প্রেমে খুনই শেষ সত‍্য নয়, 'রক্তকরবী'-র বিশু পাগল তার প্রমাণ

Rabindranath Tagore: রাজাকে না হয় বদলে দিল নন্দিনী, বিশুর কী হলো

Biswajit Ray
৪ মিনিট
প্রেমে খুনই শেষ সত‍্য নয়, 'রক্তকরবী'-র বিশু পাগল তার প্রমাণ

বিশুকে চেনেন?

গ্রামের ছেলে। গ্রামের অন্যান্য ছেলেদের মতো যে-মেয়েটিকে ঘিরে তার মনে তোলপাড় সেই মেয়েটি অন্যের প্রেম স্বীকার করেছে দেখে সে চলে গিয়েছিল। এলোমেলো, নিরুদ্দেশে।

তারপর?

তারপর একসময় বিয়ে করল আরেকজনকে। যতই হোক পুরুষের ঘা-খাওয়া অহং। এক জায়গায় আহত হলে অন্য জায়গায় অহং তৃপ্ত করতে চায়। ভাবে, দেখিয়ে দেব। দেখিয়ে হয়তো দেওয়া যায় তবে সবাই তা পারে না। বিশু অন্তত পারবে ভেবেও পারেনি। চেষ্টা করেছিল মাত্র। বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান তো ‘সামাজিক চুক্তি’। যাকে বিয়ে করল, গ্রামের পাশের সদ্য গড়ে ওঠা খনিশহরে সে বড় চাকরি নিতে বলল তাকে, বিশু নিল।

তারপর কি they lived happily ever after?

না, বিশুর চাকরিটা পোষাল না। নৈতিকতায় আটকাল, নজরদারির কাজ সবার কি আর ভালো লাগে! একালে আমরা জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে নজরদারির আওতায় ঢুকে পড়েছি। আর বাইরে যেতে পারছি না। চতুর্দিকে একটাই বাণী ঘোষিত কিংবা অঘোষিত You are under CCTV surveillance। নজরদারির হাজারটা উপায়, হাজার রকম জাল। সেই জাল ছিন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। যে নজরদার, সেও কিন্তু নজরদারির আওতায়। বিশু নজরদারির চাকরি ছেড়ে দিল। তবে বুঝতে পারল, চাকরি ছাড়লেও নজরদারির আওতাতেই রইল সে।

চাকরি ছাড়া বেকার পুরুষটির সামাজিক চুক্তিনিষ্ঠ বউটি তখন কী করল?

চলে গেল, চলেই গেল। বিশু কিছু করল না, বললও না। একা একা সেই খনিশহরে ভয়ে ভয়ে ফেকলুর মতো খোদাইকরদের সঙ্গে কোনওক্রমে জীবন কাটাতে লাগল।

তারপর খনিশহরে এল সেই মেয়েটি– যে মেয়েটিকে ভালবেসে না-পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল, সেই মেয়েটি এল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নির্ভেজাল, নিঃশর্ত বন্ধুত্বে বিশ্বাস করেননি সত‍্যজিৎ?

Satyajit Ray: সত্যজিতের লেখায় দুই বন্ধুর সম্পর্ক খুবই জটিলতর বিষয়।

বিশুকে সেই মেয়ে নন্দিনী জিজ্ঞাসা করেছিল, গ্রাম থেকে হঠাৎ কোথায় নিরুদ্দেশ হয়েছিল সে?

বিশু গানে-কথায় জানায় নিজের অতীত।

স্পষ্ট করে, নিত্যদিনের কেজো ভাষায় বলে না সে কথা। ভাবের ভাষায় বলে, ভেতরের ভাষায় বলে। কী বলে? সে খবর দেওয়ার আগে টিপ্পনী কিংবা একটু কমার্শিয়াল ব্রেকের মতো অন্য প্রসঙ্গ।

যতই হোক, এই গল্পটা নাটকের মধ্যে যিনি বুনে দিচ্ছিলেন, তিনি যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর রকম-ফের আলাদা।

তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপে বিশ্বযুদ্ধের ভাঙনের অভিজ্ঞতা সেখানকার সাহিত্যে নানা টালমাটাল নিয়ে আসছে। মানুষের কাজকর্মের ইতিবাচকতায় আর বিশ্বাস করতে পারছে না তারা। মানুষ পশুর মতোই আহার-নিদ্রা-মৈথুন ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যহীন, মানুষ নিতান্তই হেতুবোধ ও হিতবোধশূন্য আদিমতা পরিচালিত জীব, একথা মনে হচ্ছে তাঁদের। মানুষ কদর্যভাবে খুন করতে পারে, হয়ে উঠতে পারে তীব্র প্রতিহিংসাপরায়ণ, যৌনতার ক্রুর প্রকাশে মানুষের দোসর মেলা ভার। আর এই আদিমতার সত্যকে ঢেকে রাখার কারণ নেই কোনও। বঙ্গদেশের তরুণ সাহিত্যিকরা মানুষের এই আদিম ইতিহাস-পূর্ব প্রাগৈতিহাসিক প্রকৃতির প্রকাশ ঘটাতে চাইছেন তাঁদের লেখায়। আর ভাবছেন এভাবেই অতিক্রম করা যাবে রবীন্দ্রনাথের ভাবের ভুবন।

রবীন্দ্রনাথ কী ভাবছেন?

