নোবেল শান্তিপুরস্কার জয় করলেন দুই সাংবাদিক

By: Anasuya Sen

November 3, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

ফিলিপিন্স-এর নির্ভীক সাংবাদিক মিস মারিয়া রেসা তাঁর স্থিতপ্রজ্ঞ কণ্ঠে বললেন ——- “আমি কোনও অপরাধ কখনও করিনি | তবে ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধি হয়ে আমি সত্যকে উদ্ঘাটিত করেছি |” এই প্রতিস্পর্ধাই তো ক্ষমতা ও দেশে দেশে তার ধারক ‘সরকারের’ গলার কাঁটা | এই স্পর্ধাই তো ক্ষমতাশালীর চোখে চোখ রেখে নির্ভয়ে সত্য কথা বলে | আর সেই স্পর্ধাই দেখিয়েছেন মিস মারিয়া রেসা তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত সংবাদ – ওয়েবসাইট ‘রাপলার’ মাধ্যমে | ফিলিপিন্স-এর সরকার ও তার প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতেরতে সরকারের বিভিন্ন ভ্রান্ত নীতি, নারীবিদ্বেষী নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতিমূলক কর্মকান্ডের তথ্যনিষ্ট অনুসন্ধান করে এবং প্রকৃত অপরাধী ক্ষমতাশালীদের চিহ্নিত করে সেই সব তথ্য তিনি রাপলার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনুসরণকারী পাঠক – দর্শক – শ্রোতাদের সামনে ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরেছেন | সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এবং মেরুদন্ড সোজা রেখে এই স্তরের সত্যানুসন্ধান করতে গিয়ে মারিয়া রেসাকে বহুবার শাসানি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে | মারিয়া রেসা ফিলিপিন্স সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও নিন্দাসূচক তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রচার করছেন, সঙ্গে সঙ্গে কর ফাঁকি দিয়েছেন —— এই অভিযোগে ২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় | তাঁর মতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বসবর্ত্তী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে এমন সব আইনের ধারায় সরকার মামলা করেছে যে তাতে তাঁর ৬ বছর পর্য্যন্ত জেল হতে পারত |

 

মারিয়া রেসা বিগত ২০১২ সালে যৌথ ভাবে সংবাদ – ওয়েবসাইট রাপলার চালু করেন | ফেসবুক পেজে এই ওয়েবসাইটের অনুসরণকারী দর্শক – শ্রোতার সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে চার মিলিয়ান | বুদ্ধিদীপ্ত সংবাদ পরিবেশনা ও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নাছোড় তদন্তমূলক তথ্য উদ্ঘাটনের কারণেই রাপলার লাভ করেছে এই সাড়া জাগানো জনপ্রিয়তা | রাপলার একদিকে জনপ্রিয়তালোভী প্রেসিডেন্ট রডরিগো দূতেরতের ড্রাগের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের কথা যেমন সবিস্তারে প্রচার করেছে তেমন অন্যদিকে ফিলিপিন্স সরকারের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধেও খড়্গহস্ত হয়েছে | প্রেসিডেন্ট দূতেরতের যুদ্ধবাদী প্রচারের বাড়বাড়ন্তের বিরুদ্ধেও মারিয়া রেসা স্বয়ং সম্প্রচারে অবতীর্ণ হয়ে সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলেছেন |

 

মারিয়া রেসার কর্তব্যনিষ্ঠার প্রশংসা করতে গিয়ে নোবেল শান্তি কমিটি বলেছেন যে ——- মারিয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যুক্তিযুক্ত সদ্ব্যবহার করে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন কেমন ভাবে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, হিংসা ছড়িয়ে কেমন ভাবে প্রতিবাদী মানুষকে দমন – পীড়ন করা হয় এবং কেমন ভাবে তাঁর জন্মভূমি ফিলিপিন্স-এ ন্যায়নীতিকে দূরে ঠেলে দিয়ে কর্তৃত্ববাদের প্রতিষ্টা করা হচ্ছে |

 

নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত হওয়ার পরে রাপলার-এর এক সরাসরি সংবাদ – সম্প্রচারে মারিয়া রেসা বলেছেন —– “আমি অত্যন্ত তাড়না ও আঘাতের সঙ্গে সংগ্রাম করছিলাম | তবে এই স্বীকৃতি প্রমান করে দিল যে তথ্যনিষ্ঠাকে বাদ দিয়ে কিছুই করা সম্ভব নয় |……. যে পৃথিবীতে তথ্যনিষ্ঠ নেই, সেই পৃথিবীতে সত্য নেই, বিশ্বাস ও ভরসা বলে কিছু নেই |” রাপলার তার এক সংবাদ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে —— “আমাদের প্রধার কর্মকর্তা এই নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার ফলে আমরা সামগ্রিকভাবে নিজেদের অত্যন্ত সম্মানিত ও অভিভূত বোধ করছি | এই পুরস্কার লাভের পক্ষে এর চেয়ে ভাল সময় আর হয়না, কারণ আমরা এমন এক সময়য়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি যখন সাংবাদিকদের এবং সত্যনিষ্ঠাকে চতুর্দিক দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে |”

 

নির্ভীক সাংবাদিকতার আলো আরেকজন ছড়িয়েছেন রাশিয়ায় | তিনি দিমিত্রি মুরাতভ | তিনি রাশিয়ার এক স্বাধীন সংবাদপত্র ‘নোভায়া গাজেত্তা’ -র যৌথ প্রতিষ্ঠাতা তথা সম্পাদক | ক্রমবর্ধমান ত্রাসের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি রাশিয়ায় মানুষের বাকস্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েক দশক ধরে | এই সংগ্রাম চালাতে গিয়ে তিনি অনেক সহকারীকে অকালে হারিয়েছেন | ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ – নামক এক রাশিয়ান সংগঠনের বয়ান থেকে জানা যায় যে সেই সব সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের খুন করা হয়েছে |

