জগন্নাথের রথ এক ইসলাম সম্প্রদায়ের ভক্তের সমাধির সামনে এসে থামে আজও

অনেকেই হাত লাগান রথের রশিতেও। এই দিনটি নেত্র উৎসব বা নব যৌবন বেশ হিসেবে পালন করা হয়।

tiasa gupta
৪ মিনিট
জগন্নাথের রথ এক ইসলাম সম্প্রদায়ের ভক্তের সমাধির সামনে এসে থামে আজও

আবার চেনা ছবি। পুরীতে আগের মতো উৎসবের মেজাজ। রথের রশিতে পড়বে টান। আজ ১৬ জুলাই, রথযাত্রা।

রথযাত্রার আগের দিন, ৩টি রথ নিয়ে আসা হয় মন্দিরের সিংহ দুয়ারের বাইরে। প্রথমে জগন্নাথ দেবের রথ। এরপর দেবী সুভদ্রা এবং বলভদ্রের রথ নিয়ে আসা হয়। এদিনই রথের রশিতে টান দিয়েছেন অনেকেই। যদিও এদিন রথে ছিল না বিগ্রহ। বিগ্রহ ছাড়াই এদিন তিনটি রথ নিয়ে আসা হয়। এদিন এই দৃশ্য দেখার জন্য সকাল থেকে ভিড় করেছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেই হাত লাগান রথের রশিতেও। এই দিনটি নেত্র উৎসব বা নব যৌবন বেশ হিসেবে পালন করা হয়।

রথযাত্রা বলতেই সবার আগে নাম আসে পুরীর। কারণ, পুরীকে অনুসরণ করেই বাকি সব জায়গায় রথযাত্রা হয়। আর, সব কিছুরই একটা ইতিহাস আছে। কিন্তু, কবে থেকে পুরীতে রথযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর মতভেদ দেখতে পাওয়া যায়।

এক্ষেত্রে অনেকেই ভরসা রাখেন ওড়িশার প্রাচীন পুঁথি ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’-এর ওপর। এই পুঁথি অনুযায়ী, মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নর আমলে জগন্নাথদেব, বলরাম এবং সুভদ্রার মূর্তি তৈরি হয়। একইসঙ্গে রথযাত্রাও চালু হয়। বিভিন্ন ইতিহাসবিদদের দাবি, ১০৭৮ সালে তৈরি হয়েছিল পুরীর জগন্নাথ মন্দির। ১১৭৪ সালে মেরামরির পর তা বর্তমান জগন্নাথ মন্দিরের চেহারা নেয়।

কিন্তু, আবার ‘রথ চকদ’ নামে আর একটি গ্রন্থে আছে যে আটের শতকে রাজা যযাতি কেশরী রথযাত্রা উৎসব উদযাপন করেছিলেন। সেই সময় তিনি শ্রীজগন্নাথদেব, বলরাম এবং সুভদ্রার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

‘মাদলা পঞ্জী’ নামে একটি কালানুক্রমিক বিবরণমূলক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আগে শ্রীজগন্নাথ মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার পথে ‘মালিনী নদী’ নামে একটি নদী পড়ত। ওই নদী ‘বডা নাই’ বা বড় নদী নামেও পরিচিত ছিল। ওই সময়ে রাজার ছয়টি রথ এই রথযাত্রায় অংশ নিত। শ্রীজগন্নাথদেব, বলরাম এবং সুভদ্রা এবং সুদর্শন চক্রকে ওই নদীর দিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি রথ ব্যবহৃত হত। তারপর বিগ্রহগুলি নদীর অপর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হত নৌকোয় চাপিয়ে। সেখান থেকে গুন্ডিচা মন্দির পর্যন্ত শ্রীজগন্নাথদেব, বলরাম এবং সুভদ্রাকে বহন করার জন্য আরও তিনটি রথ থাকত।

পৌরাণিক কাহিনি

পুরাণ অনুযায়ী একদা সুভদ্রা নিজের বড়ভাই কৃষ্ণ ও বলরামের কাছে নগর দেখার ইচ্ছা জাহির করেন। তখন দুই ভাই ও বোন রথে বসে নগর ভ্রমণের জন্য বের হন। পথে গুন্ডিচায় নিজের মাসির বাড়ি যান তাঁরা। এখানে ৭ দিন থাকেন তাঁরা। এ সময়ে নগরের যাত্রা পূর্ণ করে পুরী ফিরে আসেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী তার পর থেকেই এখানে রথযাত্রার আয়োজন করা হয়ে আসছে। পুরীর রথযাত্রা বিশ্ববিখ্যাত। তবে শুধু পুরীই নয়, দেশের বিভিন্ন ইস্কন মন্দিরে রথ যাত্রার আয়োজন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে সাড়ম্বরে পালিত হয় রথ। পশ্চিমবঙ্গের মাহেশ, মহিষাদলের রথযাত্রা অত্যন্ত বিখ্যাত।