রবীন্দ্রনাথ তো জানেন মানুষ পশুবৎ, ঈর্ষাপরায়ণ, খুনি। খনি শহরে রঞ্জন খুন হল। খুন হলো যৌন ঈর্ষায়– প্রাগৈতিহাসিক অধিকারপরায়ণ যৌন ঈর্ষা সেই খনিশহরের রাষ্ট্রপতিবৎ, খাতায়-কলমে প্রশাসনিক প্রধান রাজার মন দখল করেছিল। তাই নন্দিনী যাকে ভালোবাসত, যে ছেলেটির কাছে বিশু পরাভূত হয়েছিল, সেই রঞ্জনকে রাজা খুন করল। নন্দিনীকে রাজা পেতে চায়, পায় না, তাই রঞ্জনকে খুন করে। এই খুনি রাজার গল্পটুকু বলেই কিন্তু ছেড়ে দিলেন না রবীন্দ্রনাথ কিংবা এমন কোনও দৃশ্যের অবতারণা করলেন না যেখানে নন্দিনী রাজাকে প্রত্যাঘাত করে, খুনের বদলা নেয় খুন দিয়ে। এখানে রবীন্দ্রনাথ মানুষের পশুত্বকে দেখালেন, কিন্তু মানুষকে পশুত্বে আটকে রাখলেন না।

খুনি শাসককে ছেড়ে দিল নন্দিনী?

দিল। শুধু দিল না ‘সেই রাজা’র সঙ্গে পথে নেমে বিপ্লব সম্ভব করল।

‘সেই রাজা’?

না, ভুল হলো। এ-রাজা নয়তো সে রাজা। তার বদল হয়েছিল। রঞ্জনকে খুন করে সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিল। রঞ্জনকে খুন করার কাজটা কিন্তু ঠান্ডা মাথার খুন নয়, সেই খুন মুহূর্তের উত্তেজনার ফল, রঞ্জনের প্রতি যৌন ঈর্ষার ফল। এই খুন রাজাকে সংশোধনের পথে এগিয়ে দিল। আর তাই নন্দিনী সেই খুনের ঘটনাটিতে আটকে না থেকে সংশোধিত রাজাকে সুযোগ দিল। রাজা নিজেই তার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, শাসনতন্ত্রকে ভাঙতে সে উদ্যত। এই বড়ো কাজ করে নিজের খুনের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় সে – সে সুযোগ থেকে নন্দিনী বঞ্চিত করেনি তাকে। রঞ্জনকে হারানোর দুঃখ বড়ো বিপ্লবের স্বপ্নে মিশিয়ে দিয়েছে নন্দিনী। মেনে নিয়েছে এ-রাজা সেই খুনি রাজা নয়।

রাজাকে না হয় বদলে দিল নন্দিনী, বিশুর কী হলো?

বিশু নন্দিনীকে বলেছিল, তৃষ্ণার জল যখন পাওয়া যায় না, তখন মরীচিকা সহজে ভোলায়। নন্দিনীকে না-পেয়ে সে যাকে বিয়ে করেছিল সে বিশুর তৃষ্ণার জল হয়ে উঠতে পারেনি, মরীচিকামাত্র ছিল। তাই মেয়েটি চলে গেছে, মিলিয়ে গেছে। তাকে মিলিয়ে যেতে দেখে বিমর্ষ বিশু কোনওক্রমে দিন কাটাচ্ছিল খনিশহরে। নন্দিনী ফিরে এসে আজ তার চোখ দিয়েছে খুলে। সে জানে নন্দিনীকে সে পাবে না, নন্দিনী রঞ্জনের কিন্তু সে নন্দিনীর সঙ্গে বিরহযাপন করবে, না-পাওয়া যাপন করবে। সেই না-পাওয়া যাপনের সূত্রেই সে নন্দিনীর পথে মিলে যাবে– সে বিপ্লবের বড় পথ। সেই পথে শেষ অবধি চলল বিশু নন্দিনীর না-পাওয়াকে স্বীকার করে, চলল নন্দিনী খুন হয়ে যাওয়া রঞ্জনের স্বপ্ন পূরণ করতে, চলল বদলে যাওয়া রাজা খুনের প্রায়শ্চিত্ত করতে। এ এক বড়ো প্রেমের আখ্যান – প্রেমের ঈর্ষা, জৈবতার খাঁচা থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার আখ্যান।

এ আবার হয় না কি? যত্ত সব আজগুবি অবাস্তব!

তাহলে কী সত্য? প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে অ্যাসিড সত্য। তাহলে কী সত্য? খুন, খুন ও খুন সত্য।

সত্যের আমরা কি জানি?

সত্যের আমরা কিচ্ছু জানি না, প্রেমেরও কিচ্ছুটি জানি না।

লিখেছেন
Biswajit Ray
Biswajit Ray
6 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।