 

দিমিত্রি মুরাতভ ১৯৯৩ সালে ‘নোভায়া গাজেত্তার’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং শুরু থেকেই সংবাদপত্রটির সম্পাদনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন | রাশিয়ায় অল্প কয়েকটি অবশিষ্ট সংবাদপত্রের মধ্যে নোভায়া গাজেত্তা একটি, যেটি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং তার সহযোগী ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীর অপশাসনের তীব্র সমালোচনা করে যাচ্ছে | প্রতি সপ্তাহে সংবাদপত্রটির তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় | ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর দুর্নীতি ও অপকর্মের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রটি লাগাতার তথ্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে | সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাদর্পী শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা যে সমস্ত মানুষ অত্যাচারিত হচ্ছে, তাদের কোথাও তুলে ধরছে | চেচনিয়াতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রতিবাদী কণ্ঠরোধের কথা প্রকাশ করার জন্য সংবাদপত্রটিকে চূড়ান্ত রকমের হুমকি ও হয়রানির সম্মুখীন হতে হচ্ছে | বিগত আগস্ট মাসেই দিমিত্রি মুরাতভ আন্দাজ করেছিলেন যে তাঁর সংবাদপত্রের ওপর আরও ভয়ঙ্কর চাপ আসতে চলেছে | তবু তিনি নিরাশ হননি এবং বলেছেন যে ——- “প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে কখনও হত্যা করা সম্ভব নয় |”

 

এই সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভিক সাংবাদিকতার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি তাঁকে এই ২০২১ সালে পুরস্কৃত করলেন | তবে স্বাথী হারানোর বেদনা তাঁর যাবেনা | তাঁর সংবাদপত্রের যে ৬জন সাংবাদিক খুন হয়েছিলেন তাদের অন্যতমা ছিলেন আনা পলিটসকোভস্কায়া | এবার তাঁর মৃত্যুর পঞ্চদশ বর্ষ পূর্ণ হল | সেই বর্ষপূর্তির ঠিক একদিন পরেই নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির দেওয়া স্বীকৃতির সংবাদ পেলেন দিমিত্রি মুরাতভ | পুরস্কার প্রাপ্তির পর একটি জনপ্রিয় টেলিগ্রাম চ্যানেল ‘পডিয়ম’ -কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুরাতভ বলেছেন ——- “আমি তো হাসছি | আমি এই পুরস্কার একেবারেই আশা করিনি | এখন এখানে এই নিয়ে পাগলামি হচ্ছে |” তিনি আরও বলেন —— “রাশিয়ায় সাংবাদিকতার ওপর যে দমন – পীড়ন চলছে, এই পুরস্কার তার এক প্রতিদান |”

 

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কোভ তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন যে —— “তিনি তাঁর আদর্শ রক্ষার সংগ্রাম নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন | তিনি প্রতিভাবান ও সাহসী |”

 

তবে রাশিয়ার সরকারের তরফ থেকে যে অভিনন্দন বার্তা দেওয়া হয়েছে সেটি নিশ্চই চোয়াল শক্ত করে রাখা মুখ থেকে নির্গত হয়েছে —— এমনটাই ধারণা করেন মুরাতভ | রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স নাম একটি সংস্থা আছে যারা রাশিয়ায় সংবাদমাধ্যমের স্বধীনতার জন্য লড়াই করে | তাদের মতে রাশিয়ার পরিস্থিতি এখন অন্যন্ত দমনমূলক | এই স্বীকৃতি লাভের পরেও স্বাধীন ভাবে সংবাদমাধ্যমের কাজ করা এখন চূড়ান্ত অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন |

 

এই দুই মহান সাংবাদিকদের নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি সম্মানিত করে বলেছেন ——“এনারা হলেন সেই সমস্ত সাংবাদিকদের প্রতিনিধি, যারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যান মেরুদন্ড সোজা রেখে |”

 

নোবেল কমিটির কাছে বিচার বিবেচনার জন্য ৩২৯ জন সাংবাদিকের কার্য্যবিবরণী পেশ করা হয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে মারিয়া রেসা এবং দিমিত্রি মুরাতভের কার্য্যবিবরণী নোবেল পুরস্কারের যোগ্য বলে বিবেচিত হয় | অশ্ল শহরের নরওয়ে নোবেল ইনস্টিটিউট -এর তরফ থেকে ২০২১ সালের জন্য এই পুরস্কার যৌথভাবে ওই দুই সাংবাদিকের জন্য ঘোষিত হয় | আন্তর্জাতিকভাবে চূড়ান্ত সম্মানের এই পুরস্কারের অর্থমূল্য হল ১০ মিলিয়ান সুইডিশ ক্রোনা যা ৮,৩৬০০০ পাউন্ডের সমতুল্য বা ১.১ মিলিয়ন ডলারের সমতুল্য |

 

নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন ——“মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে জাতিতে জাতিতে সৌভাতৃত্ব গড়ে তোলার কাজকে সাফল্য মন্নিত করা কঠিন হবে | কঠিন হবে দেশে দেশে নিরস্ত্রীকরণের কাজ এবং পৃথিবীতে শান্তি, প্রগতি ও লোককল্যাণের বাতাবরণ সৃষ্টি করার কাজ সফল ভাবে চালিয়ে যাওয়া |”

More Articles

error: Content is protected !!