একদিকে উদ্দাম প্রেমের খোলা ময়দান, অন্যদিকে বিরহের নিভৃত কোণ

সুনীল-শক্তি দুই বন্ধু। বন্ধুতা কেবল সাদৃশ্যে হয় না, বৈসাদৃশ্যেও হয়। গালিবের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন শক্তি। লিখেছিলেন, সব সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না, যদি আর কিছু না থাকে, তবে শত্রুতাই থাক।

Biswajit Ray
৪ মিনিট
একদিকে উদ্দাম প্রেমের খোলা ময়দান, অন্যদিকে বিরহের নিভৃত কোণ

সুনীল-শক্তির মদ্যপান নিয়ে, এতোল-বেতোল বন্ধুত্ব নিয়ে বাঙালি অনেক কথা বলেছে, কিন্তু তাদের কবিতার প্রেমের জগতের তুলনা নিয়ে তেমন কথা বা লেখা চোখে পড়ে না। তবে আলাদা আলাদা ভাবে দু'জনের প্রেমের কবিতা একসময় বাঙালি যুবক-যুবতীদের ঠোঁটে লেগে থাকত, এখনও হয়তো থাকে। সুনীলের নীরা প্রেমের প্রতিমা যেন, আর সুনীলের ভেতরের সেই বেকার ছটফটে যুবা যে নীললোহিত, নীলু, সে মাঝে মাঝেই চলে যায় দিকশূন্যপুরে। সেই ভৌগোলিক জায়গাটির কতগুলি বৈশিষ্ট্য আছে। সেখানে ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকার স্বীকৃত ও অস্বীকৃত– নিজেদের ঘর-বাড়ি আছে, বাগান আছে, কিন্তু প্রহরা নেই। চুরি হয় না। অথবা কেউ অপরের সম্পদ ভালবেসে ব্যবহার করতে চাইলে করতে দেওয়া হয়। সেই ব্যবহারের মধ্যে যে ইচ্ছে কাজ করে, তা খামখেয়ালি ও উদাসীন। সংসারী লোকের মতো সেখানকার লোকেরা রোজই অপরের জিনিস লুব্ধ হয়ে ব্যবহার করতে চায় না। এই উদাসীন জায়গাটি কোথায় কে জানে? তবে সুনীলের উপন্যাস পড়ে জানা যায়, নীলু বা নীললোহিত বাসে উঠে নেমে হেঁটে সেখানে চলে যায়।

সুনীল তাঁর ভালবাসার মধ্যে যে উদাসীন মুহূর্ত যাপন করতে চেয়েছিলেন, তা এই দিকশূন্যপুরের কল্পনায় মেলে। নীলু সেখানে এসে চুমু খেতে চাইলে অকপটে চুমু খেতে পারে। এই আদরের ক্রিয়াগুলি সেখানে যেন যৌনতা নয়– প্রেমের মুহূর্ত, উদ্‌যাপনের প্রকাশ। যে যৌনতা সন্তান-উৎপাদনশীল, সামাজিক, যা ব্যক্তি আর সম্পদের একক অধিকারে বিশ্বাসী, তার সঙ্গে দিকশূন্যপুরের ভালবাসার কোনও মিল নেই। সেই ভালবাসা ও সেই ভালবাসার ক্রিয়াগুলি দু'জনের স্বেচ্ছাসম্মত ও তারপর যখন পরস্পর পরস্পরের থেকে চলে গেল, তখন বেশ একটা ‘ফুরফুরে’ ভাব – কেউ শোক-তাপ করছে না, পরে আর এই মুহূর্ত ফিরে আসবে কি না, তা ভাবছে না, মুহূর্তটি ধারণ করেছে– আনন্দে, বাসনায়। এমন হতে পারা কঠিন, তবে হতে পারলে দুর্দান্ত! ভালবাসার নির্মোহ যাপনের পর তারা আটকে যাচ্ছে না ভালবাসার কাছে, তারপর আবার চলে যাচ্ছে নিজের নিজের সামাজিকতায়।

আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি ও পরিবেশে দিকশূন্যপুর নেই। এ সুনীলের নির্মিত ও কল্পিত এক দেশ। সরল, উদার সেই দেশটি, আর সন্তান, শরীরের ব্যক্তিগত অধিকার ইত্যাদি প্রশ্নের বাইরের সে-দেশ। সুনীলের এই ইচ্ছাপূরণের দিকশূন্যপুর সম্পর্কে পাঠকের মনকেমন করতে পারে, সেই জায়গাটাকে পেতে ইচ্ছে করতে পারে, কিন্তু সুনীলের লেখার ও বলার গুণেই তীব্র বিষাদ, বিরহ-বিষণ্ণতা দিকশূন্যপুরের যাপনে জেগে ওঠে না। এমনকী, সুনীলের নীরা বিষয়ক বিরহ-কবিতাগুলিও মনকেমনের সুন্দর যাপন– লণ্ডভণ্ড তীব্র বিষাদ-বিপন্নতা সুনীলের প্রেমের কবিতার ভূষণ নয়।

সেই লণ্ডভণ্ড তীব্র জ্বরো বিষাদ শক্তির কবিতার অভিজ্ঞান। শক্তি দিকশূন্যপুরে যান না। তাঁর ছিল হৃদয়পুর। শক্তি 'হৃদয়পুর' শব্দটি গভীরভাবে ব্যবহার করেছিলেন তাঁর 'ধর্মে আছো জিরাফেও আছো' বইতে। কবিতার বইটি তিনি ‘আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্য পাঠকের’ হাতে তুলে দিয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এই বইয়ের কবিতাগুলিতে তিনি সচেতনভাবেই রবীন্দ্রনাথের ধরনের ছন্দ ও ভাষা একটু সরল করে ব্যবহার করেছিলেন।