সমাধিতে এসে থেমে যায় জগন্নাথের রথ

নগর যাত্রার সময় জগন্নাথের রথ তাঁর এক ইসলাম সম্প্রদায়ের ভক্তের সমাধির সামনে এসে কিছু ক্ষণের জন্য থেমে যায়। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী জগন্নাথের এই ভক্তের নাম সালবেগ। জগন্নাথের দর্শনের জন্য মন্দির পৌঁছতে পারেননি তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। তাঁর এই সমাধির সামনে এসে জগন্নাথের রথ নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে পড়ে। শত চেষ্টা করও কিছু ক্ষণের জন্য রথের চাকা ঘোরানো যায় না। তার পর সালবেগের আত্মার উদ্দেশে শান্তি কামনা করলে রথ এগোতে শুরু করে। তার পর থেকেই প্রতিবছর সালবেগের সমাধিতে রথ থামানো শুরু হয়।

সকাল থেকে হোমযজ্ঞ, নিবেদন করা হয় ৫৬ ভোগ। রূপোর হাত পরানো হয় দারু বিগ্রহকে। নবযৌবন উৎসব উপলক্ষে সকাল থেকেই মন্দির চত্বরে ছিল ভক্ত সমাগম। কী এই ৫৬ ভোগ?

জগন্নাথ হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণু বা তাঁর অবতার কৃষ্ণের একটি বিশেষ রূপ। তাঁকে তাঁর দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রার সঙ্গে পূজা করা হয়। পুরীতে রথযাত্রা উৎসবে রথে আরূঢ় জগন্নাথ বিগ্রহ। জগন্নাথের মূর্তি সাধারণত কাঠে তৈরি করা হয়। জগন্নাথের মধ্যে বিষ্ণুর সকল অবতারের চিহ্ন আছে। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁকে বিষ্ণুর এক একটি অবতারের মূর্তিতে পুজো করা হয়। ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার কৃষ্ণের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয় তাঁকে। আর সেই কারণে তাঁকেও অর্পণ করা হয় ছাপান্ন ভোগ।

কথিত আছে, ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে এসে তাঁর চার ধামে যাত্রা করেন। এই চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম, দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন, তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন। আর পুরী ধামে যেখানে তিনি ভোজন করেন সেখানে ভোগের কোনও চমক থাকবে না এটা কখনও হয়। সেখানেই তাঁকে ছাপ্পান্ন ভোগ দেওয়া হয়।

পুরাণে ৫৬ ভোগ

পুরীর মন্দিরে বাইরে থেকে আনা কোন খাবার জগন্নাথকে দেওয়া যায় না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা জিনিস রান্নাঘরে রান্না করে মহাপ্রভুকে দেওয়া হয়। জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার যাকে ‘শঙ্খুড়ি’ বলা হয়। আর খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার যাকে বলা হয় শুখুলি। পুরানের কাহিনী অনুযায়ী শ্রী কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরে মহাপ্রলয় থেকে প্রাণীকূলকে রক্ষা করেছিলেন। এই ভাবে সাত দিন কনিষ্ঠ আঙ্গুলে পাহাড় তুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। শ্রীকৃষ্ণ প্রতিদিন আট বার খেতেন। তবে এই সাত দিন তিনি কিছুই খাননি। সাতদিন পর প্রলয় বন্ধ হলে তিনি পাহাড় নামিয়ে রাখেন। তখন গোপবাসীগণ কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাঁকে সাতদিনের আট রকমের মোট ৫৬ রকমের রান্না করে ভোগ নিবেদন করেন। সেই থেকেই ৫৬ ভোগ চলে আসছে।

রথযাত্রার সবচেয়ে ঐশ্বরিক চিত্রগুলির মধ্যে একটি হল যখন ভগবান জগন্নাথ তার ভাই বলরাম এবং বোন সুভদ্রার সঙ্গে তিনটি রথে চড়ে। তিনটির রথ আলাদা এবং দেশ-বিদেশের কয়েক লক্ষ ভক্ত এই রথের দড়ি টানতে মন্দিরে উপস্থিত হন। হাজার মানুষের আবেগ সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে তিন-রথ। ভক্তিরসে জারিত হয়ে রথের রশিতে টান দেন ভক্তরা। সমুদ্র তীরে তখন উৎসবের আকুলতা।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।