্বকিত প্লাজমা। যেখানে ইলেকট্রনের প্লাজমা কম্পাঙ্কের মান ইলেকট্রনের সাইক্লোট্রন কম্পাঙ্কের থেকে অনেক কম। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অরোরাল প্লাজমা শীতল আয়নোস্ফিয়ার (তাপমাত্রা ~ ১ ইলেক্ট্রন ভোল্ট) ও উষ্ণ মেসোস্ফিয়ারের (তাপমাত্রা ~১০০ ইলেক্ট্রন ভোল্ট) মিশ্রণ।

এখন, বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো এই মেরুপ্রভা সৃষ্টি হয় কীভাবে?

আমরা জানি, সূর্য নিজেও প্লাজমা অবস্থায় আছে যার ভেতর ইলেকট্রন ও প্রোটন মুক্তভাবে বিচরণ করে। প্লাজমার ভিতর শক্তির পরিমাণ বেশি হলে এই আধানগুলো সূর্যের প্রবল মহাকর্ষিক ক্ষেত্র অতিক্রম করে বেরিয়ে আসে এবং ভীষণ বেগে ধাবিত হয় পৃথিবীর দিকে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন সৌরঝড়। চার্জড কণাগুলি গতিময় হওয়ার কারণে সৌরবায়ু নিজেই এক চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে যা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের কাছে এলে বাধাপ্রাপ্ত হয়। যাদের চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের প্রতি সমান্তরাল অবস্থানে আসে, তারাই বাধা অতিক্রম করে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। ফলে সৌরবায়ুর খুব অল্প সংখ্যক ইলেকট্রন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে সব থেকে সুবিধাজনক স্থান হচ্ছে পৃথিবীর দুই মেরু। এই প্রবেশের সময় ইলেকট্রনের স্রোত বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। ফলে অণুগুলোর ভিতরে কিছু শক্তি সঞ্চারিত হয়। ইলেকট্রনগুলি সেই শক্তি গ্রহণ করে উচ্চ শক্তিস্তরে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করে (বোরের তত্ত্ব অনুসারে)। কিছুক্ষণ পরে, কণাগুলি স্বাভাবিক অবস্থায় আসার জন্য এই অতিরিক্ত শক্তির নির্গমন করে, ফলে ইলেকট্রনের গতিশক্তি আলোকশক্তিতে পরিণত হয়। কোটি কোটি ইলেকট্রন দ্বারা এভাবে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মিই আমরা মেরুপ্রভারূপে দেখতে পাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
"চরকায় সুতো কেটে দেশের উন্নতি হবে না!" গান্ধীর সমালোচনাই কাল হয়েছিল মেঘনাদ সাহার?

Meghnad Saha: চরকায় সুতো কেটে যে ভারতের উন্নতি ঘটানো যাবে না তা মেঘনাদ প্রকাশ্যেই বলতেন। ফলে নেহেরুর সঙ্গে তাঁর মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।

সাধারণত মেরুপ্রভাতে সবুজ রঙের ছটা অধিক দেখা যায়। অক্সিজেনের সঙ্গে ইলেকট্রনগুলির প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় এই উজ্জ্বল সবুজ রঙ। তবে বেগুনি বা নীল রঙের বাহারি আলো তৈরি হয় নাইট্রোজেনের সঙ্গে ইলেকট্রনের মিথস্ক্রিয়ায়। চলমান এই আলোক প্রদর্শনী পদার্থবিদদের আকৃষ্ট করেছে যুগের পর যুগ। এর সৃষ্টির প্রকৃত কারণ ও কেন সময়ের সঙ্গে এরা বদলে যায়- সেসব কারণ খুঁজতে বছরের পর বছর ধরে গবেষণা চলেছে। হয়তো ম্যাগনেটোস্ফিয়ার ও মহাকাশ থেকে আগত রশ্মির মিথষ্ক্রিয়া পৃথিবীর উপর কী প্রভাব ফেলে সেই বিষয়ে অনেক অজানা তথ্যই অদূর ভবিষ্যতে জানা যাবে। সম্প্রতি ডঃ নাদিন কলমনির নেতৃত্বে UCL এবং নাসার একটি দল মহাকাশে সৌরঝড় বা কোনও তারকার বিস্ফোরণের পেছনে কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই মেরুপ্রভার দ্রুত বদলে যাওয়া, অরোরার পুনর্গঠনের জন্যে শক্তির নির্গমন বিষয়ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিখ্যাত নেচার পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। আর এই মেরুপ্রভার গবেষণা কতোটা প্রাসঙ্গিক, তাও জানিয়েছেন,

" By studying auroras closely, we can map back to where in space the instabilities are occurring and study the physics that cause them. It’s much more efficient than trying to observe vast areas of space".

ঋণস্বীকার :

১. https://www.ucl.ac.uk/news/2018/nov/auroras-unlock-physics-energetic-processes-space

২. https://www.sciencedirect.com/topics/physics-and-astronomy/auroral-zone

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।