শক্তির হৃদয়পুর সুনীলের দিকশূন্যপুরের চাইতে অন্যরকম। হৃদয়পুর দিকশূন্যপুরের মতো ফুরফুরে নয়। সেখানে পর্যটনের ইচ্ছে সকলের হবে না। সেই কারণ ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে/ বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?’ শক্তি জীবনানন্দের কবিতার গভীর পাঠক। তাই হৃদয়পুরের বেদনার কথা তিনি লিখতে চাইতেন। সে বাইরের জায়গা নয় ভেতরের জায়গা, সেখানে বাসে করে যেতে হয় না, ঘরে বসে নিজের ভেতরে চলে যাওয়া যায়। যেমন মনের মানুষের কাছে যান বাউলরা, তেমনই যেন।

'ধর্মে আছো জিরাফেও আছো'-র প্রচ্ছদ

বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। ১৯৬৩-র জুনে 'দেশ' পত্রিকায় শক্তি লিখলেন, ‘তখনো ছিলো অন্ধকার তখনো ছিলো বেলা/ হৃদয়পুরে জটিলতার চলিতেছিলো খেলা।' এই জটিলতা বিরহের, বেদনার। সেখানে নানা ঋতুর আনাগোনা। বিশেষ করে বর্ষা শক্তির হৃদয়পুরে গভীর, গহন। দূর বাগানের কেতকী ফুল সেখানে আকুল হয়ে ফোটে। এই বিরহ যার জন্য, বিরহী তাকে মনের ভেতরে ছবির মতো রাখে, বলে ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/ তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো’। অভিমানী স্মার্টনেস অবশ্য সেই বিরহীর আছে। জিজ্ঞাসা করতে পারে তাই, ‘লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ চাইলে কি সে ফিরিয়ে দেবে স্মৃতি? দেবে, কিন্তু অপেক্ষা করবে তবু, বলবে ‘তু্মি যদি পারো ফিরে এসো কাছে সময় হলে।।’ এই যে অপেক্ষা, তা একার অপেক্ষা, নীরব অপেক্ষা, অপেক্ষায় বিখ্যাত না হওয়ার অপেক্ষা। কারণ ‘যত বড়ো রাজধানী/ তত বিখ্যাত নয় এ-হৃদয়পুর‌’।

তাঁর আত্মজীবনীর নামও রেখেছিলেন 'হৃদয়পুর'

শক্তি যখন এই হৃদয়পুরের কথা লিখছিলেন, তখন স্বাধীন ভারতের এক যুবার পক্ষে এই হৃদয়পুরের কথা লেখা সব দিক থেকেই খুব কঠিন। স্বপ্নভঙ্গের স্বাধীনতা যুবসমাজকে ক্রুদ্ধ ও অধিকারপরায়ণ করে তুলছিল। বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল কেউ কেউ। সেই সময় এমন অন্তর্গত বিষাদ-পদাবলি লেখা যেন নিজেকে অন্তর্গতে প্রত্যাহার করে নেওয়া। প্রেমের পর্যটন নয়, এ বিরহের একান্ত যাপন। এখানে একটা প্রশ্ন উঠে পড়ে। সুনীলের দিকশূন্যপুর একটি বেকার ছটফটে যুবার পর্যটন-ক্ষেত্র– তার খানিকটা সময় কাটানোর জায়গা, ফুরফুরে মুক্তির ঘরবাড়ি। কোনও রাগী যুবতী যদি এমন দিকশূন্যপুরের কথা লিখতে চাইতেন সে-সময়ে, তাহলে তিনি কীভাবে ভাবতেন বা পরিকল্পনা করতেন! নীললোহিত নামক ছেলেটির প্রাপ্তি ও মুক্তির জন্যই যেন দিকশূন্যপুরের খোলা মাঠের ও উদার সমাজের জন্ম। শক্তির হৃদয়পুর কিন্তু নির্দিষ্ট লিঙ্গের অধিকারী কবির ভাবনা নয়– এ এক বিরহীর, কাঙাল বিরহীর কল্পনা। সে মেয়ে হতে পারে, ছেলে হতে পারে– সে প্রেমে কাঙাল ও বিরহ-যাপনে একাকিত্বের অধিকারী হতে চাইলে হৃদয়পুরের কথা ভাবতে পারে, ভাবতেই পারে।

এখন কি এভাবে আর কেউ যাপন করতে চাইবেন শক্তির মতো বিরহ?

আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি

এমন ছিল না আষাঢ়-শেষের বেলা

উদ্যানে ছিলো বরষা-পীড়িত ফুল

আনন্দ-ভৈরবী

বিরহের আনন্দ আছে। যে পায়, সে পায়। সেই আনন্দ দিকশূন্যপুরের মতো ফুরফুরে আনন্দ নয় অবশ্য। নিজের ভেতরে ডুবে থাকার বিরহানন্দ।

সুনীল-শক্তি দুই বন্ধু। বন্ধুতা কেবল সাদৃশ্যে হয় না, বৈসাদৃশ্যেও হয়। গালিবের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন শক্তি। লিখেছিলেন, সব সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না, যদি আর কিছু না থাকে, তবে শত্রুতাই থাক। দিকশূন্যপুরের সঙ্গে হৃদয়পুরের সম্পর্ক শত্রুতার না মিত্রতার, তা কে জানে!

লিখেছেন
Biswajit Ray
Biswajit Ray
6 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?